গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:১৪ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:২৭ এএম

লোকগানের সুরে আব্বাসউদ্দীনকে স্মরণ

বিনোদন
নিজস্ব প্রতিবেদক
লোকগানের সুরে আব্বাসউদ্দীনকে স্মরণ

‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’র মতো কালজয়ী গানের মধ্য দিয়ে আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তার ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত দুটি স্মরণ অনুষ্ঠানে শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা ফিরে দেখেছেন তার জীবন, সংগীতচর্চা এবং লোকসংগীতে অসামান্য অবদান। একই সঙ্গে উঠে এসেছে ভাওয়াইয়া গান নিয়ে কয়েক দিনব্যাপী উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও। লোকসংগীতকে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গান জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আব্বাসউদ্দীন আহমদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় এসব আয়োজনে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তন ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছায়ানটের বিশেষ শ্রোতার আসর শুরু হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। অন্যদিকে শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানও শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টায়। দুই আয়োজনেই আলোচনা ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আব্বাসউদ্দীনের সংগীত-উত্তরাধিকার তুলে ধরা হয়। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, আব্বাসউদ্দীন আহমদের অন্যতম বড় কৃতিত্ব হলো সমৃদ্ধ লোকগীতিকে বাংলার নাগরিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার গাওয়া বহু গান কয়েক দশক পরও জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। সময়ের পরিবর্তনেও এসব গানের আবেদন অটুট থাকা তার সংগীতকর্মের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্বের প্রমাণ। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে সারওয়ার আলী বলেন, আব্বাসউদ্দীনের অনুপ্রেরণা ও বারবার তাগিদে নজরুল অনেক ইসলামী গান রচনা করেছিলেন। ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ গানটি রচনার পেছনেও আব্বাসউদ্দীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’র মতো গানও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। তার মতে, লোকগীতিকে সামগ্রিক রূপে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। আলোচনা শেষে ছায়ানটের আয়োজন এগিয়ে যায় গানের মধ্য দিয়ে। প্রিয়ন্তু দেবের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে’ ও ‘বসিয়া নদীকূলে, এলোচুলে কে উদাসিনী’ গান দুটি দিয়ে শুরু হয় পরিবেশনা। এরপর সুমন মজুমদার গেয়ে শোনান ‘খাতুনে-জান্নাত ফাতেমা জননী’, ‘তোমার আকাশে উঠেছিল চাঁদ’ ও ‘সাধ জাগে মনে পরজীবনে’। মোছা. শরিফা খাতুন পরিবেশন করেন ‘ফাঁদে পড়িয়া বগা’ ও আবদুল করিমের লেখা ‘ও কি একবার আসিয়া’। বিমান চন্দ্র বিশ্বাসের পরিবেশনায় ছিল ‘আমায় এত রাতে ক্যানে ডাক দিলি’, ‘গুরুর পদে প্রেম ভক্তি হল না মন’ ও ‘আমার হাড় কালা করলাম রে’। এ পর্বে জসীম উদ্দীনের লেখা দুটি গানসহ লোকজ ধারার আরও একটি গান পরিবেশিত হয়। মো. আবুল কালাম আজাদ গেয়ে শোনান ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে’, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘আবো নওদারিটা মরিয়া’। চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় জসীম উদ্দীনের ‘প্রাণ সখী রে’, নজরুলের লেখা ও আব্বাসউদ্দীনের সুর করা ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা’ এবং ‘ওই না মাঝবী বনেতে লুকাইছে’। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে কিরণ চন্দ্র রায় পরিবেশন করেন ‘ও পরানের মাঝি’, ‘কোনবা রঙে বাইন্ধাছো ঘরখানি’ ও ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’। অন্যদিকে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে আব্বাসউদ্দীনের সংগীতজীবন, তার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের পাশাপাশি তার ভাওয়াইয়া গান নিয়ে কয়েক দিনব্যাপী উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীরা অংশ নেবেন। দেশের অন্যান্য লোকসংগীতের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বাউল ও লালন উৎসবের পাশাপাশি হাসন উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ রয়েছে। কুষ্টিয়ায় লালন উৎসব আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া যাত্রা ও সার্কাসকে নতুনভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পরিবারসহ দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রসারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। মুখ্য আলোচক ছিলেন সংগীতশিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হারুন-অর-রশীদ। সভাপতির বক্তব্যে হারুন-অর-রশীদ বলেন, গ্রামীণ জনপদের পরিচিত আবেগকে সংগীতের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন। ভাওয়াইয়া সুরে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনধারাকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন, যা ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির সংগীতপর্বের শুরুতে রেজাউল করিম লিমন পরিবেশন করেন ‘প্রাণ সখীরে, ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’ ও ‘পরের অধীনে কইরাছে আমায়’। এরপর রাহাত আরা গীতি নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন। নোশীন লায়লার কণ্ঠে শোনা যায় ‘সে যেন কী করলোরে আমায়’ ও ‘আমায় এত রাত কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে’। সালাউদ্দিন আহমদ পরিবেশন করেন ‘ভুলে যেও ভুলে যেও’ ও ‘কুঁচবরণ কন্যারে তোর মেঘবরণ কেশ’। অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক অধ্যাপক ড. নাশিদ কামালও সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন। তার কণ্ঠে শোনা যায় আব্বাসউদ্দীনের জনপ্রিয় গান ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’। শেষ পর্বে আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমির শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ও ‘বাওকুমটা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে’। আলোচনা ও গানের মধ্য দিয়ে দুই আয়োজনেই স্মরণ করা হয় আব্বাসউদ্দীন আহমদের সংগীতসাধনা ও সাংস্কৃতিক অবদান। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া থেকে শুরু করে বাংলার লোকজ জীবনের নানা অনুভূতি তার কণ্ঠে যে স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছিল, তা আজও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে আবেদনময়। তার জন্মবার্ষিকী ঘিরে ভাওয়াইয়া উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা সেই সংগীত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবেও গুরুত্ব বহন করছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।