একসময় কানাডার ল্যাব্রাডর অঞ্চল ছিল জমজমাট মৎস্যশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। মাছ ধরা, প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির কাজে ব্যস্ত থাকতেন শত শত মানুষ। ছিল হাসপাতাল, স্কুল, গির্জা, এমনকি বেতার যোগাযোগকেন্দ্রও। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় জনশূন্য হয়ে পড়ে দ্বীপটি।
এখন সেখানে নেই গাড়ি, নেই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক। তবু গ্রীষ্ম এলেই ইতিহাস, নির্জনতা আর প্রকৃতির টানে সেখানে ছুটে যান পর্যটকরা। কানাডার ব্যাটল হারবার যেন আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘ভূতুড়ে দ্বীপ’।
কানাডার ল্যাব্রাডর উপকূলের ছোট্ট এই দ্বীপটি একসময় বিশ্বজুড়ে লবণাক্ত কড মাছের বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল। ১৭৭০-এর দশকে ইংরেজ বণিক জন স্লেড এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলেন। ইউরোপ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এখানকার প্রক্রিয়াজাত কড মাছ রপ্তানি হতো। একপর্যায়ে দ্বীপটির স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। মৌসুমি জেলেদের আনাগোনা ছিল আরও বেশি।
তবে ১৯৩০ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, মাছের মজুত কমে যাওয়া এবং ১৯৬০-এর দশকে সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির কারণে ধীরে ধীরে দ্বীপটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকে শেষ স্থায়ী বাসিন্দারাও চলে যান।
১৯৯২ সালের ২ জুলাই কানাডা সরকারের কড মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারির পর দ্বীপটির মৎস্যশিল্পের অবশিষ্ট সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডর অঞ্চলে এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কর্মহীন হন।
বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে ব্যাটল হারবার। গ্রীষ্মের মাত্র তিন মাস পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে দ্বীপটি। সেখানে যাওয়ার পথও বেশ দুর্গম। প্রথমে ল্যাব্রাডরের হ্যাপি ভ্যালি-গুজ বে বিমানবন্দরে পৌঁছে সড়কপথে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যেতে হয় মেরিস হারবার। সেখান থেকে ছোট যাত্রীবাহী নৌকায় প্রায় ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় দ্বীপে।
দ্বীপটির পুরোনো কাঠের ভবন, মাছ শুকানোর মাচা ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে পাঁচটি সংস্কার করা কটেজ এবং ১২টি কক্ষ। কিছু ঐতিহাসিক ভবনেও রাত কাটানোর সুযোগ রয়েছে। তবে সেখানে টেলিভিশন নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রয়েছে সবার ব্যবহারের জন্য ওয়াই-ফাই।
দ্বীপে ঘুরে দেখা যায় পুরোনো লবণের গুদাম, মাংস সংরক্ষণের দোকান এবং একসময় মাছ ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ভবন। ১৯০৬ সালে নির্মিত দুটি ঐতিহাসিক বেতার টাওয়ারও রয়েছে এখানে।
ইতালীয় উদ্ভাবক গুলিয়েলমো মার্কনির প্রযুক্তিতে নির্মিত টাওয়ার দুটি একসময় সমুদ্রযাত্রীদের পথনির্দেশ ও বার্তা আদান-প্রদানে ব্যবহৃত হতো। উত্তর আমেরিকায় এ ধরনের টাওয়ারের টিকে থাকা শেষ জোড়া হিসেবে এগুলোকে বিবেচনা করা হয়। এগুলো সংস্কারে ২ লাখ কানাডীয় ডলার সংগ্রহের চেষ্টা করছে ট্রাস্ট।
এছাড়া দ্বীপে আর্কটিক শিয়ালের দেখা মেলে। রয়েছে হাঁটার পথ, পাখি দেখার সুযোগ এবং সমুদ্রের অপূর্ব দৃশ্য। স্থানীয়দের কাছে ব্যাটল হারবার কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জায়গা। আধুনিকতার ছোঁয়া সামান্যই লাগলেও ইতিহাস আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে দ্বীপটি এখনো জীবন্ত।
সূত্র: বিবিসি
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স