গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ পিএম

ফিলিস্তিনি শ্রমজীবী বাবা–মায়ের ঘরে বেড়ে ওঠা রাশিদা কীভাবে মিশিগানে এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ফিলিস্তিনি শ্রমজীবী বাবা–মায়ের ঘরে বেড়ে ওঠা রাশিদা কীভাবে মিশিগানে এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন

বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে পঞ্চম মেয়াদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রাশিদা তালিব। তিনি দেশটির ইতিহাসে একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী রাশিদা মিশিগানের ১২তম কংগ্রেস আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। তিনি ৭২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী জেমস হুপার পেয়েছেন মাত্র ২৪ শতাংশের কিছু বেশি ভোট।

মার্কিন কংগ্রেসে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার আইনপ্রণেতাদের অন্যতম রাশিদা ২০১৮ সালে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। সেই বছর কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের একজন তিনি, অন্যজন ইলহান ওমর।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত রাশিদা। এ জন্য তাঁকে সহকর্মীদের তিরস্কারের শিকার হতে হয়েছিল।

বাড়িতে আরবি ভাষায় কথা বলে বড় হয়েছেন রাশিদা। ইংরেজি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভাষা। ছোট ভাই–বোনদের দেখাশোনা করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে মা-বাবার ভূমিকা নিতে হয়েছে।

রাশিদা তালিব একজন স্বাধীনচেতা ও আপসহীন নারী। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি ‘সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা একজন মা।’ রাশিদার নির্বাচনে অংশগ্রহণের মূলে রয়েছে তাঁর দুই ছেলে। তিনি নিজেই এ কথা জানিয়েছেন।

রাশিদা বলেছেন, ‘আমি আমার দুই ছেলের জন্য নির্বাচন করছি, যাঁদের মধ্যে তাদের মুসলিম পরিচিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

রাশিদার বয়স এখন ৫০ বছর। ১৪ ভাই–বোনের মধ্যে সবার বড় রাশিদার জন্ম মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে—দরিদ্র, খেটে খাওয়া এক অভিবাসী ফিলিস্তিনি পরিবারে। তাঁর বাবা-মা দুজনই ফিলিস্তিন এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন। নিজের এই পরিচয় নিয়ে রাশিদা গর্বিত।

মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা নিষিদ্ধ করাসহ প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কিছু রীতির বিরোধিতা করার জন্যই তিনি কংগ্রেস নির্বাচনের দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান রাশিদা।

২০১৮ সালে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়া পর রাশিদা এবিসি টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইতিহাস তৈরির জন্য আমি নির্বাচন করিনি। আমি অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নির্বাচন করেছি। আমাদের ছেলেদের জন্য করেছি, যাঁদের মনে তাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁরা বুঝতে পারছেন না তাঁদের অবস্থান কোথায়। আমি কখনোই দূরে দাঁড়িয়ে দেখার মানুষ নই।’

ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে রাশিদা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় রিপাবলিকানদের একটি নির্বাচনী সভায় ঢুকে রাশিদা সবার সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা শুরু করেছিলেন। তখন তাঁকে জোর করে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

রাশিদা তালিবআমি আমার দুই ছেলের জন্য নির্বাচন করছি, যাদের মধ্যে তাদের মুসলিম পরিচিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

রাশিদা হারবি এলাবেদ ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই ডেট্রয়েটের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৪ ভাই–বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা হারবি এলাবেদ এবং মা ফাতিমা, দুজনই অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তাঁর বাবা পূর্ব জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি নিকারাগুয়ায় যান এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তাঁর মা ফিলিস্তিনের একটি ছোট শহর থেকে এসেছিলেন।

বাড়িতে আরবি ভাষায় কথা বলে বড় হয়েছেন রাশিদা। ইংরেজি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভাষা। ছোট ভাই–বোনদের দেখাশোনা করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে মা-বাবার ভূমিকা নিতে হয়েছে।

পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁর মা-বাবা দুজনই কঠোর পরিশ্রম করতেন। তাঁরা দুজনই ফোর্ড মোটর কোম্পানির ফ্ল্যাট রক অ্যাসেম্বলি কারখানার কর্মী ছিলেন। রাশিদাকে শৈশবে দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হতে হয়েছে।

ফিলিস্তিনি-মার্কিন পরিচয় নিয়ে গর্বিত রাশিদা ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক পরেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল ১৭৩৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত পবিত্র কোরআনের একটি কপি। আর পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী নকশা করা ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’।

পড়াশোনা ও ব্যক্তিজীবন

পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন রাশিদা। ১৯৯৮ সালে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০০৪ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

১৯৯৮ সালে ফায়েজ তালিবকে বিয়ে করেন রাশিদা। এ দম্পতির দুই ছেলে রয়েছে। ২০১৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণ করা রাশিদা বিচ্ছেদের পরও সেই পদবি রেখে দেন।

রাজনীতিতে আসার আগে

আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে যান রাশিদা। সেখানে আরব কমিউনিটি সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিসেসে (অ্যাকসেস) কাজ শুরু করেন।

আরবদের অধিকার নিয়ে কাজ করা রাশিদার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর পেছনে পরিবারের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়েরও ভূমিকা ছিল। ধর্মচর্চা করা মুসলিম হিসেবে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বৈষম্য ও তাঁদের নানা দুর্ভোগের বিষয়টি তিনি কাছ থেকে দেখতে ও বুঝতে পারতেন।

শৈশবে রাশিদাকেও বিদ্রূপ ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। মুদিদোকানে হিজাব পরার কারণে তাঁর মাকে হেনস্তার শিকার হতে দেখেছেন তিনি।

মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিব

রাজনীতিতে যাত্রা

২০০৮ সালে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচনে দলীয় প্রাইমারিতে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন রাশিদা। এরপর সাধারণ নির্বাচনেও জয় পান তিনি। এর মধ্য দিয়ে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালন করা প্রথম মুসলিম নারী হন তিনি।

অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন রাশিদা। তাঁর উদ্যোগে শুরু হয় ‘উই হ্যাভ আ রাইট টু ব্রিদ’ (আমাদের শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে) প্রচারাভিযান। এর লক্ষ্য ছিল আবাসিক এলাকার সড়ক থেকে দূষণ ছড়ানো ভারী ট্রাক সরিয়ে নেওয়া।

ডেট্রয়েট নদীর তীরের কালো ধুলা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ জানাতে শুরু করেন। ওই ধুলা তাঁদের বাড়িঘর ও স্থানীয় পার্কেও ছড়িয়ে পড়ত। এ নিয়ে তদন্তের দাবি জানান রাশিদা। কিন্তু মিশিগান পরিবেশগত মান বিভাগ বাসিন্দাদের জানায়, সবকিছু ঠিক আছে, তদন্তের প্রয়োজন নেই।

তখন নিজেই ধুলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন রাশিদা। পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই ধুলায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। এরপর তাঁর উদ্যোগে নদীর তীর পরিষ্কারে বাধ্য হয় অঙ্গরাজ্য সরকার।

গাজা ইস্যুতে কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবকে ডেমোক্র্যাট মেয়রের সমর্থন

কংগ্রেসে যাওয়ার পথ

মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর সুগার ল সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিসে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন রাশিদা। এটি একটি উদারপন্থী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। নিম্ন আয়ের ব্যক্তি, পরিবার ও সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে কাজ করাই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য। সেখানে কাজ করার সময় ম্যারাথন অয়েল শোধনাগারের দূষণ কমানোর উদ্যোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেন তিনি।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি আসন খালি হয়। ডেট্রয়েট শহর ও আশপাশের কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাশিদা।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে নির্বাচনে তিনি এগিয়ে থাকা প্রার্থী ছিলেন না। অনেকের কাছে তাঁর জয়ের সম্ভাবনাও খুব একটা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জয় পান তিনি। পরে সাধারণ নির্বাচনেও জিতে কংগ্রেসের আসনটি নিশ্চিত করেন।

ফিলিস্তিনি-মার্কিন পরিচয় নিয়ে গর্বিত রাশিদা ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক পরেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল ১৭৩৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত পবিত্র কোরআনের একটি কপি। আর পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী নকশা করা ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’।

প্রথমবার কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরের বছর ২০১৯ সালে রাশিদা তালিবের ওপর ইসরায়েল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলে দেশটির সরকার। ইলহান ওমরের ওপরও সে সময় একই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল বলে জানায় বিবিসি।

ইলহানের মতো রাশিদাকেও দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, দ্য নিউ আরব, ন্যাশনাল উইমেন্স হিস্ট্রি মিউজিয়াম

মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য রাশিদা ও ইলহানকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দাবি ট্রাম্পের

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।