গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

নতুন ৭ প্রজাতির মাছ শনাক্ত 

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
নতুন ৭ প্রজাতির মাছ শনাক্ত 

জীববৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য কম নয়; কিন্তু ভেটকি, পোয়া ও পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্তত আট প্রজাতির মাছ অতিরিক্ত আহরণের চাপে রয়েছে। ছোট মাছ ও পোনা ধরা এবং নদী-খালে বিষ প্রয়োগও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সুন্দরবনের জলজ সম্পদ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নতুন সাত প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। যেগুলো উপকূলীয় জলসীমায় আগে থেকেই ছিল।

সরকারের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ১৬ মাস ধরে সুন্দরবনের নদী-খালের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বৈচিত্র্য, বিস্তৃতি, আহরণের প্রবণতা এবং জলজ পরিবেশের অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা হয়। গত ১৩ আগস্ট খুলনার আভা সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে ‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষকেরা।

পাঁচ মাছ ও দুই চিংড়ির প্রজাতি শনাক্ত

মাছের প্রজাতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে গবেষকেরা ডিএনএ বারকোডিং–পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ডিএনএ হলো জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য বহনকারী উপাদান। গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এম এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ডিএনএ বারকোডিংকে অনেকটা জীবের আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কোনো জীবের ডিএনএর নির্দিষ্ট একটি অংশের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে তা পরিচিত প্রজাতির ডিএনএ তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবে দেখতে প্রায় একই রকম হলেও ভিন্ন প্রজাতির মাছকে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব।

সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া শিকার করে লোকালয়ে ফিরেছেন এক জেলে। খুলনার কয়রার সুন্দরবন–সংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশী এলাকার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে।

গবেষকেরা বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমায় নতুন রেকর্ড হিসেবে পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি শনাক্ত করেছেন। মাছ পাঁচটি হলো বড় আঁইশ পারশে (Planiliza macrolepis), ফোঁটা বাটা (Crenimugil seheli), বার্মিজ এক ঠুঁইটা (Dermogenys burmanica), কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে (Butis humeralis) এবং সবুজ ফোঁটা বেলে (Acentrogobius viridipunctatus)। চিংড়ি দুটি হলো মাকড়সা চিংড়ি (Cloridos scorpio) ও ফোঁটা চিংড়ি (Nematopalaemon tenuipes)।

সুন্দরবনে ৩৯% সুন্দরী গাছ রোগে আক্রান্ত

গবেষক এম এনামুল হক বলেন, এই মাছ ও চিংড়িগুলো সুন্দরবনে আগে থেকেই ছিল। তবে আগে সেগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। দেখতে একই রকম হলেও মাছের প্রজাতিভেদে জিনগত পার্থক্য থাকতে পারে। ডিএনএ বারকোডিং–পদ্ধতি ব্যবহার করে সেই পার্থক্য শনাক্ত করা হয়েছে। যেমন এক ঠোঁটা বা বাটা মাছের মতো দেখতে একাধিক প্রজাতি রয়েছে। ট্যাংরা, পুঁটি ও পাঙাশের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। বাহ্যিক চেহারা বা নামে মিল থাকলেও জিনগতভাবে সেগুলো আলাদা প্রজাতি হতে পারে।

সুন্দরবন থেকে মাছ ধরে ফিরছেন জেলেরা।

গবেষণায় ৮৩টি মাছ ও ২৮টি ক্রাস্টেশিয়ানের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ক্রাস্টেশিয়ান হলো শক্ত খোলসবিশিষ্ট অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি গোষ্ঠী, যার মধ্যে চিংড়ি ও কাঁকড়াও রয়েছে। এসব নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তার উপাদানগুলোর বিন্যাস নির্ণয় করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডিএনএ সিকোয়েন্সিং’। এতে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজাতি শনাক্ত করা যায়।

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরলেও প্রমাণ করা যায় না

গবেষকেরা জানান, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জীবের ডিএনএ বারকোড সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা হচ্ছে। পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংক হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন পরিচালিত বিভিন্ন জীবের ডিএনএ সিকোয়েন্স সংরক্ষণকারী উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার। চূড়ান্ত কর্মশালার পর বন বিভাগের মাধ্যমে সিকোয়েন্সগুলো সেখানে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

৩৮২ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি 

গবেষণায় সুন্দরবনের ৬৫টি নদী ও খাল থেকে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মাছ অবতরণকেন্দ্র থেকেও তথ্য নেওয়া হয়। বর্তমান জরিপে ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির ক্রাস্টেশিয়ানের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে।

বন বিভাগের মৎস্য বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, এর আগে ২০২০ সালের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর প্রজাতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতিতে গবেষণা করেছিলেন। বর্তমান গবেষণা সুন্দরবনের জলজ সম্পদ সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানো এবং তা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত চেষ্টা দরকার

বন বিভাগ বলছে, ২০২০ সালের ও বর্তমান গবেষণার তথ্য মিলিয়ে সুন্দরবনে মোট ৩৮২ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে ৮৮ প্রজাতির শেলফিশের (শক্ত খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী) উপস্থিতির রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ প্রজাতির চিংড়ি, ২৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৬ প্রজাতির গ্যাস্ট্রোপড, ১৫ প্রজাতির বাইভালভ, পাঁচ প্রজাতির সেফালোপড, এক প্রজাতির বার্নাকল ও এক প্রজাতির কাইটন রয়েছে।

সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, গবেষণার সুপারিশের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।