গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৪৮ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম

প্রাথমিকের বই ছাপা ৯৩, মাধ্যমিকের ৫৮ শতাংশ, শতভাগ সরবরাহের লক্ষ্য নভেম্বরে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রাথমিকের বই ছাপা ৯৩, মাধ্যমিকের ৫৮ শতাংশ, শতভাগ সরবরাহের লক্ষ্য নভেম্বরে

২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির মানসম্মত পাঠ্যবই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। তবে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপায় অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই মুদ্রণে পিছিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছাপাখানা। এ পরিস্থিতিতে কাজের গতি বাড়াতে নজরদারি জোরদার করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবির ২৮ অক্টোবরের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে মোট বইয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বইয়ের। বিশেষ করে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজে ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে সংস্থাটি।

এনসিটিবির তথ্যমতে, এবার সারা দেশে ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পেয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও অন্তর্ভুক্ত। গত বছরের তুলনায় এবার এক মাস আগে মুদ্রণকাজ শুরু হয়েছে।

প্রাথমিকের বই ছাপা প্রায় শেষ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। এ হিসাবে মুদ্রণ অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি বইয়ের প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বই ছাপানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি বই ছাপা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ স্তরে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৯টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি ছাপা হয়েছে। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি ২ কোটি ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪২২টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বই ছাপা হয়েছে, যা মোট বইয়ের ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ স্তরে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫টি বইয়ের পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে।

৩২ প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ

বই ছাপার কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে পিছিয়ে থাকা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, কাজের গতি কম থাকায় ইতোমধ্যে ৩২টি প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ বাতিল করে অন্য প্রেসের মাধ্যমে মুদ্রণকাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপার কাজও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। তবে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার গতি কিছুটা কম। কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বইয়ের মান ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একাধিক দল মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে বলেও জানান তিনি।

নিম্নমানের ৯ লাখ ফর্মা ও ১২ হাজার বই বাতিল

নতুন পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। মুদ্রণকাজ তদারকিতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। এসব দলের পরিদর্শনে মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন ছাপাখানার নিম্নমানের ফর্মা, বই ও কভার বাতিল করা হয়েছে।

এনসিটিবির মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, আলিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, আনন্দ প্রিন্টিং প্রেস, আমিন আর্ট প্রেস, অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেস ও অনুপম প্রিন্টিং প্রেসসহ মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের ৯ লাখ ফর্মা এবং ১২ হাজার নিম্নমানের ছাপানো বই বাতিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, বইয়ের মানের প্রশ্নে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মান বজায় না থাকায় নিম্নমানের ফর্মা ও বই বাতিল করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই নিয়ে উদ্বেগ

এনসিটিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই মুদ্রণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি অত্যন্ত কম। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেস, আলিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, অনুপম প্রিন্টার্স লিমিটেড, অ্যারিস্টোক্রেটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, আমিন আর্ট প্রেস, দোয়েল প্রিন্টার্স ও বর্ণমালা প্রেস।

চুক্তি অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মধ্যে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করার কথা। তবে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা কয়েকটি লটে এ লক্ষ্য অর্জনের মতো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণ ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও জানান, এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি বইয়ের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পর মানের কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হতে পারে।

নিম্নমানের বই সরবরাহে ছাড় নয়

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, উপজেলা পর্যায়ে নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই সরবরাহ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে বই মুদ্রণের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম দামের অজুহাতে নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না থাকে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বইয়ের পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের বইও দেশের বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানোর কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে শতভাগ মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া, যাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পায়। সূত্র: বাসস

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।