যান্ত্রিক নগরজীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে পাহাড়, মেঘ আর কাপ্তাই হ্রদের নীল-সবুজ জলে কাটুক কিছুটা সময়। রাঙামাটির দ্বীপ-রিসোর্ট, ঝুলন্ত সেতু আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের এই ভ্রমণ এনে দেবে প্রশান্তি ও রোমাঞ্চ।
যে শহরে প্রতিনিয়ত ট্রাফিকের হর্ন, কংক্রিটের দেয়াল আর কাজের ব্যস্ততা মানুষের নিশ্বাস ভারী করে তোলে, সেই যান্ত্রিক ঢাকা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মনটা কিছুদিন ধরেই পাহাড়ি কোনো ঠিকানার সন্ধান করছিল। ফেসবুক আর গুগল সার্চ করে ঘাঁটাঘাঁটি করে সবুজ পাহাড়, মেঘের খেলা আর অথই নীল জলের কাপ্তাই হ্রদ—সব মিলিয়ে গন্তব্য হিসেবে চূড়ান্ত করলাম পাহাড়ের রানি রাঙামাটিকে। ছুটির দিন বাদেই রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা করলাম, যেন প্রকৃতির শান্ত রূপটা নিখাদভাবে উপভোগ করা যায়।

ভ্রমণের শুরুটা হলো ঢাকার আরামবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকে। রাত তখন ৯টা। সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া ৯৫০ টাকা ভাড়ায় একটি নন-এসি বাসে চড়ে বসলাম। রাতে যানজট পেরিয়ে বাস যখন ধীরে ধীরে ঢাকা শহরের সীমানা পেরিয়ে মহাসড়কে উঠল, তখন থেকেই মাথার ভেতর থেকে কাজের চাপগুলো যেন হালকা হতে শুরু করল। রাতের দীর্ঘ জার্নি, গাড়ির মৃদু ঝাঁকুনি আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যখন ঘড়ির কাঁটায় ভোর ৫টা বেজে ২৫ মিনিট, বাস এসে থামল রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে।
ততক্ষণে পুরো শহর যেন সবেমাত্র ঘুম ভেঙে চোখ খুলছে। ভোরবেলার পাহাড়ি বাতাস গায়ে লাগতেই মনটা জুড়িয়ে গেল। রিজার্ভ বাজারের একপাশে একটি চায়ের দোকানে বসে থেকে অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোরের মিষ্টি রোদের জন্য। সকালের আলো ফুটতেই সিএনজি ঠিক করে রওনা দিলাম বালেদী ব্রিজের পথে।
আগে থেকেই অনলাইনে বুকিং করা ছিল কাপ্তাই হ্রদের বুকে অবস্থিত একটি চমৎকার দ্বীপ-রিসোর্ট ‘রাঙাদ্বীপ’। ছুটির দিন না হওয়ায় মাত্র ৪৮০০ টাকায় এক রাতের বুকিং করেছিলাম। ছুটির দিনে রিসোর্টে রুমভাড়া আরও বেড়ে যায়। সকাল ঠিক ৮টায় রিসোর্টের নিজস্ব ইঞ্জিনচালিত নৌকা এসে বালেদী ব্রিজের পাশে ভিড়ল।

নৌকায় রওনা দিয়ে চারপাশের কাপ্তাই হ্রদের বিশাল জলরাশি মনের সব ক্লান্তি একনিমেষে মুছে দিল। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঘড়ঘড় শব্দে হ্রদের শান্ত নীল-সবুজ পানি কেটে যখন নৌকাটি দ্বীপের দিকে এগোচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এক স্বর্গের দিকে যাচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছালাম রাঙাদ্বীপ রিসোর্টে। হ্রদের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপে গড়ে ওঠা এই রিসোর্টের পরিবেশ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। চারপাশে শুধু থইথই পানি আর দূরে সবুজ পাহাড়।

কটেজগুলোর চমৎকার স্থাপত্যশৈলী আর রিসোর্টের ভেতরে থাকা সুইমিংপুল চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে দারুণভাবে মিশে আছে। রুমে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে গেলাম তাদের নিজস্ব রেস্টুরেন্টে। পাহাড়ি আবহাওয়ায় হ্রদের বাতাস গায়ে মেখে সকালের নাশতা খাওয়ার তৃপ্তিই ছিল আলাদা।

দুপুরের দিকে রিসোর্টের সুইমিংপুলে কিছুক্ষণ সুইমিং করে। পরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলবেলা আবার বের হলাম রিসোর্টটি ঘুরে দেখতে, আর বসে নিরিবিলি কিছুটা সময়ও কাটানো হলো। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন একটু একটু করে হেলে পড়ছে, আর সেই মিষ্টি রোদের আলোয় কাপ্তাই হ্রদের পানি সোনালি রূপ ধারণ করেছিল। সূর্যাস্তের সেই ক্ষণটি এত সুন্দর ছিল যে ইচ্ছা করছিল সময়টা সেখানেই থেমে যাক।
পরদিন সকালে পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙল। রিসোর্টের স্নিগ্ধ পরিবেশে সকালটা উপভোগ করে ১০টায় চেক-আউট করলাম। যেহেতু ছুটির দিন ছিল না, তাই রিসোর্টে যেমন অতিরিক্ত ভিড় বা বাড়তি খরচ ছিল না, তেমনি শহরের বাস কাউন্টারে গিয়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই সহজে রাতের ঢাকার ফেরার টিকিট কেটে নিতে পেরেছি। টিকিট নিশ্চিত করার পর প্রথম গন্তব্য ছিল দৃষ্টিনন্দন পলওয়েল পার্ক।

পার্কের ভেতরে চারপাশের ল্যান্ডস্কেপিং ও লেকভিউ দারুণ। পলওয়েল পার্কের ঘাট থেকেই ১ ঘণ্টার জন্য ১ হাজার টাকায় একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে আবার ভেসে পড়লাম কাপ্তাই হ্রদের বুকে। নৌকায় চড়েই সোজা চলে গেলাম রাঙামাটির অন্যতম আইকনিক ল্যান্ডমার্ক—ঝুলন্ত সেতুতে। হ্রদের দুই পাড়কে যুক্ত করা ঝুলন্ত সেতু সঙ্গে নৌকা থেকে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অনুভূতি অসাধারণ। হ্রদ ঘুরে আবার পার্কে ফিরে এসে দুপুরের খাবার খাওয়ার পালা। পার্কের ভেতরের রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম কিছুটা বেশি মনে হওয়ায়, একটু বুদ্ধি করে পার্কের ঠিক সামনের একটি রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম। সেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে দুপুরের ভোজ সেরে নিলাম।
দুপুরের খাবারের পর শুরু হলো সত্যিকারের রোমাঞ্চ। একটি সিএনজি রিজার্ভ করে বেরিয়ে পড়লাম রাঙামাটির বাকি দর্শনীয় স্থানগুলোর উদ্দেশে। একে একে ঘুরে দেখলাম জনপ্রিয় সেলফি পয়েন্ট ‘আই লাভ রাঙামাটি’, বৌদ্ধ মন্দির, ব্রাজিল ব্রিজ ও আর্জেন্টিনা ব্রিজ এবং বার্গী লেক ভ্যালি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, রাঙামাটির উঁচু-নিচু, খাড়া এবং আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় সিএনজির গতি যখন বেড়ে যেত, তখন মনে হচ্ছিল কোনো থিম পার্কের রোলার কোস্টারে চড়ে বসেছি!

সারা দিনের এই ক্লান্তিহীন ঘোরাঘুরি আর রোমাঞ্চ শেষে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম বাস কাউন্টারে। কাউন্টারে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে পাশের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার সেরে নিলাম। এরপর রাত ৮টার নন-এসি বাসে উঠে সিটেই মাথা এলিয়ে দিলাম। বাস যখন ঢাকার উদ্দেশে চলতে শুরু করল, জানালার কাচের ওপারে তখন রাঙামাটির পাহাড়ি আঁধার আর নিস্তব্ধতা। বাসে চড়ার সময় বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেদিন। বৃষ্টি উপভোগ আর পেছনের ফেলে আসা পাহাড়, মেঘ আর হ্রদের স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম টের পেলাম না। পরের দিন ভোরে যখন চোখ খুললাম, ততক্ষণে যান্ত্রিক ঢাকা শহর আবার আমাকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত, তবে আমার ভেতরের মানুষটা তখন রাঙামাটির নীল-সবুজ জলে আর পাহাড়ে পুরোপুরি রিফ্রেশড হয়ে গেছে।
ছবি: লেখক
সূত্র: প্রথম আলো