জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমুসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা ছয় আসামিকে ২২ নভেম্বর হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পলাতক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং শেখ হাসিনার সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাতজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তুলে ধরে তা আমলে নেওয়ার আবেদন করেন। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা ছয়জনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট এবং পলাতক মির্জা আজমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চান। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করেন।
পরে সংবাদ সম্মেলনে তামিম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের হত্যায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, কারফিউ জারি, ইন্টারনেট বন্ধ এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এসব অভিযোগের পক্ষে কথোপকথনের রেকর্ড, নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল ও সাক্ষীদের জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগের পক্ষে জাতিসংঘের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ দাখিল করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার কথিত ‘কিল দেম অ্যান্ড হাইড দেওয়ার বডিস’ নির্দেশনার বিষয়টিও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আসামিদের ব্যক্তিগত ভূমিকার বিষয়ে তামিম বলেন, আমির হোসেন আমুর বাসায় ৫ আগস্টের পর বস্তাবন্দি অবস্থায় পাঁচ কোটি টাকা নগদ পাওয়ার তথ্য মামলায় তুলে ধরা হয়েছে। ফারুক খান ৪ আগস্টের নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে ৫ আগস্ট ঢাকার প্রবেশমুখে আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের।
অন্যদিকে, দীপু মনি কারফিউ জারির বৈঠকে অংশ নিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। শাজাহান খান শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে পুলিশ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শ্রমিকদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের বিষয়টিও মামলার অভিযোগে রয়েছে। প্রসিকিউটরের দাবি, স্থাপনায় আগুন দিয়ে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও হাসান মাহমুদের কথোপকথনের রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব রেকর্ডের সত্যতা যাচাইয়ে ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং বিবিসি, আলজাজিরা ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের যাচাই করা ভিডিও-প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তামিম বলেন, সাত আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে উসকানি, সহায়তা, ষড়যন্ত্র ও অবদান রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) অভিযোগ রয়েছে। তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা ছিল বলে দাবি প্রসিকিউশনের।
আগামী ২২ নভেম্বর কারাগারে থাকা ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। মির্জা আজম গ্রেপ্তার হলে তাকেও সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছয় সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান প্রসিকিউটর।
এর আগে গত ২ নভেম্বর সাত নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আসামিরা। ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নিয়ে আন্দোলন দমনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কারফিউ জারি এবং এর আড়ালে হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনায় তারা যুক্ত ছিলেন।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স