|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

দিনমজুরের টাকায় তিন সড়কে ১১ যাত্রীছাউনি

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩০ এএম
১৬১ পঠিত
দিনমজুরের টাকায় তিন সড়কে ১১ যাত্রীছাউনি
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
গাজীপুরের কাপাসিয়ার দিনমজুর বাবুল শেখ নিজের টাকায় তিন সড়কের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ১১টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছেন।

বৃষ্টি নামতেই কোলের শিশুকে আগলে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মা। এক হাতে সন্তান ধরে রাখছেন, অন্য হাতে ভারী ব্যাগ সামলাচ্ছেন। বাসের জন্য অপেক্ষমাণ এক মা হঠাৎ শুরু হওয়া বৃষ্টির মধ্যে কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। দুই বছর আগে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে এ রকম একটি দৃশ্য দেখে খারাপ লেগেছিল বাবুল শেখের। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, রাস্তার পাশে যাত্রীছাউনি থাকলে অনেক মানুষের উপকার হতো।

খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে এক মায়ের নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না বাবুল শেখ। দিনমজুরের কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালানো এই মানুষ একটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, সামর্থ্য যতটুকুই হোক না কেন, কিছু একটা তিনি করবেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে বাঁশ, কাঠ, চাটাই, পলিথিন নিয়ে বাবুল শেখ চলে যান কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে, যেখানে এক মা বৃষ্টির মধ্যে ছেলেকে কোলে নিয়ে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। এর পর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়ক এবং আশপাশের আরও দুটি সড়কে মোট ১১টি যাত্রীছাউনি তৈরি করেছেন বাবুল শেখ। এর মধ্যে একটি যাত্রীছাউনির পাশে শৌচাগারও নির্মাণ করেছেন।

বাবুল শেখের সঙ্গে ৩ নভেম্বর কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, প্রথমে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে একটি যাত্রীছাউনি তৈরি করেন। দেড় মাস পর একই স্থানে সড়কের উল্টো দিকে আরেকটি যাত্রীছাউনি ও একটি শৌচাগার নির্মাণ করেন। ২০২৪ সালের পর ২০২৫ সালে আরও চারটি যাত্রীছাউনি তৈরি করেন। বাকি ৫টি করেছেন চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে।

সব মিলিয়ে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কে আটটি, কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সড়কে একটি এবং পাতলা-বড়সিট সড়কে দুটি যাত্রীছাউনি তৈরি করেছেন বাবুল শেখ। এই তিন সড়কের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যাত্রীছাউনিগুলো।

প্রশংসনীয় উদ্যোগ

যাত্রীছাউনিগুলো বাঁশ, কাঠ, চাটাই ও মোটা পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। একেকটির আকার একেক ধরনের। কোনোটি লম্বায় ৭ ফুট, প্রস্থে ৫ ফুট। আবার কোনোটি লম্বায় ৫ ফুট, প্রস্থে ৪ ফুট। এর মধ্যে কোনোটিতে একটি বেঞ্চ, আবার কোনোটিতে চার থেকে পাঁচটি বেঞ্চ পাতা। ছাউনির জন্য চাটাইয়ের ওপর মোটা পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে।

বাবুল শেখের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামে

বাবুল শেখ জানান, ছোট আকারের যাত্রীছাউনি নির্মাণে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর বড় আকারের যাত্রীছাউনিতে খরচ হয়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর শৌচাগার নির্মাণে রিং–স্ল্যাব, প্যান, টিনসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা লেগেছে। যাত্রীছাউনি ও শৌচাগার তৈরিতে কোনো শ্রমিকের দরকার হয়নি, তিনি নিজেই কাজটি করছেন।

যাত্রীছাউনি ও শৌচাগার নির্মাণ করেই থেমে থাকেননি এই মানুষটি। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণসহ সবকিছু তিনি নিজ হাতে করেন। শৌচাগারে পানির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন বোতলে পানি ভরে রাখেন। ব্যবহারের পর শৌচাগার নোংরা হলে নিজেই পরিষ্কার করেন। এ কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো বিরূপ মন্তব্যও শুনতে হয় তাঁকে। পরিবারের সদস্যরাও মাঝেমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কারও কথায় কান দেননি।
বাবুল শেখ বলেন, ‘অনেকে বলে, আমি পাগলামি করছি। আমি তাদের কথায় গুরুত্ব দিই না।’

পাতলা গ্রামের বাসিন্দা উবায়দুল্লাহ আকন বলেন, গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশের ঝোপঝাড়ও মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করেন বাবুল শেখ। তিনি সরল মানুষ, কারও সঙ্গে কখনো তিনি তর্কে জড়ান না। তাঁকে দেখে অনেকের শেখার আছে।
যে তিনটি সড়কে বাবুল শেখ যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছেন, এর মধ্যে একটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন। অন্য দুটি সড়ক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন।

বাবুল শেখের উদ্যোগ প্রশংসনীয় বলে জানান এলজিইডির কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা। একই কথা বলেছেন কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হকও। প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কাছে গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাটি শোনার পর দুজনই বলেছেন, বাবুল শেখের সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ করবেন।

রোদ–বৃষ্টিতে বসার ব্যবস্থা

কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে বাবুল শেখের তৈরি করা প্রথম যাত্রীছাউনিতে ৩ নভেম্বর যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেউ রোদ থেকে বাঁচতে, কেউবা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। এই ছাউনির পাশে একটি শৌচাগার রয়েছে। এর পাশে বাঁশের খুঁটিতে টানানো দড়িতে কয়েকটি পানির বোতল। শৌচাগারের বেড়ায় একটি ব্যানার টাঙানো। ব্যবহারের পর শৌচাগার পরিষ্কার রাখার বার্তা রয়েছে সেই ব্যানারে।

বাবুল শেখের গড়া যাত্রীছাউনিগুলোতে বসে বিশ্রাম নেন গ্রামের মানুষ। গত মঙ্গলবার গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বড়সিট গ্রামে

যাত্রীছাউনিতে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেদন মিয়া নামের এক যাত্রী। তিনি বলেন, সড়কের পাশে বসার ব্যবস্থা থাকায় যাত্রীদের অনেক সুবিধা হয়েছে। রোদের মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে অনেক কষ্ট হয়ে যেত।

পাতলা গ্রামের পাশের বড়সিট গ্রামের বাসিন্দা মো. রিয়াদকে ৩ নভেম্বর বিকেলে পাওয়া যায় যাত্রীছাউনিতে। তিনি বলেন, শৌচাগারটি হওয়ায় পথচারীদের সুবিধা হয়েছে।

মানুষ ভালো বলতাছে’

পঞ্চাশোর্ধ্ব বাবুল শেখের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামে। বসতঘর ছাড়া তেমন কিছু নেই তাঁর। দিনমজুরের কাজ করার পাশাপাশি বাড়িতে ছোট আকারে মুরগির খামার করেছেন। সামান্য যা আয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে। এক মেয়ে, দুই ছেলে তাঁর। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। বড় ছেলেকে সাত মাস আগে বিদেশে পাঠিয়েছেন। এ জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে।

সংসারে টানাপোড়েনের পরও কেন এ ধরনের কাজে যুক্ত হয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল শেখের উত্তর, ‘ছোট কাজেও যদি মানুষের উপকার হয়, তাতেই আমি খুশি।’

সংসার ঠিকমতো চলে না আর স্বামী রাস্তার পাশে যাত্রীছাউনি কিংবা শৌচাগার নির্মাণ করছেন, এ ধরনের কাজকে আগে পাগলামি মনে করতেন সালমা খাতুন। তবে এখন বিষয়টি তাঁর কাছে ভালো লাগে।

সালমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হইতো এগুলা কইরা কী অইবো। এহন দেহি মাইনষের উপকার হইতাছে। মানুষ ভালো বলতাছে। আমার নিজেরও এহন ভালো লাগে।’

সূত্র: প্রথম আলো