বলিউডের বাদশাহ হওয়ার যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না শাহরুখ খানের। আজ তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, কোটি কোটি ভক্তের প্রিয় তারকা। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজের অভিনয় নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। এমনকি প্রথম সিনেমা ‘দিওয়ানা’ দেখে নিজের অভিনয়কে বলেছিলেন ‘ভয়াবহ, উচ্চকণ্ঠ ও নিয়ন্ত্রণহীন’। শুধু তা-ই নয়, একসময় ৩০ বছর বয়সেই অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এই অভিনেতা। শাহরুখের ৬১তম জন্মদিনে সামনে এসেছে ১৯৯২ সালে দেওয়া তার প্রথম দিককার একটি সাক্ষাৎকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সাক্ষাৎকারের নানা কথা। তখন বলিউডে নতুন মুখ শাহরুখ। ‘দিওয়ানা’ সিনেমার সাফল্যে দর্শকের নজরে এলেও নিজের অভিনয় নিয়ে তার মনে ছিল অসন্তোষ। সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়ের সমালোচনা করে শাহরুখ বলেছিলেন, ‘আমি খুব বাজে অভিনয় করেছি। অতিরিক্ত চড়া, অশোভন ও নিয়ন্ত্রণহীন ছিল আমার অভিনয়। এর পুরো দায় আমি নিচ্ছি।’ কেন এমন মনে হয়েছিল, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন তিনি। শাহরুখ জানান, সিনেমাটির জন্য কাজ করার আগে তার হাতে চিত্রনাট্যও ছিল না। অন্য কিছু কাজের শুটিং বাতিল হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করেই ‘দিওয়ানা’র জন্য সময় দিতে হয়েছিল তাকে। তার মতে, একটি চরিত্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের ধরন বুঝে নেওয়ার সুযোগ না থাকলে এমন ভুল হতে পারে। নিজের অভিনয় দেখে নিজেই অবাক হয়েছিলেন শাহরুখ। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক। পর্দায় নিজেকে দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মানুষ যে আমাকে সিনেমাটিতে পছন্দ করেছে, সেটাই অবাক করার মতো। হয়তো নতুন মুখ ছিলাম বলেই তারা পছন্দ করেছে। এমন অভিনয় আবার করতে বা মনে রাখতে চাই না।’ সেই সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক অভিনেতাদের নিয়েও কথা বলেছিলেন শাহরুখ। আমির খানকে নিজের সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী উল্লেখ করলেও তার অভিনয়ের প্রশংসা করতে দ্বিধা করেননি। শাহরুখের ভাষায়,‘আমির আমার চেয়ে অনেক ভালো অভিনেতা। এই মুহূর্তে দেশে যদি অসাধারণ কোনো অভিনেতা থাকেন, তিনি আমির।’ তখন আমির ৩০ বছর বয়সে অভিনয় ছেড়ে পরিচালনায় আসতে চান বলে শুনেছিলেন শাহরুখ। মজার বিষয়, শাহরুখ নিজেও একই বয়সে অভিনয় ছাড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। অবশ্য সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই ভাবনা। ৩০ পেরিয়ে ৬১ বছর বয়সেও অভিনয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ‘দিওয়ানা’র সাফল্যের কৃতিত্বও নিজের কাঁধে নিতে চাননি শাহরুখ। তার মতে, সিনেমাটির জনপ্রিয়তার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সংগীত পরিচালক নদীম-শ্রবণের। গানগুলোর চিত্রায়ণের জন্য পরিচালক রাজ কানওয়ারেরও প্রশংসা করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি সহশিল্পী ঋষি কাপুর, দিব্যা ভারতী, দেবেন ভার্মা ও অমরিশ পুরীর অবদানের কথা স্মরণ করেন। তবে নিজের লক্ষ্য নিয়ে পরিষ্কার ছিলেন তরুণ শাহরুখ। তিনি চাইতেন, দর্শক যেন শুধু সিনেমার গল্প বা গান ভালো লাগার কারণে হলে না আসেন, তার অভিনয়ের জন্যও আসেন। শাহরুখ বলেছিলেন, ‘আমি চাই মানুষ বলুক, সিনেমার গান ভালো, কিন্তু শাহরুখ আরও ভালো।’ তার বিশ্বাস ছিল, একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রযোজকেরা অনেক অর্থ ব্যয় করেন। অভিনয়শিল্পীর যাতায়াত, খাবার, পারিশ্রমিকসহ নানা খরচ বহন করতে হয় তাদের। তাই একজন অভিনেতার দায়িত্ব নিজের সেরাটা দেওয়া। শুধু সিনেমা হিট হয়েছে বলে একজন অভিনেতা সফল, এমনটা মানতে রাজি ছিলেন না তিনি। তার ভাষায়, ‘আমি চাই না আমার সিনেমার কারণে আমি সফল হই। বরং আমার কারণে সিনেমাটি সফল হোক। অন্য কেউ অভিনয় করলেও যদি সিনেমাটি হিট হয়ে যায়, তাহলে আমার অবদান কোথায়?’ শাহরুখের নিজের অভিনয় নিয়ে অসন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত ছিল স্ত্রী গৌরী খানের মতামতও। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, গৌরীও তাকে খুব ভালো অভিনেতা মনে করতেন না। বরং প্রায়ই বলতেন, তিনি পর্দায় অতিরিক্ত অভিনয় করেন এবং তাকে দেখতেও ভালো লাগে না। শাহরুখ মজা করে বলেছিলেন, সাধারণত গৌরী তার অভিনীত সিনেমা দেখতে খুব একটা আগ্রহী হন না। তবে ‘দিওয়ানা’র ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছিল। তারপরও সিনেমাটি হলে গিয়ে দেখার সাহস তখনো করে উঠতে পারেননি তিনি। দ্য প্রিন্ট