|
| |
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরির পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা!

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১০ এএম
১৯৮ পঠিত
৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরির পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা!
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স থেকে রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকারদের জড়িত থাকার জোরালো সন্দেহ করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার অত্যন্ত দক্ষ হ্যাকিং গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলা...

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স থেকে রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকারদের জড়িত থাকার জোরালো সন্দেহ করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার অত্যন্ত দক্ষ হ্যাকিং গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটর’ এ হামলা চালিয়েছে। চুরি করা অর্থ দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে চালানো এই হামলাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিশ্লেষকরা। দ্য গার্ডিয়ানকে ক্রিপ্টো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের প্রধান বিজ্ঞানী টম রবিনসন বলেন, এটি সম্ভবত ইতিহাসের যে কোনো ধরনের সবচেয়ে বড় চুরি। এর আগে গত বছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবারের হামলা।

বিন্যান্স জানিয়েছে, গ্রাহকদের সব ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বহন করবে। চুরি হওয়া সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার শনাক্ত করে জব্দ করার চেষ্টা চলছে। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেছেন, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ এবং সব ক্ষতি পূরণ করা হবে। এজন্য ৬৩৪ কোটি ডলার বরাদ্দ রেখেছে বিন্যান্স।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বিন্যান্সের এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। এর ফলে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের একটি ব্যবস্থায় প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে পরে বিন্যান্স জানায়, অত্যন্ত জটিল এই হামলায় আরও কয়েকটি নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্রিপ্টো বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস, এলিপটিক ও চেইনঅ্যানালাইসিস তিনটিই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার ‘ট্রেডারট্রেইটর’ গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। টিআরএম ল্যাবস উচ্চ মাত্রার নিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, হামলার ধরন উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের পরিচিত কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে দক্ষ হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলোর একটি ট্রেডারট্রেইটর। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোই তাদের প্রধান কাজ। গোষ্ঠীটির সদস্যদের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সাইবার কর্মসূচির অভিজ্ঞ অপারেটররা রয়েছেন। এর আগে দেশটির আর্থিক খাতকেন্দ্রিক হ্যাকিং ইউনিট এপিটি৩৮-এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

হ্যাকাররা সাধারণত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার নির্মাতা ও তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করে। কখনো ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে, আবার কখনো ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলা হয়। চাকরির সাক্ষাৎকারের নামে প্রার্থীদের ক্ষতিকর সফটওয়্যার ডাউনলোড করানো হয়। এর মাধ্যমে তাদের লগইন তথ্য ও অন্যান্য সংবেদনশীল উপাত্ত হাতিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় প্রবেশ করে হ্যাকাররা।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের হুমকি গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক রাফে পিলিং বলেন, বিন্যান্সে হামলার প্রাথমিক তথ্য উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের পরিচিত কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়, তা বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটি অত্যন্ত দক্ষ।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের হ্যাকাররা বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশের জন্য বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। বিন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কর্মীদের কার্যক্রম বুঝে নিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করে তারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ উত্তর কোরিয়া অন্তত ৬৭৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে বলে হিসাব দিয়েছে চেইনঅ্যানালাইসিস। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট এক্সচেঞ্জ থেকে চুরি হওয়া ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদও রয়েছে।

এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে বিটগেট নামের আরেকটি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম থেকে ৩৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির অভিযোগ রয়েছে। এসব হিসাব বিবেচনায় উত্তর কোরিয়ার চুরি করা ক্রিপ্টো সম্পদের মোট পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডিটেক্সের গবেষক মাইকেল বার্নহার্ট।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির পর অর্থ পাচারের জন্য হ্যাকাররা চীনের সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোর সহায়তা নেয়। এসব চক্রের মাধ্যমে অর্থের উৎস আড়াল করে তা বিভিন্ন পথে ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় জানায়, উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গোপনে চাকরি নিচ্ছেন। এসব চাকরি থেকে পাওয়া অর্থ দেশে পাঠানোর পাশাপাশি তারা সংবেদনশীল তথ্যও চুরি করছেন। হ্যাকারদের চুরি করা অর্থ এবং বিদেশে কর্মরত এসব ব্যক্তির আয় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচিতে অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থ জোগাতে দেশটি ক্রমেই সাইবার অপরাধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি ও অর্থ পাচার এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বার্নহার্টের মতে, ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তিতে ‘পূর্ণ আধিপত্য’ অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। দেশটির ড্রোন কর্মসূচির অগ্রগতির সঙ্গে ক্রিপ্টো চুরি এবং বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত উত্তর কোরীয় নাগরিকদের আয় সরাসরি যুক্ত।

তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাতেও সহায়তা করছে উত্তর কোরিয়া। দেশটি রাশিয়ায় সেনা, গোলাবারুদ ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে। এসব কার্যক্রমে অর্থ জোগানোর পেছনেও একই আর্থিক নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তাই ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরিকে শুধু কোনো বিনিময় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।

সূত্র : রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান

সূত্র: কালবেলা