চার বছর আগে সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া গিয়েছিল কয়েকটি লালচে পাথর। প্রথম দেখায় সেগুলোকে খুব সাধারণ পাথর বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, এগুলো পৃথিবীর কোনো পাথর নয়, মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, পাথরগুলোর বয়স প্রায় ৪১০ কোটি বছর! পৃথিবীতে পাওয়া বেশির ভাগ পাথরের চেয়েও এগুলো অনেক পুরোনো।
এই উল্কাপিণ্ডের টুকরাগুলো নিয়ে সম্প্রতি সায়েন্স সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সব কটি টুকরাকে একসঙ্গে ধরে মহাকাশের পাথরটির নাম দেওয়া হয়েছে তেঘাজা ০০১ (Teghaza 001)। সাহারা মরুভূমির যে এলাকায় পাথরগুলো পাওয়া গিয়েছিল, তার কাছেই মালিতে রয়েছে তেঘাজা নামে একটি প্রাচীন লবণখনি-জনপদ। বহু আগে সেখানে লবণ খনন করা হতো। এখন জায়গাটি পরিত্যক্ত। সেই জনপদের নাম থেকেই উল্কাপিণ্ডটির এই নাম রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউ এই গবেষণার প্রধান লেখক। তাঁর মতে, এত প্রাচীন কোনো পাথর খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে মঙ্গল গ্রহের ৪০০টির বেশি উল্কাপিণ্ড পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে মাত্র দুটির বয়স তেঘাজা ০০১-এর কাছাকাছি। একটি অ্যালান হিলস ৮৪০০১, অন্যটি নর্থওয়েস্ট আফ্রিকা ৭০৩৪। দ্বিতীয় পাথরটি ব্ল্যাক বিউটি নামেও পরিচিত।
এত পুরোনো একটি পাথর বিজ্ঞানীদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ, এটি যেন মঙ্গল গ্রহের অনেক পুরোনো একটি ছোট্ট নমুনা। প্রায় ৪১০ কোটি বছর আগে গ্রহটি কেমন ছিল, তার কিছু চিহ্ন এখনো ধরে রেখেছে এই পাথর। এর ভেতরে থাকা বিভিন্ন খনিজ বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের ভূগর্ভ ও উপরিভাগের প্রাচীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

মঙ্গলে একসময় প্রচুর পানি ছিল
তেঘাজা ০০১ নিয়ে একই গবেষক দলের আগের একটি গবেষণাপত্রেও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছিল। পাথরটির ভেতরে অ্যাপাটাইট নামের একটি খনিজ রয়েছে। এই খনিজের মধ্যে রাসায়নিকভাবে যুক্ত অবস্থায় পানির অণু পাওয়া গেছে। অ্যাপাটাইটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আরও সহজ উপায় আছে। মানুষের দাঁতের মূল উপাদানও এই খনিজের মতোই। অ্যাপাটাইটের ভেতরে আটকে থাকা পানির অণু পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পাথরটি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন মঙ্গলে প্রচুর পানি প্রবাহিত হতো। অর্থাৎ, আজকের শুষ্ক ও ধুলোময় মঙ্গলের চেহারা দেখে অতীতের মঙ্গলকে কল্পনা করলে ভুল হবে। একসময় সেখানে পানি ছিল, এমনকি পানির প্রবাহও ছিল।
তবে গল্পের আরেকটি দিক আছে। গবেষণায় এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে যে পাথরটি তৈরি হওয়ার সময়েই মঙ্গল তার অনেকখানি পানি হারিয়ে ফেলেছিল। কীভাবে হারাল সেই পানি?
সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মি পানির অণু ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে আলাদা করে দিতে পারে। হাইড্রোজেন খুব হালকা গ্যাস। ফলে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে এর কিছু অংশ মহাকাশে উবে গেছে। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহটি পানি হারাতে থাকে।
তেঘাজা ০০১-এর অ্যাপাটাইটে পাওয়া পানির অণু পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, সেগুলোর সবগুলোর উৎস এক ছিল না। কিছু পানি এসেছিল মঙ্গলের গভীর থেকে। গ্রহটির ম্যান্টল বা অভ্যন্তরের উত্তপ্ত স্তর থেকে ম্যাগমা ওপরে উঠে এসেছিল। সেই ম্যাগমার মধ্যেই পানির অণু ছিল।
এই অংশের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা আরও একটি বিষয় লক্ষ করেছেন। তেঘাজা ০০১-এর ম্যান্টল থেকে আসা অংশের উপাদানের মিশ্রণ অন্য মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ডে পাওয়া নমুনার চেয়ে বেশ আলাদা। ইয়াং লিউয়ের ধারণা, এটি মঙ্গলের আরও আদিম অবস্থার নমুনা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে গ্রহটির ভেতরে ঘটে যাওয়া নানা প্রক্রিয়া এই অংশকে তেমন বদলে দিতে পারেনি।
অ্যাপাটাইটে পাওয়া অন্য কিছু পানির অণু এসেছিল মঙ্গলের উপরিভাগ ও বায়ুমণ্ডল থেকে। সেই পানি ধীরে ধীরে গ্রহের ভূত্বকের ভেতর দিয়ে নিচে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কীভাবে বুঝলেন, এই পানির কিছু অংশ বায়ুমণ্ডল থেকেই এসেছে?
সাধারণ হাইড্রোজেনের পাশাপাশি প্রকৃতিতে ডিউটেরিয়াম নামের ভারী হাইড্রোজেনও পাওয়া যায়। সাধারণ হাইড্রোজেনের তুলনায় এর নিউক্লিয়াসে একটি অতিরিক্ত নিউট্রন থাকে। তাই এটি কিছুটা ভারী। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে হাইড্রোজেন মহাকাশে উবে যাওয়ার সময় সাধারণ হাইড্রোজেনের পক্ষে বেরিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। ভারী ডিউটেরিয়াম তত সহজে উবে যেতে পারে না। ফলে সময়ের সঙ্গে মঙ্গলে অবশিষ্ট পানিতে ডিউটেরিয়ামের অনুপাত বেড়ে যেতে পারে।
তেঘাজা ০০১-এর পানিতে ডিউটেরিয়াম ও সাধারণ হাইড্রোজেনের অনুপাত পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, মঙ্গল যখন পানি হারাচ্ছিল, তখনকার কিছু চিহ্ন এই পাথরের মধ্যে রয়ে গেছে। এই অনুপাতটি অ্যালান হিলস ৮৪০০১ নামের প্রাচীন মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ডে পাওয়া অনুপাতের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়।
এতে অবশ্য মঙ্গল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আগের ধারণা পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে না। তবে আগে হাতে এমন তথ্যের নমুনা ছিল মাত্র একটি, এখন হলো দুটি। ফলে সেই সময়ের মঙ্গলে পানি হারানোর ঘটনা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও শক্ত ভিত্তি পেল।

মঙ্গল থেকে সাহারা পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রা
তেঘাজা ০০১ কীভাবে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে এল, সেটিও বেশ রোমাঞ্চকর গল্প। একসময় মঙ্গলের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছিল একটি উল্কা। সেই আঘাত এত শক্তিশালী ছিল যে মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে পাথরের কিছু অংশ ছিটকে মহাকাশে বেরিয়ে যায়।
সেই ছিটকে যাওয়া পাথরেরই একটি খণ্ড শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর দিকে আসে। মহাকাশে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় প্রচণ্ড ঘর্ষণ ও তাপে অনেক মহাজাগতিক পাথরই পুড়ে যায়। কিন্তু তেঘাজা ০০১-এর একটি খণ্ড সেই আগুনের পথ পেরিয়ে পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছাতে পেরেছিল। খণ্ডটির ওজন ছিল প্রায় ৯০০ গ্রাম। পৃথিবীতে পড়ার পর সেটি ভেঙে আটটি টুকরা হয়ে যায়। পরে সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া যায় সেই টুকরাগুলো।
তবে ঠিক কবে পাথরটি মঙ্গল গ্রহ থেকে ছিটকে মহাকাশে বেরিয়ে এসেছিল, কিংবা কবে পৃথিবীতে এসে পড়েছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পাথরটির খনিজের গঠন বিশ্লেষণ করে এবং মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো রোবোটিক মহাকাশযানগুলোর সংগ্রহ করা তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ১৩টি জায়গা চিহ্নিত করেছেন। এসব জায়গার কোনো একটিতে পাথরটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
তেঘাজা ০০১ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ইয়াং লিউ শুরুতে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না। কারণ, নমুনাটি প্রথমে শেরগোটাইট শ্রেণির মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। মঙ্গল থেকে পাওয়া উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এ ধরনের পাথরই সবচেয়ে বেশি। সাধারণত এগুলোর বয়সও খুব বেশি হয় না।
কিন্তু নমুনাটি ভালো করে পরীক্ষা করতে গিয়ে লিউয়ের চোখে পড়ে জিরকন স্ফটিকে। শেরগোটাইট শ্রেণির পাথরে সাধারণত এমন স্ফটিক দেখা যায় না। অথচ নমুনাটিতে তিনি একাধিক জিরকন স্ফটিক খুঁজে পান। বিষয়টি তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। তিনি বুঝতে পারেন, এই পাথরের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আগে ধারণা করা হয়নি।
এরপর শুরু হয় পাথরের বয়স নির্ধারণের কাজ। জিরকনের মধ্যে ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ থাকে। আইসোটোপ হলো একই মৌলের এমন পরমাণু, যাদের নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা আলাদা। ইউরেনিয়ামের একটি আইসোটোপ সময়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে ক্ষয় হয়ে অন্য মৌলে পরিণত হয়। মূল ইউরেনিয়াম ও ক্ষয়ের ফলে তৈরি হওয়া পদার্থের অনুপাত মেপে বিজ্ঞানীরা পাথরের বয়স হিসাব করতে পারেন।
এই পদ্ধতিতে জিরকন স্ফটিকগুলোর বয়স পাওয়া গেল প্রায় ৪১০ কোটি বছর। পরে আরও দুটি আলাদা পদ্ধতিতে বয়স মেপে একই ফল পাওয়া যায়। ফলে পাথরটির প্রাচীন বয়স সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আস্থা আরও বেড়ে যায়।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
সূত্র: প্রথম আলো