গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:১৫ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৭ এএম

লগি-বইঠার রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর, দুই দশক পরও আস্থার সংকট

জাতীয়
Test User
লগি-বইঠার রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর, 
দুই দশক পরও আস্থার সংকট

প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যক্তিকে ঘিরে লগি-বইঠা দিয়ে পেটাচ্ছেন কয়েকজন। নিথর দেহের ওপর উঠে লাফালাফির দৃশ্যও ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে গুলি, বোমার বিস্ফোরণ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। রাজধানীর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকা পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। রাজনৈতিক সহিংসতার এমন ভয়াবহ দৃশ্য স্তম্ভিত করেছিল দেশকে।

দিনটি ছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। কেবল ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সেদিন রাজনৈতিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার আগের দিন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে তখন তীব্র রাজনৈতিক সংকট চলছিল।

সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন দুই জোটের বিরোধ তখন চরমে। সংলাপে সমঝোতা হয়নি। দুই পক্ষই প্রস্তুতি নিচ্ছিল রাজপথে শক্তি দেখানোর। সেদিন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা-কর্মীরা ‘লগি-বইঠা’ নিয়ে রাজপথে নেমেছিল।

সেই রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে রক্তাক্ত হয় রাজধানীর পল্টন এলাকা। নিহত হন পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে চারজন ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মী। অপরজন ছিলেন যুবমৈত্রীর নেতা। সেদিন ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে অস্ত্র তুলে গুলি এবং মানুষ পিটিয়ে মারার ঘটনা গভীর আলোড়ন তৈরি করেছিল।

রক্তাক্ত সেই ২৮ অক্টোবরের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। এই রক্তাক্ত ঘটনার পর দেশে আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরবর্তী সময়ে সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন তিনটি চরম বিতর্কিত নির্বাচন হয়। টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত ঐকমত্যও তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুই দশক আগে এই সরকারব্যবস্থার প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বিরোধ হয়েছিল; এখনো সেই প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে আবারও রাজনৈতিক মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে।

যেভাবে ঘনীভূত হয়েছিল সংকট

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা চালু করে।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আসে। তৎকালীন সাংবিধানিক নীতি অনুযায়ী, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাঁকে মেনে নিতে রাজি ছিল না।

দলটির অভিযোগ ছিল, কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করতে বিএনপি সরকার ২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করেছিল। অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতাও বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘এক-এগারো: বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮’ বইয়ে লিখেছেন, ‘কে এম হাসান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক-রশিদের ভায়রা ভাই হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিলেন না।’ (পৃষ্ঠা-৩৩)

প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা নিয়েও দুই পক্ষের বিরোধ বাড়তে থাকে। সংকট নিরসনে ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর থেকে দফায় দফায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বৈঠক হয়। কিন্তু সমঝোতা হয়নি।

২২ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত সম্পাদক মতিউর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘সংলাপ কি তাহলে ব্যর্থ হচ্ছে?’ ওদিন প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ঢাকা দখলের লড়াই’। সংলাপ চললেও দুই পক্ষই তখন রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সে বিষয়ে আগাম প্রতিবেদন ছিল সেটি।

লগি-বইঠা নিয়ে ঢাকায় আসার আহ্বান

সংঘাতের প্রস্তুতি অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পল্টন ময়দানে এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগঞ্জ ও জেলা-উপজেলা থেকে নৌকার বইঠা, লগি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকায় আসবেন। (সূত্র: প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬)

২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে, বিএনপি নয়াপল্টনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় পুলিশ পল্টন ময়দান ও আশপাশে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও উত্তেজনা কমেনি।

আগের রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়। ওই রাতেই নিহত হন চারজন।

রণক্ষেত্র পল্টন

২৮ অক্টোবর সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে অবস্থান নেয়। জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে আর বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়া শুরু করে।

সেদিন সকালে আওয়ামী লীগ সমাবেশ করার জন্য পল্টন ময়দান দখল নিতে গেলে প্রথমে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এরপর দুপুরের দিকে দলটির নেতা-কর্মীরা দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে যেতে চাইলে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পল্টন মোড়, জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় দিনভর সংঘর্ষ হয়। চলে গুলি, ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। প্রকাশ্যে অস্ত্র তুলে গুলির ঘটনাও ঘটে, সে ছবি সংবাদপত্রে ছাপাও হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।

এ সময় একের পর এক বিস্ফোরণ হতে থাকে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য মতে, বিস্ফোরণের মধ্যে কিছু ছিল ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ এবং কিছু ছিল গুলির শব্দ। পুরো এলাকায় তখন এমন অবস্থার তৈরি হয়েছিল যে ককটেল এবং গুলি কোন দিক থেকে আসছে সেটি বোঝা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ ব্যাপক টিয়ারশেল এবং রাবার বুলেট ছুঁড়েছিল। এসময় ইটের আঘাতে এক ব্যক্তি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে চারপাশ ঘিরে শ্লোগান দিতে থাকে। তখনই ধারণা করা হচ্ছিল যে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে পত্রিকার রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যায়, নিহত সেই ব্যক্তি ইসলামি ছাত্র শিবিরের একজন নেতা। তার নাম মুজাহিদুল ইসলাম মুজাহিদ। তিনি ছিলেন মিরপুর ১০ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সভাপতি। (বিবিসি বাংলা, ২৭ অক্টোবর ২০২৩)

সেদিন যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে চারজন ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী। অপরজন ছিলেন যুবমৈত্রীর নেতা। সেদিন আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে সমাবেশ করতে না পারলেও জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকারমের উত্তর গেটে আর বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করেছিল।

এদিকে ২৭ অক্টোবর রাতেই খবর বের হয় যে বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। পরদিন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা জানান। সে ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়েও সমঝোতা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। আন্দোলন, অবরোধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে দেশ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

এমন এক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরদিন ১২ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন ফখরুদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ঘটনাপ্রবাহ পরিচিত হয়ে ওঠে ‘এক-এগারো’ নামে ।

প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকে সেনাসমর্থিত সরকার। গ্রেপ্তার হন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়। বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট (১৪-দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিসহ) ক্ষমতায় আসে।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপ, তিন বিতর্কিত নির্বাচন

যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতার দাবিতে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন জোট আন্দোলন করেছিল, ক্ষমতায় এসে তারা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বিলোপ করে তারা।

২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। তবে সেদিনের সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই সুযোগ বাদ যায়। এর আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করে।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনই চরম বিতর্কিত হয়। ২০১৪ সালে বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যা একতরফা নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। পরদিন প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল—‘জাল ভোট, কলঙ্কিত নির্বাচন’। এরপর ২০১৮ সালে নির্বাচন আরও বিতর্কিত, যা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে । ওই নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। যেখানে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছিলেন আওয়ামী লীগের লোকজন। এই নির্বাচনের সাত মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

সই করার পর জুলাই জাতীয় সনদ হাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস

দুই দশক পর প্রধান উপদেষ্টা পদ নিয়ে আবার আলোচনা

গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্ন সামনে আসে। গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগের রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। তবে আদালত স্পষ্ট করেন, পুনর্বহাল হওয়া বিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরই প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যাবে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় তৈরি হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এর মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রশ্নটি আবার সামনে আসে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে বৈধ ভোটের প্রায় ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে পড়ে।

কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা এই শপথ নিয়ে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছেন।

এই মতভিন্নতার মধ্যে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে। বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়। কমিটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি।

সরকারের বক্তব্য, সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া থেকে সরকার সরে এসেছে।

২০০৬ সালে প্রধান উপদেষ্টা পদে কে এম হাসানের নিয়োগ নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত ঐকমত্য থাকলেও প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি।

জুলাই সনদে সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধির থাকার কথা।

জুলাই সনদে পাঁচ সদস্যের কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের একাধিক বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগের দুই প্রতিনিধিকে যুক্ত করে সাত সদস্যের কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধানও আছে। তবে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের যুক্ত করার বিধানসহ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নতুন নতুন বিকল্প প্রস্তাব আসছে। সর্বশেষ ২৪ অক্টোবর সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও আইনজীবীদের সঙ্গে কমিটির মতবিনিময়ে সংসদের সম্ভাব্য উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ধারণা উঠে আসে।

আলোচনায় উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকার করার প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি সরকারি দল ও বিরোধী দলের ঐকমত্যে নির্বাচিত উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিকল্প ধারণাও উঠে এসেছে।

তবে কোনো প্রস্তাবই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে চান। অন্যদিকে বিরোধী দল জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলন জোরদারের কথাও বলছে তারা।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেটার বাইরে যাওয়া বা সেখান থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। সে রকম কিছু করতে হলে সংসদে থাকা দলগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে করা উচিত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশে কী পরিমাণ রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাত হয়েছে, সেটা আমাদের মনে থাকার কথা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। সেটি বিবেচনায় রেখে আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। জুলাই সনদ আমাদের সামনে আছে, আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোও আছে, এর বাইরে আদালতে পর্যবেক্ষণও আছে। এগুলোর বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।’

২০ বছর পরও যে শিক্ষা

দুই দশক আগের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবে দুই সময়ের একটি অভিন্ন সংকট হলো, নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাব বিএনপির জন্য সুবিধাজনক নয়, সেগুলোতে দলটি ভিন্নমত দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও সংকট থেকে যাবে। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিরোধী দল মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরির হুমকি দিয়েছে। সরকারকে এখনই সংকট সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। রাজনীতি একবার সংসদ থেকে রাজপথে চলে গেলে, সেটা আবার সংসদে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।