চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ আর্থিক চাপে পড়ছে। শুধু ২০২২ সালেই এই ব্যয়ের কারণে ৭২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র মানুষের ওপর, আর নিজের পকেট থেকে খরচের বড় অংশই যাচ্ছে ওষুধ কিনতে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটকে এই গবেষণায় সহায়তা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সুইডিশ দূতাবাস। গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালের খানা আয়–ব্যয় জরিপের তথ্য এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষ নিজের পকেট থেকে কী পরিমাণ ব্যয় করে, মানুষ চিকিৎসার কোন খাতে ব্যয় করে, এই ব্যয়ের প্রভাব মানুষের ওপর কতটা পড়ে—এসব দিক তুলে ধরা।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, উপস্থাপিত ফলাফল বেহাল স্বাস্থ্য খাতের এক অপূর্ব নিদর্শন। ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল—এই ১৭ বছরের শুরুর দিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। আর বাকি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল ফ্যাসিস্ট সরকার। সুতরাং যে চিত্র গবেষণায় উঠে এসেছে, তার দায় বিএনপি সরকারের ওপর বর্তায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বা চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষের আর্থিক কষ্ট বেড়ে চলেছে। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টে ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। এই কষ্ট মানুষের কমেনি। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়ে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ।
সমস্যা গভীর হচ্ছে
গবেষণা ফলাফল উপস্থাপনার শুরুতে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে দেশে একধরনের স্ববিরোধী পরিস্থিতি দেখা যায়। ২০০৫ সালে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। ২০২২ সালে সেই হার কমে হয় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, ২০০৫ সালে আর্থিক কষ্ট বা চাপে ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ, ২০২২ সালে সেই হার বেড়ে হয় ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের হার কমছে অথচ আর্থিক চাপে থাকা মানুষ বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বা চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষের আর্থিক কষ্ট বেড়ে চলেছে। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টে ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। এই কষ্ট মানুষের কমেনি। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়ে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ।
এই আর্থিক চাপ দেখা যাচ্ছে ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র সমাজের সব শ্রেণির ওপর। আর্থিক চাপের কারণে অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। ২০২২ সালে ৭২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় শুধু স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে। কারণ, এই ব্যয়ের বড় অংশ যায় মানুষের নিজের পকেট থেকে।
ব্যয় কোথায় হয়
গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কত বা কত শতাংশ, তেমন কোনো পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়নি। ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বা আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার (ওওপি) নির্ণয় করা এই গবেষণার বিষয় ছিল না। তবে কত মানুষ চিকিৎসার কাজে নিজের পকেট থেকে খরচ করে এবং নিজের পকেট থেকে কোন খাতে কত ব্যয় করে, তার হিসাব দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে দেখা গেছে, ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে খরচ করে। বছর বছর এই হার বেড়েছে। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০৫ সালে চিকিৎসার জন্য একটি খানার নিজস্ব গড় ব্যয় ছিল ৭০৯ টাকা। ২০২২ সালে বেড়ে হয় ৩ হাজার ৪৯৩ টাকা। নিজের পকেট থেকে যারা ব্যয় করে না, ধরেই নেওয়া হয় তারা সরকারি হাসপাতাল থেকে বা এনজিওদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা নেয়।
চিকিৎসা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধে ও রোগনির্ণয়ে। ২০২২ সালে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসা ব্যক্তিরা চিকিৎসার মোট ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ ব্যয় করে ওষুধের পেছনে, আর হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের ওষুধে ব্যয় হয় ৩৫ শতাংশ। বহির্বিভাগের রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের ১১ শতাংশ ও ভর্তি রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের ২২ শতাংশ রোগনির্ণয়ে ব্যয় হয়। অন্যান্য খরচের মধ্যে আছে চিকিৎসকের পরামর্শ, হাসপাতালে থাকার খরচ, যাতায়াত খরচ।
বেসরকারি হাসপাতাল বেশি ব্যয়বহুল, এই তথ্য গবেষণাতে উঠে এসেছে। ২০২২ সালে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর পকেট থেকে গড় খরচ ছিল ২ হাজার ৬৮৮ টাকা। আর বেসরকারি হাসপাতালে ছিল ৪ হাজার ৮০৮ টাকা। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকলে খরচ ২১ হাজার ৫৪৭ টাকা, আর বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকলে গড় খরচ ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা। আর এনজিও হাসপাতালে ভর্তি থাকলে খরচ ২২ হাজার ২৮ টাকা।
২০১৬ সালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ৮ দশমিক ১ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে দেখা গেছে, যত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে তার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অর্থ ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
আর্থিক কষ্ট কেন বাড়ছে
গবেষকেরা বলছেন, বেশ কিছু কারণে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় এবং আর্থিক কষ্ট বাড়ছে। মানুষের আয়ের তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে খানার আয় বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, একই সময় স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।
২০১৬ সালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ৮ দশমিক ১ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে দেখা গেছে, যত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে তার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অর্থ ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আরেক কারণ সরকারি হাসপাতালে রোগী যাওয়ার হার কমেছে। ২০১৬ সালে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল বেছে নিত। কিন্তু ২০২২ সালে দেখা গেছে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল বেছে নিচ্ছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে ফার্মেসির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য ফার্মেসি বেছে নিত। ২০২২ সালে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য ফার্মেসি বেছে নেয়।
আর্থিক কষ্ট বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীর হারও বেড়ে গেছে। ২০০৫ সালে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়া রোগী ছিল ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা মানুষকে দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো রোগে আজীবন ওষুধের জন্য ব্যয় করে যেতে হয়।
বিপর্যয় সবখানে সমান নয়
স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেশের সব অঞ্চলের মানুষ সমানভাবে আর্থিক কষ্টে পড়ছে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলও বদলে যেতে দেখা গেছে। ২০০৫ সালে কষ্টে পড়া মানুষের হার সবচেয়ে বেশি ছিল রাজশাহী বিভাগে এবং সবচেয়ে কম ছিল বরিশাল বিভাগে। আবার ২০২২ সালে দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক কষ্টে পড়া মানুষের হার বরিশাল বিভাগে বেশি। সবচেয়ে কম ঢাকা বিভাগে।
আবার শহরের থেকে গ্রামের মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে বেশি আর্থিক কষ্টে পড়ে। অন্যদিকে শহরের তুলনায় চিকিৎসায় গ্রামের মানুষের নিজস্ব ব্যয় বেশি।
গবেষকেরা দেখেছেন, চিকিৎসার কারণে আর্থিক কষ্টে পড়ার ঘটনাটি মূলত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে কেন্দ্রীভূত। সবচেয়ে দরিদ্র যারা তাদের ৯০ দশমিক ৮ শতাংশের ওপর এই চাপ পড়ে। আর সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে তা ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ালেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে। গবেষকেরা বলছেন, এটা নিশ্চিত না যে সরকারি বরাদ্দ বাড়ালেই সমাজের দরিদ্ররা তার সুবিধা ঠিকমতো পাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের পরিচালক (গবেষণা) এস এম আবু হোরায়রা। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার সূচকের ওপর বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার মো. তৌহিদুল ইসলাম। যুক্তরাজ্য থেকে অনলাইনে গবেষণার পদ্ধতি উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয় পরামর্শক সায়েম আহমেদ। অনুষ্ঠানে জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, এই গবেষণায় কিছু নির্মম সত্য উঠে এসেছে। এসব সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। গবেষণার মধ্যেই সমাধানের পথ আছে।
সূত্র: প্রথম আলো