|
| |
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কার্টুন ও মিম বানিয়ে ফেসবুকে দিয়ে ‘কোটি টাকার ব্যবসা’ করেছেন দুই ভাই

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
২০৫ পঠিত
কার্টুন ও মিম বানিয়ে ফেসবুকে দিয়ে ‘কোটি টাকার ব্যবসা’ করেছেন দুই ভাই
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই নাজমুস শাহাদাত ভাবতে শুরু করেছিলেন, হাতখরচটা এবার নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। বড় ভাই নাজমুস সাকিব তখন চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ছাত্র। দুই ভাই মিলে খুঁজতে থাকেন আয়ের পথ। তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে।

শাহাদাত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ছাত্র। তাই এ ক্ষেত্রেই শুরুতে ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছেন। কাজও করেছেন কিছুদিন। কিন্তু মন টেকেনি। এরপর দুই ভাই ধীরে ধীরে অনলাইন ব্যবসার অলিগলিতে ঢুঁ মারতে শুরু করেন।

প্রথমে ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলে বিভিন্ন বিষয়ের ছবি দিয়ে ‘স্লাইড শো’ তৈরি করতেন শাহাদাত। তাতে খুব একটা সাড়া মেলেনি। পরে ‘ফেসবুক বোনাস’ (রিল, ছবি ও লেখার মাধ্যমে মেটা থেকে আয়), কনটেন্ট মনিটাইজেশন, এমন নানা কিছু সম্পর্কে ধারণা নেন। তখনো অনলাইনে পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। বরং দুই ভাইই খুঁজছিলেন, কী ধরনের কনটেন্ট তৈরি করলে নেটিজেনদের মনোযোগ পাওয়া যাবে।

এ সময় দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিভিন্ন টুল জনপ্রিয় হতে শুরু করে। শাহাদাত এসব টুল ব্যবহার করে টুকটাক কার্টুনধর্মী ছবি তৈরি করতেন। কার্টুনের সঙ্গে মজার মজার কথা জুড়ে দিয়ে মিম তৈরির পরিকল্পনা করেন দুই ভাই। নিজেদের ফেসবুক পেজে সেসব মিম প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে কিছু পোস্ট ভাইরাল হয়। পেজে যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন অনুসারী (ফলোয়ার)। পাশাপাশি নিজেদের গ্রুপও গড়ে তোলেন তাঁরা।

এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁদের নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠী। ফেসবুকের দেওয়া উপাত্ত (ফেসবুক ইনসাইট) থেকে দুই ভাই জানতে পারেন, তাঁদের কনটেন্টের ‘দর্শকের’ বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, বিশেষ করে মধ্যবয়সী ও বয়স্করা। বয়স, অবসরজীবন ও দৈনন্দিন জীবনের বিরক্তি নিয়ে তৈরি রসিকতাগুলোই তাঁরা পছন্দ করছেন বেশি। পেজের এই জনপ্রিয়তাই একসময় দুই ভাইকে দেখায় নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা।

মিম থেকে পণ্য

মিমের মজার কথাগুলোই টি-শার্টে ছাপিয়ে বিক্রি করলে কেমন হয়—একসময় এমন ভাবনা আসে শাহাদাত ও সাকিবের মাথায়। এ সময় তাঁদের পরিকল্পনায় যুক্ত হন খালাতো ভাই মোহাম্মদ হাসান রাফি। ডিজাইনের কাজটা তিনি ভালো জানেন। ব্যস, শুরু হয়ে যায় টি–শার্ট তৈরির যাত্রা।

টি-শার্ট তৈরি ও সরবরাহের দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখেননি তাঁরা। ভিনদেশি একটি কোম্পানির সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিয়েছেন। শাহাদাতরা ফেসবুক ও ওয়েবসাইটে নিজেদের ডিজাইন তুলে ধরে শুধু অর্ডার সংগ্রহ করেন, টি–শার্ট তৈরি থেকে শুরু করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে সেই কোম্পানি।

শাহাদাত বলেন, ‘শুরুতে কয়েক মাস কোনো আয় ছাড়াই আমরা পেজ ও গ্রুপের দর্শক বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা খরচ করতে চাইনি। বরং বিভিন্ন গ্রুপে মিম শেয়ার, ভালো ভালো কনটেন্ট বানিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো, নিজেদের একটা কমিউনিটি গড়ে তোলা—এসব দিকেই ছিল আমাদের মনোযোগ। ধীরে ধীরে এই চেষ্টার ফল আসতে শুরু করে। মিমের দর্শকেরাই হয়ে ওঠেন আমাদের পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা। এ পরিকল্পনায় দ্রুতই বেশ সাড়া পেতে শুরু করি আমরা।’

টি-শার্ট দিয়ে শুরু হলেও এখন তাঁদের পণ্যের তালিকা বেশ বড়। সোয়েটশার্ট, হুডি, এমনকি টাম্বলারও (একধরনের পানির ফ্লাস্ক) বিক্রি করেন তাঁরা। প্রতিটি পণ্যের নকশায় গুরুত্ব পায় মিমের পরিচিত রসিকতা ও সংলাপ। এসব পণ্য বিক্রির জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে লক্ষ্য করে তাঁরা গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ওয়েবসাইট—ইউআরপ্রিন্টজ ডটকম।

এ ধরনের মিম বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন শাহাদাত ও সাকিব

উৎসব ঘিরে বাড়ে বিক্রি

শাহাদাত জানালেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে হ্যালোইন ও বড়দিনের মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ নকশার পণ্য তৈরি করেন তাঁরা। উৎসবের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি এসব ডিজাইনে ভালো সাড়া পান।

পণ্যের নকশা ও কনটেন্ট তৈরিতে এআইয়ের বিভিন্ন টুলের ব্যবহার তাঁদের কাজকে আরও সহজ করেছে। শাহাদাত বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে এসব টুলের উন্নতি হওয়ায় কম সময়ে মানসম্পন্ন নকশা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশের পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।’

তবে এই যাত্রায় শুধু প্রযুক্তিই ভূমিকা রাখেনি। দর্শকদের বয়স ও পছন্দ বোঝা, নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি ও সেই কনটেন্টের সঙ্গে পণ্যের যোগসূত্র তৈরি করাটাও ব্যবসার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এ ধরনের টিশার্টের নকশা করেন শাহাদাতরা।

মিম পেজ থেকে কোটি টাকা

শাহাদাত জানান, বর্তমানে তাঁদের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ মিলিয়ে অনুসারী ও সদস্যের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে এক বছরেই ব্যবসায় প্রায় এক কোটি টাকা আয় করেছেন তাঁরা। ব্যবসার ভালো বিক্রি ও ওয়েবসাইটের জনপ্রিয়তার জন্য আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম শপবেজ থেকে স্বীকৃতিও পেয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৫ জনের বেশি মানুষ আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হাতখরচ জোগানোর তাগিদ থেকে শুরু, সেই উদ্যোগের মাধ্যমেই এখন ঘরে বসেই বিদেশি বাজারে পণ্য বিক্রি করে মাসে লাখ টাকা আয় করছেন শাহাদাত ও সাকিব। তবে তাঁদের এই যাত্রা সব সময় মসৃণ ছিল না। ফেসবুকের নীতিমালা ও অ্যালগরিদমের পরিবর্তনের কারণে মাঝেমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। কনটেন্টের ধরন, দর্শকদের পছন্দ ও অ্যালগরিদমের পরিবর্তন নিয়ে দুই ভাইকে রীতিমতো গবেষণা করতে হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে তাঁরা শুধু ফেসবুকের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে চান না, বরং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চান।

সহপ্রতিষ্ঠাতা নাজমুস সাকিব বলেন, ‘ভবিষ্যতে শুধু ফেসবুকের ওপর নির্ভর না করে ইনস্টাগ্রাম ও পিন্টারেস্টের মতো প্ল্যাটফর্মেও দর্শক ও ক্রেতা তৈরি করতে চাইছি আমরা। পাশাপাশি নিজেদের ওয়েবসাইটকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আছে, যেন ক্রেতারা সরাসরি সেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারেন এবং বারবার আমাদের কাছেই ফিরে আসেন।’ পণ্যের তালিকাও বড় করার কথা ভাবছেন তাঁরা। মগ, ক্যাপ ও ব্যাগের মতো নতুন পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। ডিজাইন ও কনটেন্ট তৈরিতে নতুন নতুন এআই টুল ব্যবহার করে সক্ষমতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সেটি নিয়েও তাঁরা ভাবছেন।

সূত্র: প্রথম আলো