গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০১ জানুয়ারি, ১৯৭০, ০৬:০০ এএম

চিকিৎসার ব্যয় ও আর্থিক সুরক্ষা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
চিকিৎসার ব্যয় ও আর্থিক সুরক্ষা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ

স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য শুধু রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা কিংবা হাসপাতালের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন মানুষ প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা নিতে পারছেন কি না এবং সেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তার পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ছে কি না সেটিও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কারণ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ঋণ করতে হয় কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ এসেছে মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হওয়া প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৭৯ টাকা সরাসরি জনগণকে বহন করতে হয়েছে। এই উচ্চ মাত্রার নিজস্ব ব্যয় স্বাস্থ্য অর্থায়নে একটি মৌলিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, অসুস্থতার সময় আর্থিক ঝুঁকির বড় অংশ এখনো ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বর্তায়।

চিকিৎসার ব্যয় যখন পরিবারের সামর্থ্য ছাড়িয়ে যায়: স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক অভিঘাত বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো Catastrophic Health Expenditure (CHE), বাংলায় যাকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় বলা যায়। পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের তুলনায় সরাসরি স্বাস্থ্যব্যয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে তাকে এই সূচকের আওতায় বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত একটি পদ্ধতিতে ১০ ও ২৫ শতাংশের সীমা ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৭.৭ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করেছে। ২৫ শতাংশের বেশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে হারটি ছিল প্রায় ৭.১ শতাংশ। এসব হিসাব দেখায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবারের স্বাস্থ্যব্যয় তাদের সামগ্রিক পারিবারিক অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে।

তবে সমস্যাটি শুধু ব্যয়ের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার জন্য অর্থ ব্যয় করার পর কোনো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেলে তাকে Medical Impoverishment বা চিকিৎসাজনিত দারিদ্র্য বলা হয়। একই গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬১ লাখ মানুষ চিকিৎসাব্যয়ের পর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল।

সমস্যার মূলে রয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য অর্থায়নে কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব ও সমন্বয়হীনতা: মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা না পাওয়া, সেবার সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয়—সবই পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। ফলে শুধু স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেবার প্রাপ্যতা, মান, ব্যয় এবং আর্থিক সুরক্ষা, রোগী ও সেবাদানকারীর নিরাপত্তা, সন্তুষ্টিÑএই কয়টি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সরকারি স্বাস্থ্য অর্থায়ন শক্তিশালী করা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থ সময়মতো ব্যয় হচ্ছে কি না, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অন্যান্য প্রাথমিক সেবাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা এবং ওষুধের ব্যবস্থা থাকলে অনেক রোগীকে উচ্চ ব্যয়ের সেবার ওপর নির্ভর করতে হবে না।

তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় কমাতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ, যুক্তিসংগত মূল্যে পরীক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দরিদ্র ও আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন।

চতুর্থত, স্বাস্থ্যব্যয়ের ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সরকারি অর্থায়নে সেবা, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার ব্যয় বহন এবং উপযুক্ত প্রিপেমেন্ট বা স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার সমন্বয় এমনভাবে গড়ে তোলা দরকার, যাতে অসুস্থ হওয়ার পর পরিবারকে একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করতে না হয়।

জাতীয় অগ্রগতি ও স্বাস্থ্যসেবায় আর্থিক সুরক্ষা: স্বাস্থ্যনীতি কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক বা সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। নিয়মিতভাবে পরিমাপ করতে হবে কত পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, চিকিৎসার ব্যয়ে কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারে মানুষের নিজস্ব ব্যয় কমছে কি না। জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে নীতি সংশোধন করা জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অন্যতম শর্ত। তাই শুধু স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নকে আরও ন্যায়সংগত ও কার্যকর করে তোলার। সরকারি অর্থায়ন বৃদ্ধি, প্রাথমিক সেবার মানোন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা—এই উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে মানুষের পকেট থেকে ব্যয়ের চাপ কমানোর বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগ

সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ

সূত্র: কালবেলা

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।