গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব তারা

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব তারা
ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে লিবিয়ায় বন্দি হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার পাঁচ ব্যক্তি। প্রচণ্ড নির্যাতনের পর জীবন নিয়ে তারা ফিরতে পেরেছেন বটে, তবে সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ফুলবগাদী, নিমতলা ও বড়গাংনী গ্রামে গিয়ে জানা গেছে, ফুলবগাদী গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ হাসান, কামরুল হাসান, জাহিদুল ইসলাম, নিমতলা গ্রামের আলিফ ও বড়গাংনী গ্রামের ছাব্বির আলী প্রলোভনের শিকার হয়েছেন। বয়সে একুশ থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব এই পাঁচজনের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে দারিদ্র্য ঘোচানো। সেই স্বপ্নই তাদের ঠেলে দেয় এক ভয়াবহ বিপদের মুখে। নিমতলা গ্রামের মসজিদপাড়ার বাসিন্দা চায়ের দোকানি আসাদুল। এলাকায় তিনি পরিচিত আপানুর নামে। তার ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউসের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পাঁচজনের পরিবারের কাছে পৌঁছায় লোভনীয় প্রস্তাব। ইতালিতে মাসে ৪-৫ লাখ টাকা আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কর্মী সংগ্রহের কথা বলা হয়। আপানুরের ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউস নিজে বিদেশে থাকায় ওই প্রস্তাব নিয়ে কেউ সন্দেহ করেনি। প্রস্তাবে রাজি হয়ে জমি বন্ধক, গবাদি পশু বিক্রি ও স্ত্রীর অলংকার বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে ভুক্তভোগীরা। কেউ কেউ ঋণ নেন এনজিও থেকে। চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক টাকা যাওয়ার আগে এবং বাকিটা ইতালি পৌঁছে দেয়ার শর্তে অর্থ পরিশোধ করেই তারা রওনা দেয়। সরাসরি ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ হয়ে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয় পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র। বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ। আরও ৫৭ জনসহ বন্দি করে রাখা হয় একটি ঘরে। সেখান থেকে একেক জনকে আলাদা করে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে তাদের দিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে করানো হতো ফোন। চাওয়া হতো মুক্তিপণ। অর্থ দিতে রাজি না হলেই শুরু হতো শারীরিক নির্যাতন। কখনো নির্যাতনের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফোন করিয়ে টাকা চাইতে বাধ্য করা হতো ভুক্তভোগীদের। এভাবে বিভিন্ন দফায় তাদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। এত অর্থ দেয়ার পরও ইতালি পৌঁছানো হয়নি তাদের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ টিউব দিয়ে তৈরি নৌকায় করে সাগরপথে ইতালির পথে ঠেলে দেওয়া হয় তাদের। তবে সাগর পাড়ি দেয়ার সময় টিউব ফুটো হয়ে ডুবে যাওয়ার সময় কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ধরা পড়ায় বিদেশি কারাগারে বন্দি হন তারা। সেখান থেকে মুক্তি পেতেও দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। শেষপর্যন্ত অন্য একজন দালালের সহায়তা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় দেশে ফেরেন ওই পাঁচজন। এদিকে, দেশে ফিরে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযুক্ত দালাল মোহাম্মদ আলী হাউস টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।  এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত দালাল হাউসের বাবা আসাদুল ওরফে আপানের দাবি, তার ছেলে কোনো অন্যায় করেননি।বরং ভুক্তভোগীরাই সাগর দেখে ভয়ে নিজেরা পালিয়ে এসেছে। নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। ফুলবগাদী গ্রামের মসজিদপাড়ার মরহুম খোদ বক্সের ছেলে প্রতারণার শিকার জাহিদ হাসান (৫০) বলেন, তার ৩০০ ভেড়ার একটি খামার ছিল। ছিল জমি চাষ করার ট্রাক্টর। তিনি ১২ বছর কুয়েতে ছিলেন। তার ছিল গ্রামীণ স্বচ্ছল জীবন। সব বিক্রি করে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনিসহ আরও কয়েকজন ভালো বেতনের প্রলোভনে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নির্যাতেনের শরীর নিয়ে প্রায় সারা দিনই তিনি ঘুমিয়ে কাটান। প্রায় ২৯ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। একই গ্রামের আইজউদ্দিনের ছেলে কামরুল ইসলাম (৪২) জানান, তারও ৬০টি ভেড়ার একটি খামার ছিল। গোয়ালে ছিল ১২টি গরু। সব বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে, জমি বর্গা দিয়ে তিনি দালালদের ৩২ লাখ টাকার চাহিদা মিটিয়েও পৌঁছাতে পারেননি স্বপ্নের ইতালিতে। ওই গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে জাহিদুল ইসলাম (২১) বলেন, বাড়িতে গরু-ছাগল পুষে সেগুলো বিক্রি করে তার স্বচ্ছল জীবন কাটছিল। ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে দালালদের খপ্পরে পড়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তিনি দালালদের হাতে তুলে দিয়েছেন ৩৪ লাখ টাকা। নিমতলা গ্রামের এনামুলের ছেলে আলিফ (২১) সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দালালদের প্ররোচনায় পড়ে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তিনি ৩০ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। চলে গেছে সেনাবাহিনীর চাকরিও। বড়গাংনী গ্রামের সাদ আহম্মদের ছেলে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সরকারি কলেজের ইসলামী ইতিহাসের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাব্বির আলী। তিনি দৈন্যতা ঘোঁচাতে পড়াশুনা বাদ দিয়ে দালালের মাধ্যমে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে লিবিয়ায় ২২ লাখ টাকা খুইয়ে তাকেও দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা জেনেছি এই উপজেলার তিন গ্রামের পাঁচ ব্যক্তি অবৈধভাবে বিদেশ গিয়ে প্রচুর অর্থ খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। আমরা সবসময় বলে আসছি, যারা বিদেশে যেতে চায় তারা যেনো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হয়ে বিদেশে যায়। দক্ষ হয়ে বৈধভাবে বিদেশে গেলে তিনি দেশে ও পরিবারের কাছে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা উপজেলার পক্ষ থেকে তাদের সচেতন করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো। যে পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা যদি উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসে, তাদের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। 

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।