স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উপায়: বিশেষজ্ঞের দেওয়া ১০টি সহজ পরামর্শ
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। তবে কিছু সহজ উপায় ও অভ্যাস মেনে চললে স্মরণশক্তিকে আবার বাড়ানো সম্ভব। স্মৃতিশক্তি বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দারুণ কিছু কৌশল বলে দিয়েছেন।

১. মস্তিষ্ককে নতুন করে প্রশিক্ষণ দাও
স্মৃতিশক্তি হলো এমন একটি দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে বাড়িয়ে তোলা যায়। সাইকেল বা গাড়ি চালানোর মতো তুমিও তোমার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিতে পারো। ফিউচারিস্টিক লার্নিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা সানিয়া আলম এমন অনেক ‘মেমোরি অ্যাথলেট’ বা স্মৃতিশক্তি প্রতিযোগীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাঁরা গ্রিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস গড়েছেন।
তবে বর্তমান যুগটি শক্তিশালী স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক নয়। আমাদের চারপাশে অতিরিক্ত তথ্য, এআই এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এমনকি এখন কম বয়সীদের মধ্যেও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এর সমাধান কী? স্মৃতিশক্তি বিশেষজ্ঞ সানিয়া আলম পরামর্শ দেন, সবকিছুর জন্য গ্যাজেটের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজের মাথা খাটানোর অভ্যাস করো। এখনকার দিনে মানুষ নিজের ফোন নম্বর বা জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলোও আর মনে রাখতে চায় না, আমাদের এই বদভ্যাস অবশ্যই বদলাতে হবে।

২. নতুন কিছু শেখো
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বারবারা সাহাকিয়ান বলেন, স্মৃতিশক্তি উন্নত করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নতুন কিছু শেখা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখা।
এমন কিছু বেছে নাও, যা তুমি উপভোগ করো, কিন্তু আগে কখনো করোনি। সেটা হতে পারে দাবা খেলা, নতুন কোনো ভাষা শেখা বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো।
নতুন কিছু শেখার সময় মস্তিষ্কের স্নায়ু দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, পড়াশোনা বা চ্যালেঞ্জিং কাজ করলে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের আকার বৃদ্ধি পায়। তাই মস্তিষ্ককে সুস্থ ও সচল রাখতে নিয়মিত নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করো।
৩. বই পড়ার অভ্যাস করো
খুশির খবর হলো, স্মৃতিশক্তি বাড়াতে তোমাকে কোনো কঠিন কোর্সে ভর্তি হতে হবে না। কেবল একটি বই হাতে নিলেই চলবে।
তোমার পছন্দের যেকোনো বই তা গল্প হোক বা তথ্যমূলক মস্তিষ্ক এবং মেজাজের ওপর দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পড়ার অভ্যাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে দারুণ সাহায্য করে।

৪. মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এমন জিনিস দূরে রাখো
প্রযুক্তির আরেকটি খারাপ দিক হলো এটি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। আমরা খুব দ্রুত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে মন সরিয়ে ফেলি। ফলে কোনো নির্দিষ্ট কাজে গভীর মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থীর ক্লাসে মুঠোফোন থাকে, তারা তুলনামূলক খারাপ ফলাফল করে। এমনকি পাশে একটি বন্ধ মুঠোফোন রাখা থাকলেও তা মানুষের মনোযোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই পড়ার সময় ফোন দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৫. ব্যবহার করো ‘মেমোরি প্যালেস’
ম্যানচেস্টারের স্মৃতিশক্তি বিজয়ী কেটি কারমোড বলেন, ‘কোনো কিছু মনে রাখা কোনো জাদু নয়, এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল মানতে হয়।’
কোনো তালিকা বা ধারাবাহিক তথ্য মনে রাখার জন্য তুমি ‘মেমোরি প্যালেস’ বা ভ্রমণ কৌশল ব্যবহার করতে পারো। তোমার পরিচিত কোনো রাস্তার কথা চিন্তা করো এবং সেই পথের বিভিন্ন জায়গায় যেসব জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন, সেগুলোকে কল্পনা করো।
কেনাকাটার তালিকার প্রথম জিনিসটি ঘরের দরজায়, দ্বিতীয় জিনিসটি বারান্দায় কল্পনা করো। এরপর মানসিকভাবে সেই পথ ধরে হেঁটে জিনিসগুলো মনে করার চেষ্টা করো। কোনো বক্তৃতা বা পড়ার বিষয় মনে রাখার জন্যও এই দারুণ কৌশলটি কাজে লাগাতে পারো।
৬. আর কখনো ভুলবে না জন্মদিনের তারিখ
তারিখ মনে রাখার জন্য স্মৃতিশক্তি বিজয়ী কেটি কারমোডের কিছু দারুণ কৌশল রয়েছে। তিনি প্রতিটি মাসের একটি বিশেষ রং বা অর্থ ঠিক করে নেন এবং প্রতিটি দিনের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বস্তুকে মিলিয়ে নেন। তবে কোনো মানুষের জন্মদিন মনে রাখা তাঁর কাছেও বেশ কঠিন মনে হয়।
জটিল বিষয়গুলোকে মনে রাখার জন্য তিনি প্রতীকী পদ্ধতি ব্যবহার করেন। অক্টোবর মাসটি মনে রাখার জন্য তিনি একে একটি কুমড়োর সঙ্গে মিলিয়ে নেন। আবার ২ সংখ্যাটিকে একটি রাজহাঁসের মতো কল্পনা করেন। এর মানে হলো, ২ অক্টোবর মানে হলো, একটি কুমড়োর ওপর বসে থাকা রাজহাঁস।
যদি তোমার মনে ছবি আকার ক্ষমতা কমও থাকে, তবে বিষয়টিকে একটি মজার গল্পের মতো সাজিয়ে ফেলো এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন মানুষকে যুক্ত করো।

৭. পরীক্ষায় ভালো করার কিছু কৌশল
পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ‘নেমোনিক’ বা স্মৃতি সহায়ক কৌশল বেশ কার্যকর। এর মধ্যে একটি হলো ‘অ্যাক্রোনিম’ বা আদ্যক্ষর দিয়ে শব্দ তৈরি করা।
প্রথমে পুরো বিষয়টি ভালোভাবে পড়ে একটি ধারণা তৈরি করে নাও। এরপর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর প্রথম অক্ষরগুলো দিয়ে নতুন একটি শব্দ বা বাক্য বানিয়ে ফেলো। রংধনুর রঙের ক্রম মনে রাখার জন্য ইংরেজিতে বিশেষ বাক্য ব্যবহার করা হয়।
পড়াশোনার সময় পাওয়ারপয়েন্টে স্লাইড তৈরি করতে পারো। স্লাইডের ব্যাকগ্রাউন্ড এমনভাবে সাজাও, যা মূল বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলে।
তথ্য মনে রাখার জন্য ফ্ল্যাশকার্ড বেশ কাজে দেয়। তবে শুধু ফ্ল্যাশকার্ড ওলটালেই হবে না, তথ্যগুলো প্রথমবার মনে রাখার জন্য নিজের মাথা খাটাতে হবে। পড়া মনে রাখার জন্য ‘মাইন্ড ম্যাপ’ বা চিন্তার মানচিত্র বানিয়ে মূল বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে শাখা-প্রশাখার মতো সাজিয়ে নিতে পারো।

৮. অনুশীলনেই বাড়ে দক্ষতা
কোনো পড়া দীর্ঘদিন মনে রাখতে হলে নিয়মিত তা চর্চা করতে হবে। প্রতিদিন পড়ার পর পরের দিন তা দেখবে, তারপর কয়েক দিন বিরতি দিয়ে আবার দেখবে। এভাবে পড়ার মাঝে ব্যবধান বাড়িয়ে গেলে বিষয়টি খুব সহজে মাথায় গেঁথে যায়।
ভবিষ্যতে কোনো জরুরি কাজ করার কথা মনে রাখার জন্য তুমি অ্যালার্মের সাহায্য নিতে পারো। দুপুরের খাবারের পরপরই তোমার চুল কাটতে যাওয়ার কথা। বিষয়টি মনে রাখার জন্য তুমি কাঁচির ছবি বা কল্পনার সঙ্গে ফ্রিজ খোলার কাজটি মিলিয়ে নিতে পারো।

৯. পর্যাপ্ত ঘুম কেন জরুরি
কেমব্রিজের অধ্যাপক বারবারা সাহাকিয়ান রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমান। তাঁর মতে, ঘুমানোর সময়ই সারা দিন যা শেখা হয় তা মস্তিষ্কে স্থায়ী রূপ নেয়। তাই পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমিয়ে জেগে থাকা মস্ত বড় ভুল।
ক্লান্ত মস্তিষ্কে কোনো কিছু ঠিকমতো মুখস্থ করা যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মাথায় ব্রেইন ফগ বা একধরনের জড়তা তৈরি হয়। তাই সজাগ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ধরে রাখতে নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত ঘুমাও। পড়ার ফাঁকে ছোট একটি ন্যাপ বা ঝিমুনিও মস্তিষ্ককে তথ্য গুছিয়ে রাখতে দারুণ সাহায্য করে।

১০. একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি বিষয় শেখো
এক বিষয়ে শুধু লেগে না থেকে পালা করে কয়েকটি বিষয় পড়ো। গণিত করো কিছুক্ষণ, এরপর ইংরেজি, পরে বিজ্ঞান। এই পদ্ধতিকে বলে ইন্টারলিভিং। এতে মস্তিষ্ক বিষয়গুলো আলাদা করে চিনতে পারে, বুঝতে পারে কোনটা কোথায় কাজে লাগে। শেখা হয় ভালোভাবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সূত্র: প্রথম আলো