|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

শিশুরা যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাশুল দেয়: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশুদের সম্পৃক্ততার একটি পর্যালোচনা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
১৬৮ পঠিত
শিশুরা যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাশুল দেয়: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশুদের সম্পৃক্ততার একটি পর্যালোচনা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রাণ হারানো মানুষদের কীভাবে স্মরণ করা হবে, সে বিষয়ে দেশ এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের পরিবারকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উল্লেখ করা...

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রাণ হারানো মানুষদের কীভাবে স্মরণ করা হবে, সে বিষয়ে দেশ এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের পরিবারকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত শিশুদের ৮৪টি পরিবার ইতোমধ্যে এককালীন ৫০ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড ও সম্মাননা স্মারক পেয়েছে।

নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো এখন গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিও জানাচ্ছে। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বজনহারা মা-বাবার কাছে এগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পেছনের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে গভীর অস্বস্তি এড়ানো কঠিন। একই সঙ্গে এমন একটি প্রশ্ন সামনে আসে, যার উত্তর কোনো সম্মাননা স্মারক বা প্রাইজবন্ড দিতে পারে না।

প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে গণঅভ্যুত্থানে নিহত ৮১০ জনের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ছিল ১৩৩ জন। তাদের মধ্যে ৯১ জন শিক্ষার্থী এবং ৪১ জন বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত ছিল। নিহত শিশুদের ১১৭ জনই গুলিতে প্রাণ হারায়। কেউ কেউ নিজ বাড়িতেও নিহত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপে বাড়ির ছাদ থেকে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনুমান করেছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, যাদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী গুলিসহ রাইফেল ও শটগান ব্যবহার করে শিশু বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।

নিহত শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ১৩২ জন শিশু ও কিশোরের নাম রয়েছে; প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এ সংখ্যা ১৩৩। ডেইলি স্টারে উদ্ধৃত জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা অন্তত ১১৮। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে এই মতপার্থক্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে এক একটি শিশুর জীবন রয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবার এমন একজন স্বজনকে হারিয়েছে, যার অভাব কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয় এবং যে শোক তাদের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে।

তাদের স্মরণ করা সহজ। কঠিন কাজ হলো, তাদের মৃত্যু আমাদের কাছে কী দাবি রেখে গেছে, সেই প্রশ্ন তোলা। এত শিশু কীভাবে রাজপথে এসে পড়ল? আমাদের রাজনীতি ও সমাজের কোন ব্যর্থতাগুলো তাদের এতটা অরক্ষিত করেছিল? তাদের মা-বাবা কি ঝুঁকির বিষয়টি জানতেন? শিশুরা কি নিজেরাই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নাকি পরিস্থিতি, সেই সময়ের বাস্তবতা কিংবা যাদের তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল, তাদের ব্যর্থতা, কোনো না কোনোভাবে তাদের সেখানে যেতে বাধ্য করেছিল? আর যে শক্তি প্রয়োগে তাদের প্রাণহানি ঘটেছে, তার জন্য দায়ী কে?

কোনো পক্ষকে দোষারোপ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উদ্দেশ্যে এসব প্রশ্ন করা হচ্ছে না। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সৎভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে - সেই উত্তর যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন।

কীভাবে শিশুরা বিক্ষোভের ভিড়ে এসে পড়েছিল?

জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে চলা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায় যে,  শুরুর দিকে শিশুরা মূলত ছিল দর্শকের ভূমিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জমায়েত, স্লোগান ও তর্ক-বিতর্ক দেখতে কৌতূহলী হয়ে আশপাশে ঘোরাফেরা করত বিভিন্ন বয়সী শিশু-কিশোর। এরপর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভের জমায়েত বড় হতে থাকে, বাড়তে থাকে উত্তেজনা ও ক্ষোভ। স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও মিছিলে যোগ দিতে শুরু করে। কেউ কৌতূহলবশত, কেউ বড় ভাইবোন বা বন্ধুর পিছু পিছু, আবার কেউ পরিস্থিতির স্রোতে ভেসে সেখানে এসে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হলে ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। তা সত্ত্বেও শিশুদের উপস্থিতি অব্যাহত থাকে। তাদের অধিকাংশই কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তারা ছিল এমন এক সময়ের আবহে আটকে পড়া শিশু, যে সময়টিকে সবার আন্দোলন বলে মনে হচ্ছিল। কেউ কেউ হয়তো আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন থেকে সচেতনভাবেই যোগ দিয়েছিল। আবার কেউ হয়তো কোথাও যাওয়ার পথে সেখানে উপস্থিত ছিল, ঠিক তখনই যখন গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে বিক্ষোভের ভিড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে শিশুদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ গ্রেপ্তার হয়, কেউ আহত হয়, আর কেউ প্রাণ হারায়।

যে কারণেই তারা সেখানে গিয়ে থাকুক না কেন, শিশুদের, বিশেষত কম বয়সী শিশুদের, পক্ষে জীবননাশের ঝুঁকি যথাযথভাবে অনুধাবন করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিপদের মুখে তাদের উপস্থিতিকে তাদের বিচারবুদ্ধির ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি সেই প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যর্থতা, যাদের দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক সংঘাত ও আন্দোলনের উত্তাপ থেকে শিশুদের বসবাস, জীবনযাপন ও শিক্ষার পরিসরকে সুরক্ষিত রাখা।

কারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল?

এর পেছনে কোনো একক পক্ষ দায়ী ছিল না। একাধিক ব্যর্থতা একসঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নেয়। সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে সংঘাত যখন প্রধান প্রবণতা হয়ে ওঠে, তখন রাজপথে সহিংসতা এবং তার সঙ্গে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও বেড়ে যায়। সব পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই দায় রয়েছে, যারা শিশুদের উপস্থিতি ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করেই জনসমাগম ঘটিয়েছে এবং যারা সংঘাত প্রশমিত করার পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংঘাতমুখী হতে দিয়েছে।

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। জনবহুল আবাসিক এলাকায়, যেখানে শিশুরা বসবাস করে এবং প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করে, সেখানে বলপ্রয়োগের ধরনও এই ব্যর্থতার অংশ। শিশুদের উপস্থিতি ছিল এমন জনসমাগমে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগকে কেবল অস্থিরতার অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। জীবিকার প্রয়োজনে শিশুরা দোকান চালায়, কাজের জন্য যাতায়াত করে কিংবা এমন স্কুলে যায়, যার আশপাশ হঠাৎ সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়। তাদের ঘরবাড়িও এমন সব এলাকায়, যা মুহূর্তেই সংঘাতের ময়দানে পরিণত হতে পারে।

একটি অভ্যস্ত সামাজিক চর্চা। বাংলাদেশে সভা-সমাবেশ ও মিছিলে শিশুদের উপস্থিতি পরিচিত দৃশ্য। এই দৃশ্যের সঙ্গে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, প্রাপ্তবয়স্কদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিসরের মধ্যে যে সীমারেখা থাকা প্রয়োজন, তা আর আমাদের চোখে পড়ে না।

মা-বাবা কী করতে পেরেছিলেন, আর কী পারেননি

মা-বাবারা কি ঝুঁকির বিষয়টি জানতেন? অনেকেই নিশ্চয়ই জানতেন। তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, যতটা সম্ভব সন্তানদের ঘরে আটকে রেখেছেন এবং সতর্ক করেছেন। কিন্তু বিপদ সম্পর্কে জানা আর সেই বিপদ মোকাবিলায় কার্যকর কিছু করতে পারা এক বিষয় নয়।

স্বল্প আয়ের কোনো এলাকার একজন মায়ের পক্ষে নিজের সন্তানকে নিরাপদে রাখার জন্য আলাদা সুরক্ষাবলয় তৈরি করা সম্ভব নয়, যখন পুরো এলাকাটিই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। যে আন্দোলন মানুষের কথাবার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথের প্রতিটি মোড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাব থেকে কোনো কিশোর ছেলেকে দূরে রাখা একজন বাবার পক্ষেও সহজ নয়।

গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরাপদ ও বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হওয়ার প্রচলিত ধারণাও বদলে যায়। যা একসময় অকল্পনীয় মনে হতো, তা-ই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। আশপাশের মানুষ যখন মিছিলে যোগ দিচ্ছে এবং আন্দোলনের দাবিকে ন্যায্য বলে মনে হচ্ছে, তখন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত কোনো শিশুকে ঘরে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় বন্ধুদের প্রভাব ও জনতার স্রোতের কাছে অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার কর্তৃত্বও হার মানে। এসব বাস্তবতা মা-বাবার দায় অস্বীকার করে না; তবে ব্যাপক সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি পরিবারের একার পক্ষে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, তা বুঝতে সাহায্য করে।

দায়ভার কার?

নিজের জীবন বিপন্ন করে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার দায়িত্ব কি কোনো শিশুর? না, কখনোই নয়। শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের নিজের অঙ্গীকারগুলো বিবেচনা করা যাক। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছে। আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সব শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। ২৮(৪) অনুচ্ছেদে নারী ও শিশুদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়নের সুযোগও স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-তে শিশুদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সুরক্ষামূলক বিধান রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব অঙ্গীকারের মূল কথা হলো, প্রতিটি শিশু সহিংসতা থেকে সুরক্ষা, শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকারী।

কোনো আইনই শিশুদের রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিতে বা কোনো দাবির পক্ষে জীবন বিপন্ন করতে বলে না। তবে শিশু অধিকার সনদে তাদের মতামত প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে (অনুচ্ছেদ ১২ ও ১৫)। তাই প্রকৃত প্রশ্নটি এই নয় যে, শিশুরা কখনো জনপরিসরের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, তারা অংশ নিলে রাষ্ট্র ও প্রাপ্তবয়স্করা তাদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারছে কি না (অনুচ্ছেদ ৬ ও ১৯)। শিশুর মতামত অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু সেই মতামত প্রকাশের মূল্য কখনোই তার জীবন হতে পারে না। আন্দোলনের উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক, রাজনীতির জন্য আত্মোৎসর্গ করা নয় - শিশুর প্রধান কাজ হলো শিক্ষা গ্রহণ করা ও বেড়ে ওঠা।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে সংস্কার এবং অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব প্রাপ্তবয়স্কদের, বিশেষত যাদের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও আইনগত দায়িত্ব রয়েছে, তাদের। এসব দায়িত্ব পালনের সময় শিশুদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাদের অধিকার একটি উন্নত দেশ উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া; সেই দেশ গড়ে তুলতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া নয়।

শিশুরা যখন রাজনৈতিক সংগ্রামে নামতে বাধ্য বোধ করে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তা ইঙ্গিত করে যে, প্রাপ্তবয়স্করা যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনসম্মত পথে বিরোধ ও অসন্তোষের সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংসদ, পুলিশ, আদালত, নাগরিক সমাজ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বিভিন্ন মাধ্যমেরই এসব অভিযোগ ও অসন্তোষ মোকাবিলার কথা ছিল। এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হলে সংঘাত ও আন্দোলন এমন সব পরিসরেও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শিশুরা বসবাস করে, চলাফেরা করে ও বেড়ে ওঠে।

তাদের মৃত্যুকে মহিমান্বিত করার ঝুঁকি

শিশুদের এসব মৃত্যুকে যখন আমরা ‘শহীদ’ বা ‘গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগ’ বলে অভিহিত করি, তখন এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়, যার প্রভাব ভবিষ্যতেও পড়তে পারে। কারও স্বজন হারানোর বেদনাকে খাটো করার জন্য এ কথা বলা হচ্ছে না; বরং এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটিই উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের পরিভাষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের কী বার্তা দেয়? তারা কি মনে করবে, সম্মান ও বীরত্বের পরিচয় এমনই? ভবিষ্যতে তাদের কেউ কি নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়াকে মহৎ কাজ বলে ভাবতে পারে?

যেসব ব্যর্থতা শিশুদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, সেগুলো স্বীকার না করে তাদের বীর হিসেবে উদ্‌যাপন করলে আমরা নীরবে এই বার্তাই দিই যে, উদ্দেশ্য মহৎ হলে শিশুর আত্মোৎসর্গও গ্রহণযোগ্য। অথচ যেসব মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, সেগুলোকে আমরা এমনভাবে উপস্থাপন করি, যেন সেগুলোর পেছনে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ছিল।

পার্থক্যটি সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি, একই সঙ্গে তাদের মৃত্যুর ঘটনাকে রোমান্টিক করে তোলার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে পারি। শোকাহত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের যেভাবে স্মরণ করলে সান্ত্বনা ও অর্থ খুঁজে পায়, সেভাবে স্মরণ করার পূর্ণ অধিকার রাখে। আমার উদ্বেগ ব্যক্তিগত শোক প্রকাশ নিয়ে নয়; বরং জনপরিসরে গড়ে ওঠা বয়ান এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। যে ন্যায্য আন্দোলনের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়েছিল, তার ন্যায্যতা আমরা স্বীকার করতে পারি; একই সঙ্গে এ কথাও জোর দিয়ে বলতে পারি যে, শিশুদের কখনোই এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়, যেখানে তাদের জীবন দিয়ে তার মূল্য দিতে হয়।

তাদের প্রতি সবচেয়ে সঠিক এবং সৎ শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা যে, তাদের মৃত্যু কোনো বিজয় নয়; এটি ছিল আমাদের ব্যর্থতা। এটি এমন এক মর্মান্তিক ঘটনা, যার পুনরাবৃত্তি আমাদের অবশ্যই রোধ করতে হবে; একে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা কোনোভাবেই উচিত নয়।

কারা ঝুঁকি নিয়েছিল, আর কারা লাভবান হয়েছে?

সম্ভবত এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন। কোনো স্বজনহারা পরিবার যদি জানতে চায়, এই গণঅভ্যুত্থান থেকে প্রকৃতপক্ষে কারা লাভবান হয়েছে এবং যারা লাভবান হয়েছেন, তাদের সন্তানদেরও কি একই ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তাহলে আমরা কী উত্তর দেব?

প্রশ্নটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলাফল কীভাবে ভাগাভাগি হয়, তার একেবারে কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করে। একটি দেশে যখন পরিবর্তন আসে, তখন শারীরিক ঝুঁকি কারা নেয়, আর সেই পরিবর্তনের সুফল কারা ভোগ করে? ঝুঁকি বহনকারী ও সুফলভোগী কি একই মানুষ?

নিহতদের তালিকার পাশে যদি আমরা পরিবর্তনের ফলে লাভবান হওয়া ব্যক্তিদের নাম রাখি, তাহলে কি দুই তালিকায় কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে? যারা এই পরিবর্তনের সুফল পেয়েছেন, তাঁদের সন্তানদেরও কি গুলির মুখে দাঁড়াতে হয়েছিল? এ ধরনের কোনো তুলনামূলক বিশ্লেষণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তাই আপাতত ঝুঁকি ও সুফল বণ্টনের এই অসমতার ধারণা একটি অনুমান, প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। তবে অনুমানটি সত্য হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তা একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেবে: ঝুঁকির বোঝা বহন করতে হয় কম ক্ষমতাসম্পন্ন, কম সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে; অথচ পরিবর্তনের সুফল পৌঁছে যায় অন্যদের কাছে। এসব প্রশ্ন তোলার অর্থ রাজনৈতিক পরিবর্তন বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই পরিবর্তন কীভাবে সংঘটিত হয় এবং তার মূল্য কাদের দিতে হয়।

আমাদের কি সত্য বলার সাহস আছে?

যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছে, তারা শুধু আনুষ্ঠানিক স্মরণসভা বা সম্মাননা নয়, সত্যটাও জানার অধিকার রাখে। তারা এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করতে পারে, যে সমাজ ঝুঁকি ও সুফল বণ্টনের এই অসমতার দিকে নির্মোহভাবে তাকাবে, অসমতা হলে তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবে এবং তা পরিবর্তনের অঙ্গীকার করবে। তারা জানতে চায়, তাদের সন্তানদের মৃত্যু যেন রাজনৈতিক সংঘাত মোকাবিলার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে, যাতে ভবিষ্যতের কোনো আন্দোলনে আমাদের আরেকটি প্রজন্মকে এমন মূল্য দিতে না হয়।

আমরা কি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারব যে, ‘আপনাদের সন্তানদের সেখানে থাকার কথা ছিল না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের দায়িত্ব যাদের হাতে ছিল, সেই প্রাপ্তবয়স্করা তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। যে ব্যবস্থা তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তা ছিল অন্যায্য। আর ক্ষমতাবানদের সন্তানরা যদি আপনাদের সন্তানদের মতো একই ঝুঁকির মুখে না পড়ে থাকে, তবে সেই বৈষম্যের কথাও আমাদের প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে?’

এ কথা বলা বেদনাদায়ক। কিন্তু আমরা যদি তা এড়িয়ে যাই, তাহলে নীরবতার ওপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করব, মুখে শিশুদের সম্মান জানাব, অথচ যেসব পরিস্থিতি তাদের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, সেগুলো অপরিবর্তিতই রেখে দেব।

সংস্কার কর্মসূচিতে যা অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল

গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী মাসগুলোতে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান গভীর সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে, শিশুদের নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। বিপুল সংখ্যক শিশু নিহত, আহত ও গ্রেপ্তার হয়েছিল; অথচ সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাদের উদ্বেগ ও স্বার্থের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে শোনার কোনো পরিসর রাখা হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের গুরুত্ব কতটা কম, এটি তারই প্রতিফলন। বক্তৃতায় তাদের জন্য শোক প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু জাতি যখন তার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা করেছে, তখন তাদের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তাই সে সময় যেসব প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক সংঘাতের সময় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি কি কমিশনগুলো পর্যালোচনা করেছিল? রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে শিশুদের দূরে রাখতে কি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতি প্রণয়ন করেছিল? শিশুদের গমনাগমন বা বসবাসের এলাকায় যারা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কি করেছিল? দারিদ্র্যের মতো যেসব আর্থসামাজিক বাস্তবতা কিছু শিশুকে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, সেগুলো মোকাবিলায় কি উদ্যোগ নিয়েছিল? প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা কি খতিয়ে দেখেছিল?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক সংগ্রামে শিশুদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া এবং পরে তাদের মৃত্যুকে মহিমান্বিত করার যে সংস্কৃতি, কমিশনগুলো কি তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে কমিশনগুলো হয়তো রাষ্ট্রের কিছু ব্যবস্থার সংস্কার করেছে, কিন্তু রাজনীতির মূল্য কারা বহন করে এবং সমাজ কাদের জীবন বিসর্জনযোগ্য বলে মেনে নিতে প্রস্তুত, সেই মৌলিক প্রশ্নটি অমীমাংসিতই রেখে দিয়েছে।

কী করা প্রয়োজন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শিশুদের স্মৃতি যেন আমাদের শুধু শোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রাখে। তাদের স্মৃতি আমাদের সামনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরে:

শিশুদের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন। সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, নারীবিষয়ক বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য ১১টি স্বতন্ত্র সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল; কিন্তু শিশুদের বিষয়ে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ এখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শিশু অধিকার পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা দিয়েছে। তবে শিশু অধিকার সেখানে বহু বিষয়ের মধ্যে একটি মাত্র বিষয়; এটি শিশুদের জন্য স্বতন্ত্র কমিশনের বিকল্প হতে পারে না। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশু অধিকারবিষয়ক একটি স্বাধীন জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। শিশু অধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এ ধরনের একটি কমিশনের দায়িত্ব হবে শিশু ও তাদের পরিবারের কথা শোনা এবং রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে বাধ্যতামূলক সুপারিশ প্রদান করা। জাতীয় শিশুনীতি, ২০১১-তে প্রস্তাবিত শিশু ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও একই উদ্যোগের অংশ হওয়া উচিত।
সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরী করা। প্রাপ্তবয়স্কদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিশুদের বসবাস, পড়াশোনা ও সমবেত হওয়ার স্থানগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রকে সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ ও কার্যকর করতে হবে। কেউ সেই সীমা লঙ্ঘন করে শিশুদের বিপদের মুখে ফেললে সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তবয়স্কদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বলপ্রয়োগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এমন বাধ্যতামূলক বিধিমালা থাকতে হবে, যাতে শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে এমন জনসমাগমে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ হয়।

যারা মানুষকে সংগঠিত করেন, তাদের দায়বদ্ধতা। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বা মানুষকে রাজপথে নামার আহ্বান জানান, এমন প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো শিশুদের বিপদ থেকে দূরে রাখতে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে। রাজনৈতিক সংগ্রামের ঝুঁকি কখনোই সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

রাজপথের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, অর্থবহ সংলাপ ও অহিংস পদ্ধতিকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে পরিবর্তনের জন্য এমন সংঘাতের প্রয়োজন না হয়, যেখানে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা পরিবারগুলোর সহায়তা। পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সংকটের সময়ও তারা সন্তানদের সুরক্ষিত রাখতে পারে। একই সঙ্গে যেসব আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে কিছু শিশু অন্যদের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে, সেগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিশুর আত্মোৎসর্গকে মহিমান্বিত করার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতায় কোনো শিশুর মৃত্যু, উদ্দেশ্য যতই ন্যায্য ও মহৎ হোক, একটি অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হতে হবে।

প্রতিটি শিশুর হিসাব রাখা। নিহত ও আহত প্রতিটি শিশুর একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা ও নথি থাকতে হবে। এর মধ্যে পথে বসবাসরত শিশুসহ ঝুকিঁপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এমন সকল শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাদের নাম হয়তো কোনো তালিকাতেই ওঠে না। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট প্রকাশ ও ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের হিসাব ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে শিশুরা দৃশ্যমান থাকে।

যারা বেঁচে ফিরেছে, তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার সহায়তা। আহত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব শিশু তাদের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছে, তাদেরও প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিতে হবে। তারা যা দেখেছে, সেই অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে স্কুল, পরিবার ও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হয়নি। শিশুদের আবাসস্থল যেখানেই হোক, পুনর্বাসন ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার কর্মসূচি তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

নিরাপদে মতপ্রকাশের সুযোগ। শিশুরা যে দেশের উত্তরাধিকারী হবে, সে দেশ সম্পর্কে তাদের কথা বলার অধিকার রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন শিশু ফোরাম এবং তাদের প্রভাবিত করে এমন নীতিমালা প্রণয়নে পরামর্শ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের মত প্রকাশের জন্য রাজপথের বাইরে একটি নিরাপদ পরিসর থাকে।

যে সম্মান তাদের প্রাপ্য

জুলাই মাসে প্রাণ হারানো শিশুরা শুধু সনদ, স্মারকচিহ্ন কিংবা প্রাইজবন্ডের চেয়েও বেশি কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে। রাজনৈতিক সংগ্রাম, শিশু সুরক্ষা এবং পরস্পরের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তনই তাদের প্রাপ্য।

তারা এমন এক বাংলাদেশ পাওয়ার অধিকার রাখে, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসা হবে এমনভাবে, যাতে শিশুরা কোনো বিপদের মুখে না পড়ে। যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের সন্তানদের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে হবে না। যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল ও তার দায়ভার ন্যায্যভাবে বণ্টিত হবে। যেখানে শৈশবকে প্রাপ্তবয়স্কদের সংঘাত থেকে পৃথক, সুরক্ষিত একটি পরিসর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যত দিন না আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারছি, যত দিন না সন্তানহারা প্রতিটি মা-বাবার প্রশ্নের সৎ উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছি, তত দিন পর্যন্ত আমরা এই শিশুদের প্রকৃত সম্মান জানাতে পারব না। আমরা কেবল এমন একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করে যাব, যা আমাদের সম্মিলিত অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব করবে, অথচ তাদের প্রাণহানির জন্য দায়ী ব্যবস্থাগুলো আগের মতোই অক্ষত থেকে যাবে।

আমাদের দেওয়া পুরস্কার বা স্বীকৃতিতে প্রকৃত সম্মান নিহিত নেই বরং তা নিহিত রয়েছে আমরা যে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব, তার মধ্যে, যে ভবিষ্যতে কোনো মা-বাবাকে আর প্রশ্ন করতে হবে না, “আমার সন্তান কার স্বার্থে প্রাণ দিল, আর তাদের সন্তানদেরও কি একই মূল্য দিতে হয়েছে?” এই ভবিষ্যৎ নির্মাণই হবে এই শিশুদের জীবনের প্রতি একমাত্র যথার্থ স্বীকৃতি।

লেখক: মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সাবেক ইউনিসেফ কর্মকর্তা ও শিশু অধিকার কর্মী।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স