ঘুষ শুধু একটি অনৈতিক কাজ বা সামাজিক অপরাধই নয়, এটি ইসলামের দৃষ্টিতে মহাপাপ। অনেকেই জানতে চান, এই অপরাধের জন্য ইসলামি আইনে সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তি রয়েছে কি না।
ইসলামি আইনের পরিভাষায় ঘুষ খাওয়ার সুনির্দিষ্ট শাস্তি এবং এর আইনি বিধান আলোচনা করা হলো।
ঘুষের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি
ইসলামে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কেই অভিশপ্ত বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) কঠোর ভাষায় এই অপরাধের নিন্দা জানিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮০)
অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ই দোজখে যাবে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তবারানি, হাদিস: ৩৮৯৯)
অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ গ্রাস করার নিন্দা জানিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
ঘুষ কী ধরনের অপরাধের অন্তর্ভুক্ত
ইসলামি দণ্ডবিধির পরিভাষায় ঘুষ এমন একটি অপরাধ, যার জন্য কোরআন বা হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনযোগ্য শাস্তির (যেমন—চুরির জন্য হাত কাটা বা ব্যভিচারের জন্য চাবুক) পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি।
তাই ঘুষ খাওয়া ‘হদ’ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটি ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
যেহেতু ঘুষের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তাই ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর শাস্তি কঠোর হতে পারে। কাজী বা বিচারকের পদ থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য ঘুষ গ্রহণ করা একটি মারাত্মক অপরাধ।
রাষ্ট্রপ্রধান বা বিচারক এই অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে তার পদের অপসারণ, কঠোর কারাদণ্ড, চাবুক মারা বা অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী অর্থদণ্ড বা সম্পত্তি বাজোপ্তকরণের মতো শাস্তি দিতে পারেন। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ২/৩৮৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)
ঘুষের অর্জিত সম্পদের পরিণতি
ইসলামি আইনে শাস্তির পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ বা ঘুষের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত কোনো সম্পদ নিজের জন্য হালাল করা যায় না।
ঘুষ খাওয়ার জন্য ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট ‘হদ’ বা বেত্রাঘাতের ফিক্সড মাত্রা না থাকলেও, এটি কঠোর ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ঘুষের সম্পদ যার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই তার প্রকৃত মালিককে বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে (বাইতুল মাল) ফিরিয়ে দিতে হবে; অন্যথায় এই অবৈধ সম্পদের দায় পরকালে তো বটেই, দুনিয়াতেও অপরাধীর পিছু ছাড়বে না। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৫/১০০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
তাজিরের কঠোর প্রয়োগ
যেহেতু তাজিরের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে অপরাধমুক্ত করা এবং অপরাধীকে সংশোধন করা, তাই ইসলামি আইনবিদরা একমত যে, বর্তমান যুগে ঘুষের মতো মারাত্মক অপরাধ দমনে রাষ্ট্র চাইলে কঠোরতম তাজির বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
কারণ, একটি ঘুষের লেনদেন অনেক সময় নিরাপরাধ মানুষকে জেল খাটাতে পারে বা প্রকৃত হকদারকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
সংক্ষেপে, ঘুষ খাওয়ার জন্য ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট ‘হদ’ বা বেত্রাঘাতের ফিক্সড মাত্রা না থাকলেও, এটি কঠোর ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিচারক বা ইসলামি রাষ্ট্র চাইলে অপরাধীকে বরখাস্ত, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড, আর্থিক জরিমানা এবং অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারেন।
সূত্র: প্রথম আলো