প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম || প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
পর্যটকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান করে আবারও মুখর হতে শুরু করেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। প্রথম দিন এমভি বারো আউলিয়ায় করে ৮৩৬ পর্যটক পাড়ি জমিয়েছেন প্রবালদ্বীপে। পর্যটকদের পদচারণায় দ্বীপের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য।
কিন্তু পর্যটন মৌসুমের এই আনন্দের আড়ালেই রয়েছে ভয়ংকর এক শঙ্কা। দ্বীপের হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁর অধিকাংশই রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ স্থাপনা অতি ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ৩০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ। আর মাত্র ১০ শতাংশ স্থাপনা রয়েছে সাধারণ ঝুঁকির মধ্যে।
শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নয়, অধিকাংশ স্থাপনায় আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নেই। দু-একটিতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পাওয়া গেলেও সেগুলোর মেয়াদ শেষ। আবার অনেক জায়গায় নেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা। অনেক হোটেল-কটেজে যাওয়ার কোনো সড়কও নেই। ফলে কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে দ্রুত সেখানে পৌঁছানো এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বাঁশ, কাঠ ও ছনের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি স্থাপনাগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনার পর সেন্টমার্টিনসহ পর্যটন এলাকাগুলোয় অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে তৎপর হয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এরই অংশ হিসেবে দ্বীপে সাত সদস্যের একটি দল পাঠানো হয়। দুদিন ধরে বিভিন্ন হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করে দলটি। এরপর বুধবার (৪ নভেম্বর) স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক, ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের নিয়ে আলোচনা ও অগ্নিনিরাপত্তা মহড়ার আয়োজন করা হয়। সেখানেই উঠে আসে দ্বীপের অগ্নিনিরাপত্তার ভয়াবহ চিত্র।
ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে সেন্ট মার্টিনের হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁর অগ্নিঝুঁকির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। পরিদর্শিত স্থাপনাগুলোর ৬০ শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ৩০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং মাত্র ১০ শতাংশ সাধারণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্বীপে নিবন্ধিত স্থাপনার বাইরে অসংখ্য ছোট-বড় হোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব স্থাপনার সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিচ বলেন, সেন্টমার্টিনে সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। সৌরবিদ্যুৎ ও জেনারেটরের মাধ্যমে হোটেল-কটেজগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হয়। অনেক স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধনে বাঁশ, মুলিবাঁশ ও ছনের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে একটি স্থাপনায় আগুন লাগলে বাতাসের কারণে তা দ্রুত আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদহানির আশঙ্কা রয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ফায়ার সার্ভিসের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেন্টমার্টিনে সেই সুযোগও সীমিত। বাজারসংলগ্ন এক থেকে সোয়া কিলোমিটার এলাকায় টমটম, রিকশা ও ভ্যান চলাচল করলেও দ্বীপের অন্য অনেক এলাকায় হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমন হোটেল ও কটেজ রয়েছে, যেখানে ১৫ থেকে ৪০টি পর্যন্ত কক্ষ থাকলেও যাতায়াতের কোনো সড়ক নেই। কোথাও বালুচর ও নদীর অংশ পেরিয়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিচ বলেন, যেসব কটেজে যাওয়ার নিজস্ব রাস্তা নেই, সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কীভাবে পৌঁছাবেন এবং আগুন নিয়ন্ত্রণ করবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আগুনের তীব্রতা ও তাপের কারণে আশপাশের এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও তার নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ও জেনারেটরের সংযোগ নিরাপদ কি না, তা দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে তদারক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মশার কয়েল ব্যবহারে সতর্কতা, গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ ও কার্যকারিতা যাচাই এবং প্রতিটি স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কটেজ মালিক ফজলুল হক জানান, দ্বীপে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তা অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সেন্টমার্টিনে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য তারা আবেদন করবেন। দ্বীপের অধিকাংশ রিসোর্ট কাঠ ও বাঁশের তৈরি হওয়ায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে হোটেল ও রেস্তোরাঁসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিদর্শনে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ঘাটতি উঠে এসেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি । সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই জাহাজ চলাচল শুরু করা হয়েছে। প্রথম দিন এমভি বারো আউলিয়া চললেও পর্যায়ক্রমে বাকি দুটি জাহাজও চলাচল করবে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স