প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম || প্রকাশের তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি পাঁচজনের মরদেহ শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে আসছে। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়ার পর তাদের মরদেহ পরিবারের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির সরকার। ফলে অবশেষে ফুরোচ্ছে পরিবার ও স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার প্রহর।
তবে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলেও থেকে যাচ্ছে ঋণের বোঝা। আড়াই মাস পর প্রিয়জনের নিথর দেহ ফেরা নিয়ে শোকের ছায়া যেমন আরও ঘনীভূত হয়েছে, তেমনি মহাজন ও এনজিওর ঋণের জাঁতাকলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত প্রবাসীদের পরিবারগুলো।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ দূতাবাস রিয়াদ, সৌদি আরবের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি কর্মী মারা যান। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট ৯ জনের মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়। অবশিষ্ট ৭টি মরদেহের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ৭টি মরদেহের মধ্যে ২টি মরদেহ নাটোর জেলার।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইতোমধ্যে মরদেহগুলো বাংলাদেশে প্রেরণের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া বাকি নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।
নওগাঁর নিহত পাঁচ প্রবাসী হলেন, নওগাঁ পৌর শহরের পার-নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে নওগাঁর ছিলেন ১২ জন। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হলেও আইনি ও পরিচয় শনাক্তকরণ জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ পড়ে ছিল সৌদির হিমঘরে।
প্রিয়জনের মুখটি শেষবার দেখার আকুতিতে এতদিন প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরেন স্বজনরা। আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ মজনু সরদার ও ছাইদা বেগম দম্পতি ছেলে মাসিদুল সরদারের লাশের খোঁজে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন ইউএনও কার্যালয়ে। সজল চোখে মজনু সরদারের আকুতি ছিল, যাওয়ার আগে শুধু বাপটার মুখটা শেষবার দেখতে চাই। অবশেষে তাদের সেই করুণ অপেক্ষার ইতি ঘটছে। অন্যদিকে ফোনে ছেলে মিনহাজের ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন মধ্যবোয়ালিয়ার পারুল আক্তার, যার বুকে আজ কেবলই শূন্যতা।
মরদেহ ফিরে পাওয়ার স্বস্তি থাকলেও পরিবারগুলোর জন্য বড় সংকট হয়ে উঠেছে ঋণের চাপ। বিদেশের মাটিতে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন এই প্রবাসীরা। সেই স্বপ্ন ছাই হয়ে গেলেও দেশে রয়ে গেছে দেনার পাহাড়।
আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে স্বামীকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি পাঠিয়েছিলেন। একমাত্র সম্বল ভিটাবাড়িটি বন্ধক রয়েছে মহাজনের কাছে। এর মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও শোধ হয়নি। দুটি অবুঝ সন্তানকে নিয়ে পাওনাদারদের তাগাদায় এখন পাগলপ্রায় এই গৃহবধূ।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়েজ অর্নার্স বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেগুলো কীভাবে দ্রুত আনা যায় সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর বাকি পাঁচজনের মরদেহ আসছে। পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।
তিনি আরও বলেন, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও রিয়াদ দূতাবাসের সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালায়ের বরাত দিয়ে ইউএনও বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় শুরুতে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও বর্তমানে আত্রাই উপজেলার ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে গত ২৭ আগস্ট আত্রাই উপজেলার নিহত ১১ জনের মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে আসে।
সূত্র: কালবেলা