গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম

পেঙ্গুইনের ভালোবাসা

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
পেঙ্গুইনের ভালোবাসা

অ্যান্টার্কটিকায় তখন শীতের তীব্রতা বাড়ছে। বরফের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে মনে হয়, ধারালো কিছু এসে গায়ে বিঁধছে। চারদিকে সাদা বরফ। দূরে সমুদ্রের পানি কালো দেখায়। এমন পরিবেশে হাজার হাজার সম্রাট পেঙ্গুইন জড়ো হয়েছে একটি জায়গায়।

তাদেরই এক জোড়া পেঙ্গুইন কয়েক দিন ধরে পাশাপাশি থাকছে। মেয়ে পেঙ্গুইনটি ডিম পাড়ার পর সেটি আলতো করে তুলে দিল তার সঙ্গীর পায়ের ওপর। পুরুষ পেঙ্গুইনটি ডিমটিকে দুই পায়ের মাঝখানে রেখে পেটের নিচের চামড়ার ভাঁজ দিয়ে ঢেকে দিল। বাইরে থেকে ডিমটি আর দেখা যায় না।

মেয়ে পেঙ্গুইনটি এবার সমুদ্রের দিকে রওনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে ডিম তৈরির ধকল গেছে তার শরীরের ওপর দিয়ে। খাবার খেয়ে শক্তি ফিরে পাওয়া দরকার। তাই তাকে সমুদ্রে যেতে হবে মাছ ও ছোট সামুদ্রিক প্রাণীর খোঁজে।

যাওয়ার আগে সে একবার সঙ্গীর দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে অন্য পেঙ্গুইনদের সঙ্গে বরফের ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল।

পুরুষ পেঙ্গুইনটি সেখানেই রয়ে গেল।

তার এখন একটাই কাজ—ডিমটিকে উষ্ণ রাখা।

প্রথম কয়েক দিন কাজটা খুব কঠিন মনে না হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ওপর চাপ বাড়তে লাগল। ডিমটি পায়ের ওপর ঠিকমতো ধরে রাখতে হয়। একটু অসাবধান হলেই বিপদ। বরফের ওপর পড়ে গেলে ডিমটি জমে যেতে পারে। তাই হাঁটাচলা করতে হলেও তাকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়।

এদিকে শীত আরও বাড়ল। বাতাসের সঙ্গে বরফ উড়ে এসে পড়ে পেঙ্গুইনগুলোর গায়ে। পুরুষ পেঙ্গুইনটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার নিজের শরীরও ঠান্ডায় কাবু হয়ে আসে। কিন্তু পেটের নিচে ডিমটি উষ্ণ রাখতে হবে।

খাবার খাওয়ার জন্য সে সমুদ্রেও যেতে পারে না। শরীরে যে শক্তি জমা আছে, তা দিয়েই তাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হবে।

তার আশপাশে আরও অনেক বাবা পেঙ্গুইন একইভাবে ডিম আগলে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো তারা একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। এতে শরীরের তাপ ধরে রাখা সহজ হয়। আবার অবস্থান বদলে বাইরের ঠান্ডা বাতাসের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগও ভাগ করে নেয় তারা।

দিনের পর দিন কেটে যায়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

মেয়ে পেঙ্গুইনটি তখন সমুদ্রে খাবার খুঁজছে। আর তার সঙ্গী ডিমটিকে আগলে আছে বরফের দেশে। দুজনের পথ আলাদা হলেও অপেক্ষাটা একই পরিবারের জন্য।

প্রায় দুই মাস পর এক সকালে ডিমের খোলসে ছোট্ট একটি ফাটল দেখা দিল। পুরুষ পেঙ্গুইনটি পায়ের ওপর ডিমটি ধরে রেখেই অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর খোলস ভেঙে বেরিয়ে এল একটি ছানা।

ছানাটির শরীরে ধূসর নরম পালক। ঠান্ডায় সে কাঁপছে। পৃথিবীর আলো-বাতাসে চোখ মেলেই সে আবার বাবার উষ্ণ আশ্রয়ে মুখ লুকাল।

এত দিন ধরে যে ডিমটি আগলে রেখেছিল পেঙ্গুইনটি, তার ভেতরেই বেড়ে উঠছিল এই ছোট্ট প্রাণ। এখন তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আরও বেড়েছে।

কিন্তু বাবার শরীরে তখন খাবার প্রায় শেষ। তাকে এবার সমুদ্রে যেতে হবে। অন্যদিকে মা পেঙ্গুইনও ফিরবে ছানার কাছে। তাই কলোনির ভিড়ে সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা শুরু হলো।

কিছুদিন পর সমুদ্র থেকে ফিরে এল মা পেঙ্গুইন। হাজার হাজার পেঙ্গুইনের ভিড়ে সে নিজের সঙ্গীকে খুঁজে নিল পরিচিত ডাক শুনে। কাছে এসে ছানাটিকে নিজের পায়ের ওপর তুলে নিল। এবার তার পালা ছানাকে আগলে রাখার।

বাবা পেঙ্গুইনটি সমুদ্রের দিকে রওনা হলো। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার পর তার খাবার দরকার। সামনে বরফের পথ, হিমেল বাতাস আর অনিশ্চিত যাত্রা। তবু তাকে যেতে হবে। ছানাটিকে বড় করতে হলে মা-বাবা দুজনেরই সুস্থ থাকা জরুরি।

ছানাটি মায়ের পায়ের ওপর নিশ্চিন্তে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর সে ছোট্ট মুখ তুলে ডাকল। মা পেঙ্গুইন তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

বরফের দেশে এভাবেই চলতে থাকে সম্রাট পেঙ্গুইনদের জীবন। এখানে বাসা বানানোর মতো গাছ নেই, শীত থেকে বাঁচার মতো ঘর নেই। তবু তারা ডিম আগলে রাখে, ছানাকে বাঁচিয়ে রাখে, খাবারের খোঁজে দূরে যায়, আবার ফিরে আসে।

আর একটি ছোট্ট পেঙ্গুইনের জীবনের শুরু হয় তার মা–বাবার এই দীর্ঘ অপেক্ষা আর নিরন্তর যত্নের মধ্য দিয়ে।

মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।