|
| |
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

চট্টগ্রামে উন্নয়ন বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবহার হোক

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৬ এএম
৩৭৯ পঠিত
চট্টগ্রামে উন্নয়ন বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবহার হোক
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ তুলে ধরে শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে মোট ১৩১টি খাল রয়েছে।

ইইউর সহযোগিতায় গতকাল চট্টগ্রামে নাগরিক সমাজের বাজেট প্রত্যাশা নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে একশনএইড ও প্রথম আলো।

চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলেও নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও অপর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন; আর জাতীয় বাজেটে চট্টগ্রামের জন্য ন্যায্য বরাদ্দ যেমন দিতে হবে, তেমনি এর সঠিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল সোমবার সকালে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ: চট্টগ্রাম পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো বলেন বক্তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে। চট্টগ্রাম নগরের তারকা হোটেল র‍্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউয়ের একটি সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বক্তারা জাতীয় বাজেটে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি নগরবাসীর নাগরিক চাহিদা ও জীবনমানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবায়ন ও সুফল নিশ্চিত করতে হবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরের সেবাদানকারী সংস্থাগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকায় সমন্বিতভাবে কাজ করা কঠিন। পরিকল্পিত নগর গড়তে নগর সরকার বা সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ তুলে ধরে শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে মোট ১৩১টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি খাল নিয়ে কাজ হয়েছে। বাকি খালগুলোর মধ্যে ৪০টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে কয়েকটি এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা হচ্ছে। চান্দগাঁও, মোহরা, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গার কাঠগড় ও হালিশহরের কিছু এলাকার কথা উল্লেখ করে শাহাদাত হোসেন বলেন, কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বলেন, চট্টগ্রামের জন্য ন্যায্য বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। আবার যে বরাদ্দ দেওয়া হবে তার সঠিক ব্যবহারও করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল পুনরুদ্ধার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি

চট্টগ্রাম নগরে জনসংখ্যা বাড়লেও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (বাকবিশিস) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, আগ্রাবাদ থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত সরকারি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ নির্ভরশীল। এ চাপ কমাতে নগরে অন্তত দুই থেকে তিনটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। হালিশহর, পতেঙ্গা, বাকলিয়া ও অক্সিজেন এলাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাহাদাত হোসেনও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতাল বা যন্ত্রপাতি বাড়ালেই হবে না, দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। দক্ষ নার্স, কেয়ারগিভার ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট তৈরিতে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে বাসদের (মার্ক্সবাদী) সদস্য দীপা মজুমদার বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ধরনের বাজেট হওয়ার কথা, বাস্তবে তা হয়নি। গতানুগতিক বাজেট হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এখনো চট্টগ্রামের বিভিন্ন বস্তি এলাকার মানুষ ফ্যামিলি কার্ড পাননি। এটি নিশ্চিত করতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে একশনএইড বাংলাদেশের লিড (উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি) মরিয়ম নেছা বলেন, তৃণমূলের মানুষের চাহিদা ও জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানো জরুরি। জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার এবং সরকারের বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা পর্যালোচনা করেছে সুশীল প্রকল্প। জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও পর্যালোচনার সময় স্থানীয় মানুষের চাহিদা যেন গুরুত্ব পায়, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।

বন্দরে দ্রুত পণ্য খালাসে জোর

গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার এই বন্দরে কনটেইনার দ্রুত খালাস ও পণ্য পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। বন্দরে পণ্য খালাস ও আমদানিকারকের কাছে পৌঁছাতে দেরি হলে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।

সংস্কৃতির বিকাশে বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনা

সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দের বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হওয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কার্যকর অর্থ কতটা থাকছে, সে প্রশ্ন তোলেন অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের উপদেষ্টা শিশির দত্ত।

চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে শিশির দত্ত বলেন, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো তৈরি হলেও এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি তা সচল রাখার পরিকল্পনা ও বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী অধিকারকর্মী জেসমিন সুলতানা পারু বাজেট প্রণয়নে সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক নারী ও শ্রমজীবীদের চাহিদা বিবেচনার ওপর জোর দেন। তিনি চট্টগ্রামের সুশাসন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, নারীর ক্ষমতায়ন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপমহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শিরিন ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সেবা এবং উপজেলা পর্যায়ে নারীদের আইনি সহায়তার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। জন্মনিবন্ধনের ভোগান্তি কমাতে শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ব্রাইট বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী উৎপল বড়ুয়া, দৈনিক পূর্বকোণ–এর প্রধান প্রতিবেদক সাইফুল ইসলাম, দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদক জাহেদুল কবির।

বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

সূত্র: প্রথম আলো