গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম

ইউক্রেনে রাশিয়ার অবরোধ: খাদ্যনিরাপত্তার হুমকিতে বাংলাদেশের করণীয়

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ইউক্রেনে রাশিয়ার অবরোধ: খাদ্যনিরাপত্তার হুমকিতে বাংলাদেশের করণীয়

বিশ্বের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ যখন ক্ষুধার মুখে, তখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শস্য পরিবহন পথ আবারও হামলার শিকার হচ্ছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী ও স্থলপথ ব্যবহার করে ইউক্রেন। রাশিয়া এসব পথে ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানির সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করছে। দেশটির বন্দর, গুদাম, অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থা, পণ্যবাহী জাহাজ ও কৃষি অবকাঠামোয় পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি ও সারের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। 

এটি অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা। ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যায়, দাম বাড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো। 

এ বছরের আগস্টে ইউক্রেনে ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার পর পরিবহন পথ ও রপ্তানি স্থাপনায় হামলার কারণে শস্য, তৈলবীজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশের ভেতরেই আটকে পড়ে।

সারশিল্পকে না বাঁচালে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না

২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দেশটির শস্য রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 

অক্টোবরের মধ্যে ইউক্রেনে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জায়গার সংকট দেখা দিতে পারে। নভেম্বর নাগাদ শস্য, তৈলবীজ ও প্রক্রিয়াজাত পশুখাদ্যসহ ৯০ লাখ টনের বেশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জায়গার অভাবে বাইরে পড়ে থাকতে পারে। যে ফসল লাখ লাখ মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে পারত, তা-ই হয়তো আটকে থাকবে। কৃষকেরা এ মৌসুমের ফসল বিক্রি করতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে বীজ বপনের জন্য তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে না। এতে ভবিষ্যৎ উৎপাদন কমবে এবং সংকট আগামী বছরেও ছড়িয়ে পড়বে। 

রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জীবনরেখায় হামলা থামালে তার সুফল ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছাবে। বাংলাদেশও এর সুফল পাবে। কারণ, এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শুধু দেশের ভেতরে কী উৎপাদিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না; সমুদ্রপথে নিরাপদে কীভাবে খাদ্য আমদানি করা যাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভরশীল।

বিশ্বে ইতিমধ্যে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে রয়েছে। তাই এই সংকটের গুরুত্ব অপরিসীম। সমুদ্রপথে পরিবহন, জ্বালানির বাজার, বাণিজ্যপ্রবাহ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটও এর প্রমাণ। খাদ্যের দাম ও সরবরাহে নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সবচেয়ে কম যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠীর, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। 

বাংলাদেশের এ পরিস্থিতির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত। এ দেশে গম দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত খাদ্যশস্য। গম ও গমজাতীয় খাবারের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে বাংলাদেশ। 

এই নির্ভরতার কারণে বিশ্বের প্রধান গম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে বিঘ্ন ঘটলে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে। এটি নিছক আশঙ্কা নয়। চার বছর আগে যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত এর প্রভাব টের পেয়েছিল। গম আমদানির খরচ বেড়ে যায়, বাড়ে দেশের বাজারে গম ও গমজাতীয় খাবারের দাম। দেশে মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। 

লোকায়ত কৃষিকে উপেক্ষা করে খাদ্যনিরাপত্তা সম্ভব?

রাশিয়া শুরু থেকেই বিষয়টি বুঝেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খাদ্যসংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা দেশটির বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইউক্রেনের রপ্তানি পথগুলোতে হামলা চালিয়ে রাশিয়া শুধু কিয়েভকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে না; খাদ্যকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অংশ বানালে বাকি বিশ্ব কতটা চাপ সহ্য করবে, সেটিও পরীক্ষা করছে। এই ক্ষতির শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। 

বিশ্বের খাদ্যবাজারে ইউক্রেনের গুরুত্বের কারণেই পরিস্থিতিটি এত উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বের মোট ভুট্টা রপ্তানির ১৫ শতাংশ, গম রপ্তানির ১০ শতাংশ, যব রপ্তানির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেল রপ্তানির পুরো ৫০ শতাংশ সরবরাহ করত ইউক্রেন। এশিয়ার বাজারেও দেশটির কৃষিপণ্যের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। চলতি বছরও ইউক্রেনে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কিন্তু ফসল উৎপাদন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সেই ফসল বন্দর, জাহাজ ও পরিবহন পথ পেরিয়ে যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের কাছে পৌঁছাতে হয়। 

সৌদি-হুতি যুদ্ধে বাংলাদেশের শ্রমিক কেন আলোচনার কেন্দ্রে

ইউক্রেনের রপ্তানি সচল রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ তৈরি করেছে। এগুলো দেশটির অর্থনীতির জন্যও জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করছে। তবে স্থলপথ ও নদীপথের বিকল্প ব্যবস্থা ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমাতে পারলেও বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ খাদ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপদ সমুদ্রপথের বিকল্প হতে পারে না। সমুদ্রপথে অবাধে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা তাই বৈশ্বিক নিরাপত্তার বিষয়। বাংলাদেশের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্য অবাধ ও পূর্বানুমানযোগ্য থাকা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। দায়িত্বশীল দেশগুলোর এ বিষয়ে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। এ কারণেই কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য রপ্তানির স্থাপনা, অবকাঠামো ও বেসামরিক জাহাজে হামলা অবিলম্বে বন্ধ রাখার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। এমন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করবে, খাদ্যবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সরকারকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেবে। 

বিশ্ব খাদ্য দিবস: ‘মানুষকেন্দ্রিক’ খাদ্যব্যবস্থার বদল জরুরি

বিশ্বকে খাদ্যকে যুদ্ধের আরেকটি অস্ত্র হতে দেওয়া চলবে না। ইউক্রেনীয়দের প্রতিদিনের দুর্ভোগ বন্ধ করতে এবং লাখ লাখ মানুষের নির্ভরশীল বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করে—এমন যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন।

রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জীবনরেখায় হামলা থামালে তার সুফল ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে পৌঁছাবে। বাংলাদেশও এর সুফল পাবে। কারণ, এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শুধু দেশের ভেতরে কী উৎপাদিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না; সমুদ্রপথে নিরাপদে কীভাবে খাদ্য আমদানি করা যাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভরশীল।

● লেখকেরা বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেনের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।