গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৯ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০৩ এএম

প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি: আইনি জট খুলেছে, পদোন্নতির অপেক্ষা কবে শেষ হবে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি: আইনি জট খুলেছে, পদোন্নতির অপেক্ষা কবে শেষ হবে

সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৬ বছর আগে। আশা ছিল, নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি পেয়ে একদিন প্রধান শিক্ষক হবেন। কিন্তু সেই পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৩ বছর। গত জুনে আইনি বাধা কাটলেও আদালতের রায়ের অনুলিপি পেতে লেগেছে প্রায় পাঁচ মাস। এখন শুনছেন, পদোন্নতির কাজ শুরু হচ্ছে। কিন্তু পদোন্নতির চিঠি কবে হাতে পাবেন, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

রংপুর বিভাগের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সহকারী শিক্ষকের মতো দেশের হাজারো শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। পদোন্নতি আটকে থাকায় তাঁরা শুধু পদমর্যাদা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।

দীর্ঘ আইনি জটিলতার পর গত জুনে আপিল বিভাগে মামলার নিষ্পত্তি হয়। তবে রায়ের অনুলিপি পেতে দেরি হওয়ায় পদোন্নতির প্রশাসনিক কার্যক্রমও এগোয়নি। সম্প্রতি আদালতের রায়ের সারসংক্ষেপ ও নির্দেশনার অনুলিপি পাওয়ার পর আবার কাজ শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য প্রথমে জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বর্তমানে কোন অবস্থায় পদোন্নতিপ্রক্রিয়া

দীর্ঘ অপেক্ষার পর পদোন্নতির কার্যক্রম কত দূর এগিয়েছে, জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর থমকে থাকা প্রশাসনিক কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এখন শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

মহাপরিচালক জানান, দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের চাকরির নথি, সার্ভিস বুক, বদলির তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হচ্ছে। কোনো যোগ্য শিক্ষক যেন ভুল তথ্যের কারণে বাদ না পড়েন, সে জন্য মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর ধাপে ধাপে পদোন্নতির আদেশ দেওয়া হবে।

তবে তালিকা প্রস্তুত ও যাচাইয়ের কাজ শেষ করে কবে নাগাদ পদোন্নতির আদেশ দেওয়া সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

মহাপরিচালক জানান, দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের চাকরির নথি, সার্ভিস বুক, বদলির তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হচ্ছে। কোনো যোগ্য শিক্ষক যেন ভুল তথ্যের কারণে বাদ না পড়েন, সে জন্য মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর ধাপে ধাপে পদোন্নতির আদেশ দেওয়া হবে।

আদালতের রায়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নিয়ম

প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধের মূল বিষয় ছিল জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। তখন প্রণীত বিধিমালার ৯(১) বিধি অনুযায়ী, জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির ৫০ শতাংশ সময়কে কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণনা করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়। তবে তাঁদের অবস্থান সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকদের নিচে রাখার শর্তও ছিল।

জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এই বিধানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হয়। হাইকোর্ট সরকারের ওই শর্ত বাতিল করলেও আপিল বিভাগ পরে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারের বিধিমালার পক্ষেই রায় দেন। রায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকেরা জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অগ্রাধিকার পাবেন। অন্যদিকে ২০১৩ সালে বা তার পরে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির ৫০ শতাংশ কার্যকর চাকরিকাল বিবেচনায় নেওয়া হবে। এই নিয়ম অনুসরণ করেই এখন জেলাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯৩ জনের চাকরি, আবেদন ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত

দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অবসানের আকুতি

আইনি বাধা কেটে কাজ শুরু হলেও প্রশাসনিক গতি নিয়ে চিন্তিত ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘১৩টি বছর আমাদের মামলা আর আইনি জটিলতার পেছনে শেষ হয়েছে। জুনে রায় হওয়ার পরও নথির কারণে পাঁচ মাস পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন ডিপিইর কাছে আমাদের একটাই দাবি—আর যেন কোনো নতুন আমলাতান্ত্রিক অজুহাতে সময় নষ্ট করা না হয়। দ্রুত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করে পদোন্নতি দেওয়া হোক।’

অবসর ঘনিয়ে আসা শিক্ষকেরা আছেন আরও বড় উদ্বেগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছর আছে। জেলা থেকে তথ্য যাচাই আর ফাইল চালাচালিতে যদি আবার বেশি সময় চলে যায়, তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পদোন্নতি আর দেখা হবে না।’

বেসরকারি চাকরিতে বেতন ‘আলোচনা সাপেক্ষে’, দর-কষাকষি কীভাবে করবেন চাকরিপ্রার্থীরা

প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নতুন সমীকরণ

ডিপিই সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে একযোগে ৩৬ হাজার ২৩৫ জন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হবেন। এতে বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা নেতৃত্বসংকট কাটবে।

একই সঙ্গে দেশে তৈরি হবে নতুন নিয়োগের পথ। এত বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি পেয়ে অন্য পদে চলে গেলে তাঁদের ফেলে যাওয়া পদগুলো খালি হয়ে যাবে। আগে বিদ্যমান শূন্য পদ ও পদোন্নতিজনিত নতুন পদ মিলে একযোগে প্রায় ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি হবে। সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক ওরিয়েন্টেশন শেষে স্কুলে যোগ দিয়েছেন। তবে এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই মাঠপর্যায়ের বিশাল শূন্যতা পূরণে ডিপিইকে আবারও নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।

এআই যুগে গণিত শেখা কি জরুরি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জেনে নিন

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।