- পিবিআইয়ের তদন্তে উদ্ধার নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল
- সাংবাদিক রিপনকে অপহরণ-নির্যাতন ও কোটি টাকা চাঁদা দাবির মামলায় গ্রেপ্তার দুই
- মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতায় আতঙ্কে স্থানীয়রা
বিমানবাহিনী একজন সাবেক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু, তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার; অন্যদিকে একজন সাংবাদিককে অপহরণ করে নির্যাতন, কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও জবাই করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ। সব মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গাজীপুরের টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি।
পৃথক দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। কালবেলার সাংবাদিককে অপহরণ ও নির্যাতনের মামলায় এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর সঙ্গে ওই এলাকার অপরাধী চক্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
তুরাগ নদসংলগ্ন টঙ্গীর এই বস্তি এলাকার উত্তর পাশ থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের পর সাবেক বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এরই মধ্যে একই এলাকার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে জাতীয় দৈনিক কালবেলার গাজীপুর প্রতিনিধি সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনকে অপহরণ, নির্যাতন, কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপন নিজে বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা রয়েছে। এসব চক্রের প্রভাব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে মাজার বস্তি, উদ্ধার নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল
গত বৃহস্পতিবার তুরাগ নদের রাজাবাড়ি খেয়াঘাট এলাকা থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্ত শুরু করে নৌ-পুলিশ। পাশাপাশি ছায়া তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগে এক যুবকের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যরা ওই যুবককে তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তিনি নিজে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তবে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল, কেন ধাওয়া করা হয়েছিল এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গী পশ্চিম থানার হাজী মাজার বস্তির উত্তর পাশে হোন্ডা রোড থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। দুই স্থানই তুরাগ নদের সঙ্গে সংযুক্ত। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের ব্যবহৃত কি না, তা যাচাই করছে পিবিআই।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে সেটি উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। শুক্রবার সকালে পিবিআই কর্মকর্তারা মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। উদ্ধারস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এখনো সুস্পষ্ট কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক রিপনকে অপহরণ, নির্যাতন ও এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ
তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে হাজী মাজার বস্তির নাম সামনে আসার মধ্যেই একই এলাকার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে গাজীপুরের টঙ্গী সেনা কল্যাণ শপিং কমপ্লেক্সের সামনে থেকে একদল সন্ত্রাসী তাকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকার একটি স্থানে আটকে রেখে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জের ধরে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাংবাদিক রিপনের অভিযোগ, অপহরণের পর তাকে আটকে রেখে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এ সময় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে নির্যাতনের পাশাপাশি জবাই করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে টঙ্গীর একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় তিনি নিজে বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
মামলার পর টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছি। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন
সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলার প্রতিবাদে গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে গাজীপুর মিডিয়া সেন্টার ও বোর্ডবাজার মাল্টিমিডিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং টঙ্গীসহ পুরো গাজীপুরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। গাজীপুরে কর্মরত সাংবাদিকদের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, বিচার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সংবাদ সংস্থা এনএনবির সম্পাদক ও কলামিস্ট জুলিয়াস চৌধুরী।
মানববন্ধনে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমার জোর দাবি, এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। আমি এ ঘটনার ন্যায়বিচার চাই। একই সঙ্গে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন- সাংবাদিকরা অপরাধ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সংবাদে তুলে ধরেন। কোনো সংবাদ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে আইনগতভাবে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের জেরে কোনো সাংবাদিককে অপহরণ, নির্যাতন কিংবা চাঁদা দাবির শিকার হতে হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মাদক ও ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতায় নিরাপত্তাহীনতায় স্থানীয়রা
স্থানীয়দের অভিযোগ, তুরাগ নদঘেঁষা হাজী মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের তৎপরতা রয়েছে। নদীতীরবর্তী নির্জন পথ, ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এবং অপরাধীদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় চলাচল করতে ভয় পান বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ- মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হলেও অপরাধী চক্রের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, শুধু মাদক বিক্রেতা বা ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করলেই এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে না। অপরাধের নেপথ্যে থাকা অর্থের জোগানদাতা, প্রভাবশালী আশ্রয়দাতা এবং অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণকারীদেরও শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী নির্জন এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিয়মিত টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুই ঘটনার যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন, প্রয়োজন পৃথক তদন্ত
তাহসিফকে তার বন্ধু দীপ কেন ওই এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তাদের কে বা কারা ধাওয়া করেছিল এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি তাহসিফের ব্যবহৃত কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
অন্যদিকে সাংবাদিক রিপনকে অপহরণ করে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বাকি আসামিদের শনাক্তের মাধ্যমে অপরাধী চক্রের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে মাজার বস্তির মাদক কারবারি বা অপরাধী চক্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। একইভাবে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা ও সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, এমন তথ্যও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
দুটি ঘটনাকে ঘিরে একই এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই প্রতিটি ঘটনার পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন জরুরি।
একজন সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে মাজার বস্তির নাম আসা এবং একজন সাংবাদিককে অপহরণ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ; দুটিই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের দাবি, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনের দায়ের করা মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
একই সঙ্গে হাজী মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী চক্রের তৎপরতা বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: কালবেলা