যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক মহাকাশ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘এক্সঅরবিটা ইনকরপোরেটেড’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিন এনগুয়েন। এই পরিচয় শুনে মনে হতে পারে কোনো অভিজ্ঞ বা বয়স্ক মানুষের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, মিন এনগুয়েনের বয়স মাত্র ১৭ বছর।
সম্প্রতি সে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফেলোশিপ ‘ইডব্লিউওআর’-এ যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে সে এই ফেলোশিপের ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার রেকর্ড গড়েছে।
ইডব্লিউওআর ফেলোশিপে সুযোগ পাওয়া খুবই কঠিন। এখানে প্রতি ১ হাজার জন আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ১ জনকে বেছে নেওয়া হয়। এই ফেলোশিপে যোগ দেওয়া উদ্যোক্তারা গড়ে ১ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করে থাকেন।
ছয় মাসে যারা যুক্ত হয়েছে, তাদের ২৫ শতাংশের কোম্পানির বাজারমূল্য শত মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া এই ফেলোশিপের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠাতারা এমন ৯টি কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, যার একেকটির বাজারমূল্য ১০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে।

মহাকাশে স্যাটেলাইটের জট ও সংঘর্ষের ঝুঁকি
মিন এনগুয়েনের কোম্পানি স্যাটেলাইটের জন্য একটি বিশেষ ‘অটোপাইলট’ বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করছে। মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো স্যাটেলাইটগুলোর অপারেটররা প্রায় প্রতিদিনই এমন সতর্কতা পান যে কক্ষপথে থাকা অন্য কোনো বস্তু তাদের স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে আসছে। মহাকাশবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে কনজাংশন বা সংঘর্ষের ঝুঁকি বলা হয়।
এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা ঠিক করতেই অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা কেটে যায়। প্রথমে পৃথিবী থেকে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর বিশ্লেষকেরা তা খতিয়ে দেখেন। এরপর স্যাটেলাইট সরানোর একটি পরিকল্পনা তৈরি করে তা অনুমোদন করিয়ে স্যাটেলাইটের কাছে নির্দেশ পাঠাতে হয়। অথচ এই পুরো সময়টাতে স্যাটেলাইটটি একটু একটু করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের দিকেই এগিয়ে যেতে থাকে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে মহাকাশ রক্ষা
এক্সঅরবিটার তৈরি এই বিশেষ ব্যবস্থাটির নাম ‘আরবিটার’। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে স্যাটেলাইটের ভেতরে বসেই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। রকেট বা স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর আগেই বিজ্ঞানীরা কিছু নিয়ম ঠিক করে দেন। সংঘর্ষের ঝুঁকি কতটুকু হলে মেনে নেওয়া যাবে, স্যাটেলাইট নিজে থেকে কীভাবে পথ বদলাবে এবং কখন মানুষের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
আরবিটার কেবল এই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করে। যখনই কোনো পরিস্থিতি এই সীমার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন সেটি সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে থাকা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কাছে খবর পাঠিয়ে দেয়। এ ছাড়া সিস্টেমের প্রতিটি কাজের হিসাব বা রেকর্ড জমা থাকে, যা পরে যেকোনো সময় পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব।
মিন এনগুয়েন বলেন, ‘মহাকাশে খবরের কোনো ঘাটতি নেই, আসল সমস্যা হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার। সবাই দেখতে পায় যে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো কার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার আছে। আমরা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করছি, যার মাধ্যমে স্যাটেলাইটের মালিকেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ঠিক রেখেই মহাকাশযানের ভেতরেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে পারছেন।’

যেভাবে হলো পরিচয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মিন এনগুয়েন জন অ্যাভেরা নামের এক অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে মিলে এই কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। অ্যাভেরা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএমের সাবেক কর্মী এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর ন্যাশনাল গার্ডের একজন কর্নেল। তিনি এর আগে ‘এয়ার কমব্যাট কমান্ড’-এর একটি গবেষণাগারে চিফ আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছেন। মহাকাশের আবর্জনা নিয়ে এনগুয়েনের লেখা একটি গবেষণাপত্র পড়ার পর অ্যাভেরা নিজেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এভাবেই দুজনের পরিচয় ও একসঙ্গে কাজ করার শুরু হয়।
ডালাসভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান মূলত মহাকাশ অভিযানের জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, কোম্পানিটি আগামী ২০২৭ সালের জুলাই মাসে মহাকাশে তাদের প্রথম স্যাটেলাইট পাঠাবে।
সূত্র: ইয়াহু ফাইন্যান্স
সূত্র: প্রথম আলো