গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

অটল

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
অটল

আমার মা খুব শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু সচেতন ছিলেন—এই কথাটি বলে লেখা শুরু করছি। গল্পটি অনেক আগের, তখন আমি মাত্র কলেজে উঠেছি। পড়াশোনা নিয়ে বেশ চাপের মধ্যে থাকতেই হয়। খুলনা সেন্ট জোসেফসের ছাত্র হিসেবে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হতো সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। প্রতিদিনের হোমওয়ার্ক তো আছেই। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলাম না; কিন্তু চেষ্টা করেছি একটু ভালো করার। বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়ে প্রবেশ করে নতুন এক জগতের সঙ্গে পরিচয় হলো। ছোটবেলা থেকে পত্রিকা পড়ার শখ। বিকেলে প্রাইভেট শেষ করে ঢুকে যেতাম বাসার কাছে উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিতে। পুরো পত্রিকা পাওয়া যেন ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। হয়তো কখনো প্রথম পাতা পেতাম, আবার কখনো মাঝের পৃষ্ঠা, অপেক্ষা করে খুঁজে আনতে হতো বাকি অংশ।

টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে অনেক সময় পত্রিকা কিনতাম বিশেষ কোনো সংখ্যা নিজের সংগ্রহে রাখার জন্য। সেগুলোকে রেখেছি অনেক যত্নে। স্কুলের পড়াশোনা সমাপ্ত করে কলেজজীবনে পা দিয়েছি। পত্রিকা পড়ার নেশা আরও যেন পেয়ে বসল কলেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। দু–একটা টিউশনি পেয়ে গেলাম। বেশ কিছুদিনের মধ্যে নতুন একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখলাম, নাম প্রথম আলো। তখন পত্রিকার হকারদের বেশ দৌড়ঝাঁপ চলছে। আমাদের শহরের পিকচার প্যালেস মোড় আর বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়ে সব হলেই পত্রিকা আসত। রাতের শেষ প্রহর থেকেই হকার বন্ধুদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যেত। আমার এক ঘনিষ্ঠ পত্রিকা বিক্রেতাকে বলে রাখলাম, ‘ভাই, প্রথম আলোর প্রথম সংখ্যাটি বের হলেই আমার অবশ্যই একটি চাই।’ অবশেষে ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর ভোরে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় থেকে সংগ্রহ করলাম প্রথম আলোর প্রথম সংখ্যাটি। সে এক উত্তেজনা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি হাতে পেলাম। সেখান থেকে প্রথম আলো পড়া শুরু করেছি। আজও নিয়মিত প্রথম আলোর সঙ্গে আছি।

সমাজের সব স্তরের মানুষের পাশে থেকে সবার কথা বলার দায়িত্ব পালন করে চলেছে পত্রিকাটি। বিজ্ঞাপনের এই যুগে প্রথম আলোর নিজের কোন বিজ্ঞাপন লাগে না। তৃণমূল মানুষের কথা প্রচারে নিজেকে রেখেছে সামনের কাতারে। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যান্টার-এমআরবি পরিচালিত জাতীয় গণমাধ্যম জরিপ ২০২১ অনুযায়ীও প্রথম আলো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পঠিত পত্রিকা। তাদের জরিপে দেখা গেছে, শুধু পাঠকসংখ্যায়ই নয়, দেশের সব স্তরের মানুষের মধ্যে প্রথম আলো সবচেয়ে বেশি পঠিত।

শুধু পত্রিকা প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিভা বিকাশে প্রথম আলো কাজ করে চলেছে অবিরাম। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সমাজে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা বিকাশে কাজ করে চলেছে প্রথম আলো। যেমন ১. ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো গণিত উৎসব; ২.পুষ্টি-প্রথম আলো বিতর্ক উৎসব; ৩. জিপিএইচ ইস্পাত–প্রথম আলো ইনজিনিয়াস; ৪. ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো ফিজিক্স অলিম্পিয়াড; ৫. শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা; ও ৬. বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা উৎসব। প্রথম আলো সমাজে যাঁরা অবদান রাখছেন, তাঁদের সম্মাননা ও পুরস্কার দিতেও উদ্যোগী। যেমন ১. আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা; ২. আইডিএলসি-প্রথম আলো এসএমই পুরস্কার; ৩. প্রথম আলো বর্ষসেরা ক্রীড়া পুরস্কার; ৪. মেরিল-প্রথম আলো তারকা পুরস্কার। পত্রিকাটি প্রথম থেকেই তার শিরোনামে নতুনত্ব রেখে কাজ করে চলেছে। পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে সমাজের মানুষের জন্য মানবিক দায়িত্ব পালন করা একটি কঠিন কাজ। শীতকালে মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের যে উপকার বয়ে আনে, সেটি চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। শীতবস্ত্র নিয়ে যখন বৃদ্ধ মানুষটি গন্তব্যে ফিরে যায় তখন তাঁর মুখে হাসি হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এটাই প্রাপ্তি প্রথম আলোর। তরুণসমাজকে উদ্ধুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ‘বন্ধুসভা’ গঠনের মধ্য দিয়ে যেসব সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে; সেটা কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দৃষ্টান্ত। বাল্যবিবাহসহ নারীর প্রতি সব সহিংসতা রোধে এই পত্রিকা কখনোই চুপ থাকেনি। আমার স্মৃতিতে এখনো একটি দৃশ্য ভেসে ওঠে, ‘স্থানটি হচ্ছে খুলনার অফিসার্স ক্লাব’। আমার খুব কাছের একজন মানুষ গোপী কিষাণ মুন্ধড়া (গোপীদা) বললেন, ‘চল প্রথম আলোর একটি অনুষ্ঠান আছে, সেখানে যাই।’ আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম, আমার প্রিয়জনের অনুষ্ঠান আমি যাব না, সে কি হয়! খুলনার এই আয়োজনে যাঁরা সমবেত হয়েছেন; তাঁদের সবাই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, সেখানে আমি অনেকটাই ক্ষুদ্র। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সাদামাটা একজন ব্যক্তি এসে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি মতিউর রহমান’। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আমার নামটি বললাম। তিনি প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক—কথাটি আমার যেন বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ মতিউর রহমান কাজের মধ্য দিয়ে পরিচয় দিয়েছেন। ট্রান্সকম গ্রুপ আর লতিফুর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিছু মানুষ দ্বারা প্রথম আলো নির্যাতিত হয়েছে। বহুবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তার দেহ। তারপরও ‘অটল’ প্রথম আলো। তাঁর প্রাণবন্ত কর্মীরা অটল সমাজ পরিবর্তনে। তোমার দেহে আঘাত হয়েছে বারবার। জাতি দেখেছে ক্ষতবিক্ষত দেহ। ‘স্যরি’। আমার বোনের মেয়েটি সুনয়না ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী। ও যখন শিশু, তখন ওর মা প্রথম আলো পত্রিকাটি আনলেই কেড়ে নিয়ে দেখত। সে এক দৃশ্য।

লেখাটি আর দীর্ঘ করব না আমার দেশের নারী ফুটবলারদের উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে যে উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছে; সেটি কিন্তু কম নয়। আমার মায়ের কথাটি দিয়ে এই লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই। একদিন যদি প্রথম আলো না পান, তখন বকা থাকে আমার প্রাপ্তি। মায়ের কথাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম আর মায়ের কথাটি দিয়ে সমাপ্ত করতে চাইছি।

যুদ্ধক্ষেত্রে অন্ধকার রাতে বাতি জ্বালিয়ে ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল’ আহত যোদ্ধাদের খুঁজে বেড়াতেন সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে। প্রথম আলো সমাজের ক্ষত দূর করার জন্য কাজ করে চলেছে। তুমি আটাশ থেকে শতবর্ষে যেতে পার, সেই কামনায়।

অটল ‘প্রথম আলো’।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।