গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৩৮ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

ক্যারিয়ার যখন ব্যারিয়ার

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ক্যারিয়ার যখন ব্যারিয়ার

বাংলাদেশের কর্মজীবী মানুষের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো—নিজের অবস্থানকে ছোট করে দেখা আর পাশের মানুষটির অবস্থানকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরা। নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলো যতটা চোখে পড়ে, অন্যের জীবনের সংগ্রামগুলো ততটাই আড়ালে থেকে যায়।

একদিন চায়ের দোকানে বসে আছি। সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু, সিনিয়র ও জুনিয়র। আলোচনার বিষয়—কে কেমন আছে, কার জীবন কতটা ভালো!

ব্যবসায়ী বন্ধু: তোরা চাকরি করিস, তোদের জীবনই ভালো। ব্যবসায় কত ঝুঁকি, কত অনিশ্চয়তা! মন চায় সব বাদ দিয়ে চাকরি শুরু করি। তোদের সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা অফিস, মাস শেষে বেতন—বেশ শান্তি!

বিসিএস ক্যাডার বন্ধু: কী যে বলেন ভাই! সরকারি চাকরি করি, কিন্তু মন খুলে সব বলা যায় না, ইচ্ছেমতো লেখা যায় না, ঘোরাঘুরিও সব সময় সম্ভব হয় না। চারপাশে কত বিধিনিষেধ! আপনারা কত স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ান, ফেসবুকে ছবি দেন। আমার তো মনে হয়, আপনারাই ভালো আছেন!

ব্যাংকার বন্ধু: ব্যাংকে কোনো শান্তি নেই রে! সকালে ঢুকি, বের হতে হতে সন্ধ্যা। সারা দিন গ্রাহকদের নানা সমস্যা সামলাতে হয়, লেনদেনের হিসাব মেলাতে হয়। তোদের জীবনই ভালো। মন চায় বিদেশ চলে যাই!

ফার্মাসিউটিক্যালসের বন্ধু: আমাদের অফিসে ঢোকার সময় আছে, কিন্তু কখন বের হব, তার নিশ্চয়তা সব সময় নেই। অডিট এলে দিন-রাত এক হয়ে যায়। মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কাজ করি। করোনা, হরতাল, ঝড়-বৃষ্টি—সবকিছুর মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কী আর বলব! মাঝে মাঝে মন চায় বিদেশ চলে যাই।

রাজনীতিবিদ বন্ধু: রাজনীতিতে এসে বুঝেছি, এখানে স্থায়ী শান্তি বলে কিছু নেই। আজ ক্ষমতা আছে, কাল নেই। প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে চলতে হয়।

গবেষক বন্ধু: তোরা ভালো আছিস। গবেষণায় পরিশ্রমের শেষ নেই, অথচ অর্থায়ন সীমিত, স্বীকৃতিও অনেক সময় মেলে না। দিনের পর দিন ল্যাবে পড়ে থাকি। কখনো কখনো মনে হয়, নিজের জীবনটাই গবেষণার পেছনে শেষ করে দিলাম!

প্রবাসী বন্ধু: তোরা সবাই বিদেশ যেতে চাস, বুঝলাম। অথচ আমি মনে মনে দেশে ফিরে আসতে চাই। মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু—সবাইকে ছেড়ে দূরে থাকতে ভালো লাগে না। বিদেশে সুযোগ-সুবিধা আছে, আয় আছে; কিন্তু আপনজনের সান্নিধ্য আর দেশের প্রতি যে টান, সেটা কি টাকা দিয়ে পাওয়া যায়?

সদ্য চাকরি হারানো বন্ধু: তোদের অন্তত একটা পরিচয় আছে, নিয়মিত আয় আছে। আমার তো এখন কিছুই নেই। চাকরি হারানোর পর বুঝছি, চাকরির পাশাপাশি নিজের দক্ষতা আর বিকল্প আয়ের পথও থাকা কত জরুরি। ভাবছি, এবার ব্যবসায় মনোযোগ দেব। নইলে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করব।

শিক্ষক বন্ধু: আমারও মনে হয়, এই পেশায় এসে অনেক কিছু হারালাম। শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ধরন বদলেছে, কোচিংয়ের চাহিদা বদলেছে, সামাজিক মূল্যায়ন নিয়েও হতাশা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্য পেশায় এলে হয়তো ভালো থাকতাম।

এতক্ষণ সবার কথা শুনে চায়ের দোকানদার হেসে বলল—

‘বড় ভাইয়েরা, আমি কিন্তু আপনাদের দোয়ায় ভালোই আছি। বেশি আশা নেই, তাই হতাশাও কম! তবে তাই বলে কেউ আবার আমার লাইনে আইসেন না কিন্তু!’

তার কথায় সবাই হেসে উঠল। কিন্তু হাসির আড়ালে একটা গভীর সত্য লুকিয়ে ছিল—আমরা প্রায় সবাই অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের চেয়ে ভালো মনে করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিটি তরুণ-তরুণী নিজের মতো করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখে। কেউ সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, কেউ পারে না। কেউ চাকরি পেয়ে অসন্তুষ্ট, কেউ ব্যবসায় সফল হয়েও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, কেউ বিদেশে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েও মানসিক শূন্যতা অনুভব করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কর্মসংস্থান, বেতন, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার ওপর চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা, পরিচিতির প্রভাব এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তরুণদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।

কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগের পার্থক্য দেখা যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও যথাযথ সুযোগ, দিকনির্দেশনা ও নেটওয়ার্কের অভাবে পিছিয়ে পড়ে। অথচ মেধা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

অন্যদিকে মানবসম্পদ বিভাগ অনেক যাচাই-বাছাই করে একজন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করে। কিন্তু যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই কেউ কেউ চাকরি পরিবর্তন করেন। ফলে প্রতিষ্ঠান যেমন দক্ষ জনবল ধরে রাখতে হিমশিম খায়, তেমনি নতুন করে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা তৈরির পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এখানে প্রশ্ন শুধু কর্মীর নয়, প্রতিষ্ঠানেরও। উপযুক্ত বেতন, সম্মান, কাজের পরিবেশ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতির সুযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নিশ্চিত করা গেলে কর্মীদের ধরে রাখা সহজ হতে পারে।

উত্তরণের পথ কী

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই বাস্তবভিত্তিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল করলেই যে ভালো চাকরি নিশ্চিত হবে না, তা শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে। একই সঙ্গে কোন পেশায় কী ধরনের দক্ষতা, দায়িত্ব, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ রয়েছে, সে সম্পর্কেও বাস্তব ধারণা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি যোগাযোগদক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, নেতৃত্ব, দলগত কাজ এবং নৈতিকতার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতার মূল্যায়ন, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং কর্মীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মীদেরও দায়িত্বশীলতা, পেশাগত সততা এবং নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে।

চতুর্থত, তরুণদের বুঝতে হবে চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা, শিক্ষকতা কিংবা প্রবাসজীবন; প্রতিটি পথেরই নিজস্ব সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যের সাফল্যের দৃশ্যমান অংশ দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে হতাশা বাড়বে, সমাধান আসবে না।

সবশেষে, আমাদের শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগে এবং দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল পায়।

বিদেশে যাওয়া অপরাধ নয়। উন্নত সুযোগ, গবেষণা, নিরাপত্তা কিংবা পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেউ বিদেশে গেলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু দেশের ভেতরেও যদি মেধাবিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং সম্মানজনক কর্মজীবন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অনেকেই দেশেই থেকে অবদান রাখতে আগ্রহী হবেন।

দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু মেধাবীদের দেশে থাকার আহ্বান জানালেই হবে না; তাঁদের জন্য কাজ করার মতো পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, অন্যের জীবন যতটা সুন্দর দেখায়, তার পেছনের সংগ্রাম আমরা ততটা দেখি না। আর নিজের জীবন যতটা অসফল মনে হয়, তার মধ্যেও হয়তো এমন অনেক অর্জন আছে, যা আমরা নিজেরাই মূল্যায়ন করতে ভুলে যাই।

ক্যারিয়ারে সফলতা মানে শুধু বড় পদ, বেশি বেতন কিংবা বিদেশে বসবাস নয়। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া, আত্মসম্মান বজায় রাখা, পরিবারকে সময় দেওয়া, মানসিক শান্তি পাওয়া এবং নিজের কাজের মাধ্যমে মানুষের উপকার করতে পারাও সফলতার অংশ।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।