ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও ফলাফল এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা যাচ্ছে। ভোটের চূড়ান্ত হিসাব এখনো সরকার গঠনের পথ পরিষ্কার করতে পারেনি। তবে বড় কোনো পরিবর্তন না ঘটলে নেতানিয়াহু অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকতে পারেন। বিরোধী ও ক্ষমতাসীন কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে একাধিক দফা নির্বাচন হলেও আপাতত ক্ষমতায় থাকতে পারেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
গত চার বছরে যুদ্ধ, বিপর্যয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া নেতানিয়াহুর জন্য এটিকে এক ধরনের জয় হিসেবে দেখা সম্ভব। কিন্তু তার আচরণে বিজয়ের আত্মবিশ্বাসের চেয়ে উদ্বেগই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।
নিজের দল সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হওয়া মানেই আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত নয়। নির্বাচনের রাতে দেওয়া ভাষণে তিনি ইহুদি-আরব বিরোধী জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, প্রতিপক্ষ দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকলেও তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা বেশি।
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু ভোট চুরি হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। নির্বাচনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং প্রতিপক্ষদের আক্রমণ করেছেন। সাধারণত নির্বাচনে জয়ী কোনো প্রার্থী ভোট চুরির অভিযোগ তোলেন না কিংবা নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। অথচ নেতানিয়াহু এখনো ক্ষমতায় আছেন এবং সম্ভবত তা ধরে রাখবেন। তাহলে তার এমন আচরণের কারণ কী?
একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন নেতানিয়াহু। নতুন নির্বাচনে আসনসংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যও থাকতে পারে তার। আবার এটিও হতে পারে, নিজের জোটের ভাঙন সম্পর্কে তিনি সচেতন। প্রধানমন্ত্রী পদে থাকলেও কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনার সক্ষমতা হয়তো ক্রমেই হারাচ্ছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর নিরন্তর নির্বাচনি প্রচার
ইসরায়েলের রাজনীতিতে কৌশল নির্ধারণে নেতানিয়াহুকে অন্যতম দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাকে নির্বাচনি প্রচারের মধ্যেই থাকতে দেখা যাচ্ছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্তের ভিত্তিতে ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগের মূল লক্ষ্য আরব দলগুলো, যারা মঙ্গলবারের নির্বাচনে নেসেটে (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৯টি আসন পেয়েছে।
বুধবার সকাল থেকে বিদেশি নেতাদের অভিনন্দনের জন্য ধন্যবাদ জানানো বাদ দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নেতানিয়াহুর প্রতিটি পোস্টেই আরব দলগুলোকে আক্রমণ করা হয়েছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, ইসরায়েলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়ে থাকলেও তা সীমিত ছিল। নির্বাচন চুরি হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবু নেতানিয়াহুর ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক বক্তব্যের উদ্দেশ্য হতে পারে যে, ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী জোটের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনাকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা। শুরু থেকেই এমন সরকারের সম্ভাবনা কম ছিল। কারণ, ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলোর অধিকাংশই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে রাজি নয়।
কিন্তু নেতানিয়াহু যদি বিরোধী শিবিরের ভোটারদের একাংশকে বোঝাতে পারেন যে আরব দলগুলো বৈধভাবেই আসন পায়নি, তাহলে ইহুদি-আরব জোট গঠন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এতে নতুন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর সুবিধা হতে পারে। ভোট চুরির অভিযোগ আরব ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে পারে, একই সঙ্গে তার সমর্থকদের আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে। অন্যদিকে ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলোও কঠিন অবস্থায় পড়বে। নেতানিয়াহুর অভিযোগের সমালোচনা করতে গিয়ে তাদের এমনভাবে কথা বলতে হবে, যাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ না ওঠে। কারণ, অনেক ইহুদি ভোটারের মধ্যেই এসব দলের প্রতি অবিশ্বাস রয়েছে।
বর্তমান নেসেটে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি, অর্থাৎ আরও আটটি আসন দরকার। ভোট চুরির প্রচারণার মাধ্যমে নতুন নির্বাচনে আসনসংখ্যা ৫৭ বা ৫৮-তে নিতে পারলে রাজনৈতিক কৌশল কাজে লাগিয়ে আবারও জোট সরকার গঠন করতে পারেন তিনি; এমন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে বিশ্লেষণে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী?
আরও গভীরভাবে দেখলে নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর আচরণ থেকে ভিন্ন একটি ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন, আপাতত প্রধানমন্ত্রীর পদ ধরে রাখতে পারলেও কার্যকর সরকার পরিচালনার রাজনৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছেন।
নির্বাচনের ফলের প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বর্তমান ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। ইহুদিপ্রধান বা জায়নবাদী বিরোধী দলগুলো পেয়েছে ৪৮টি। নেতানিয়াহুবিরোধী আরব দলগুলোর আসন ১৯টি।
তবে ফলাফল বিশ্লেষণের আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে। নির্বাচনি আলোচনায় দলগুলো জায়নবাদী কি না, তা নিয়ে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে জায়নবাদী বলতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তা রক্ষায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক অবস্থানকে বোঝানো হয়। এই মানদণ্ডে আসনগুলো ভাগ করলে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হয়।
ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলোর আসনসংখ্যা ৪৮ থাকলেও নেতানিয়াহুর জোটের মধ্যে প্রকাশ্যে জায়নবাদী দলগুলোর আসন মাত্র ৪০টি। এর মধ্যে রয়েছে লিকুদ, উগ্র ডানপন্থি রিলিজিয়াস জায়নিজম ও ওতজমা ইয়েহুদিত।
অন্যদিকে নেসেটের বাকি ৩২টি আসন অতি-ধর্মীয় ইহুদি ও আরব দলগুলোর। এসব দলের সবাই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরোধিতা করে। ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়েও তাদের অনেকের অবস্থান দ্বিধাপূর্ণ।
এর মধ্যে রয়েছে আশকেনাজি অতি-ধর্মীয় দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম। দলটির জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা একবার আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন যে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন আরবদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এই হিসাব অনুযায়ী, নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮৮টি আসন স্পষ্টভাবে জায়নবাদী দলগুলোর। এর বেশির ভাগই নেতানিয়াহুর বিরোধীদের দখলে। এমনকি সেফারদি অতি-ধর্মীয় দল শাসকেও নেতানিয়াহুর জোটে যুক্ত করা হলেও তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৪৬। সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিষয়ে শাস দল নিজেদের তুলনামূলক মধ্যপন্থি বলে দাবি করে। তবু এই হিসাবেও তারা নেতানিয়াহুবিরোধী ইহুদি শিবিরের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকবে।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অনেক বেশি থাকায় ফলাফলকে ইসরায়েলি সমাজের তুলনামূলক নির্ভুল প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায় বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে জোটে বিরোধ
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াচ্ছে? এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় ভোটারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় রয়েছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তার সেই রাজনৈতিক জোট এখন সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
বিরোধের মূল বিষয় ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান অতি-ধর্মীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীকে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে, নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাদের নিয়োগ-ছাড়ের সুবিধা আইনে স্থায়ীভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
অধিকাংশ ইহুদি ইসরায়েলি নাগরিক চান, সবাই সেনাবাহিনীতে যোগ দিক। কিন্তু অতি-ধর্মীয় দলগুলো তাদের জন্য বিদ্যমান ছাড় বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া তাকে সরকার চালাতে হতে পারে। ফলে অতি-ধর্মীয় শরিকদের দাবি অনুযায়ী সেনাবাহিনীতে নিয়োগ থেকে অব্যাহতির আইন পাস করাও তার পক্ষে কঠিন হবে। এমন পরিস্থিতিতে এসব দল কত দিন তার সঙ্গে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অবশ্য নেতানিয়াহুর বিরোধীরাও নিয়োগ-অব্যাহতির আইন পাস করবে না। অতি-ধর্মীয় দলগুলোকে নিজেদের শিবিরে টেনে নেওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় নেই। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলতে থাকলে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী পদে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে পারবেন না। গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের ধরে রাখার মতো আইন পাস করার সক্ষমতাও থাকবে না তার।
এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে। তবে নেতানিয়াহুর বয়স এখন ৭৭ বছর। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে না পারলে ভবিষ্যতে আর কখনো তা পারবেন কি না, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
নির্বাচনের ফলের পর নেতানিয়াহুর আচরণকে বিশ্লেষকেরা এ কারণেই একজন বিজয়ীর বদলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া যোদ্ধার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভোটের বর্তমান হিসাবকে অবৈধ বলে দাবি করার পেছনেও এমন উদ্বেগ কাজ করতে পারে।
সূত্র : দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স