দুই মাসের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যর্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে সংস্থাটির কার্যক্রমে ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে এমন হুঁশিয়ারি দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী দুই মাস পর তিনি আবার ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এর মধ্যে দৃশ্যমান ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চান তিনি।
ওয়াসার কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত সাত মাসে সংস্থাটির কার্যক্রমে নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন কিংবা চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যায়নি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পানির সংকট তৈরি হলে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ওয়াসা থেকে পরিচালনা পর্ষদ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
দেশের সব ওয়াসা থেকে পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য বিদ্যমান আইন সংশোধন করা হবে বলে জানান মীর শাহে আলম।
এ সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনে ওয়াসাগুলোয় বোর্ড রাখার বিধান রয়েছে। তবে সরকার যেকোনো সময় বোর্ড গঠন বা ভেঙে দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ওয়াসার বোর্ডগুলো জনসেবামূলক কাজে বাধা সৃষ্টি করছে কিংবা অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করছে। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা অঞ্চলে পাইপলাইন সংযোগের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি পূর্বাচল এলাকায় পানি সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে হবে।
রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা ৩১৪ কোটি লিটার
ঢাকা ওয়াসার পানির চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য তুলে ধরে সভায় জানানো হয়, রাজধানীতে বর্তমানে দৈনিক পানির চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই ৩১৪ কোটি লিটার। জনসংখ্যা ও বাসাবাড়ি বাড়ার সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানির ৭৪ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং বাকি ২৬ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য ভূ-উপরিস্থ পানিনির্ভর প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি।

অবৈধ পানির লাইন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা
ওয়াসার আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, সেবার মান ঠিক রেখে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
পাশাপাশি পানির মিটার রিডিং ও বিল আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। ২০৫০ সালের পানির চাহিদা বিবেচনায় ওয়াসার আধুনিকায়নের জন্য নতুন ও পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো তৈরি করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলেন।
রাজধানীতে অবৈধ পানির সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবৈধ ও চোরাই পানির লাইন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব কাজে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া যাবে না।
একই সঙ্গে ওয়াসার সিবিএ ও কর্মচারী সংগঠনগুলোকেও সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা ব্যাহত করা যাবে না।
ব্রাশ, শেভ করার সময় পানির কল বন্ধ রাখা
পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। ব্রাশ করা কিংবা শেভ করার সময় অপ্রয়োজনে পানির কল খোলা না রাখার মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রচার চালানোর নির্দেশ দেন তিনি।
মীর শাহে আলম বলেন, দুই মাস পর আবার পর্যালোচনায় এসে ওয়াসার কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চান তিনি। নগরবাসীকে পানি সরবরাহের বিষয়ে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়াই এর উদ্দেশ্য।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহা. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন, সিবিএর নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: প্রথম আলো