গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ পিএম

শরণার্থীশিবির থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কীভাবে আলোচিত রাজনীতিক হয়ে উঠলেন ইলহান

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
শরণার্থীশিবির থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কীভাবে আলোচিত রাজনীতিক হয়ে উঠলেন ইলহান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দলের কট্টর রিপাবলিকানরাও ইলহান ওমরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে ইলহানের বাড়িতে তল্লাশি চালান যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় দপ্তরের কর্মকর্তারা।

কিন্তু এসব কিছুই ইলহান ওমরকে আটকাতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের লোকজন তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পর ইলহান বলেছিলেন, তিনি চুপ থাকবেন না।

ইলহান চুপ থাকেননি। বরং বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

গত মঙ্গলবারের ভোটে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির জন নেইগল তাঁর সামনে দাঁড়াতেই পারেননি। বার্তা সংস্থা এপির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইলহান সাড়ে ৭৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। নেইগল পেয়েছেন ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট।

ইলহানের নির্বাচনী এলাকা মিনিয়াপোলিস ও এর আশপাশের শহরতলি (মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট)। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের এই এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ডেমোক্র্যাট-সমর্থক নির্বাচনী এলাকার একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে এই নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন ইলহান।

গত আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রাইমারিতেও ইলহান বড় ব্যবধানে জিতে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেছিলেন।

মঙ্গলবার বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর এক বিবৃতিতে ইলহান ওমর বলেন, ‘ধন্যবাদ, মিনেসোটা। আমরা কারা এবং কোন আদর্শে বিশ্বাস করি, তা আবারও বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমরা ভয় ও বিভেদকে জয় করি। ঘৃণা ও সংকীর্ণতাকে প্রত্যাখ্যান করি। আমরা একে অপরের পাশে থাকি।’

ইলহানের নির্বাচনী এলাকা মিনিয়াপোলিস ও এর আশপাশের শহরতলি (মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট)। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের এই এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ডেমোক্রেট-সমর্থক নির্বাচনী এলাকার একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে এই নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন ইলহান।
বাড়িতে ট্রাম্প প্রশাসনের তল্লাশির পর ইলহান বললেন, ‘আমি চুপ থাকব না’

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

ইলহান ওমরের জন্ম সোমালিয়ায়, ১৯৮২ সালে। তিনি সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। রাজধানী মোগাদিসুতে জন্ম হলেও তিনি বেড়ে ওঠেন দেশটির বায়ধাবো শহরে। তাঁর বাবার নাম নূর ওমর মোহাম্মদ। মা ফাধুমা আবুকার হাজি হুসেইন। ইলহানের দুই বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। এরপর বাবা ও দাদার কাছে বড় হন তিনি। তাঁরা ছিলেন মধ্যপন্থী সুন্নি মুসলিম।

১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ইলহান। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র আট বছর।

সোমালিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর নানা পথ ঘুরে কেনিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে পরিবারটির আশ্রয় মেলে। ইলহান পরিবারের সঙ্গে চার বছর ওই শরণার্থীশিবিরে বসবাস করেছেন। ১৯৯৫ সালে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। প্রথমে ছিলেন নিউইয়র্কে।

স্থানীয় একটি গির্জার পৃষ্ঠপোষকতায় ইলহানের পরিবার ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে আসার সুযোগ পায়। পরিবারটি সেখানেই স্থায়ী হয়। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন ইলহান।

ইলহান ওমরকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যেতে বললেন ট্রাম্প
ওয়াশিংটন ডিসিতে ইলহান ওমরের বাসভবনের প্রবেশপথে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের (এইচএসআই) কর্মকর্তারা। ১২ অক্টোবর ২০২৬

বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সে ইলহান যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তখন ইংরেজির ওপর তাঁর সামান্য দক্ষতা ছিল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ভেতর তিনি ইংরেজি ভাষা খুব ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেন।

কিশোর বয়স থেকেই নিজের দাদার অনুবাদক হিসাবে ইলহান ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন সভায় যেতেন।

নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরেকটি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে হামফ্রে স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে পলিসি ফেলো হিসেবে কাজ করেন।

২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন এডুকেটর হিসেবে কাজ করেন ইলহান। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মিনেসোটা শিক্ষা বিভাগে শিশুদের পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রমের সমন্বয়ক ছিলেন।

২০১৩ সালে মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে অ্যান্ড্রু জনসনের প্রচার ব্যবস্থাপক হন ইলহান। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাঁর জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক সহকারী হিসেবে কাজ করেন।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে উইমেন অর্গানাইজিং উইমেন নেটওয়ার্কের নীতি ও উদ্যোগবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইলহান ওমর।

ইলহান ২০১৬ সালে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের আইনসভার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

ইলহান ওমরধন্যবাদ, মিনেসোটা। আমরা কারা এবং কোন আদর্শে বিশ্বাস করি, তা আবারও বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমরা ভয় ও বিভেদকে জয় করি। ঘৃণা ও সংকীর্ণতাকে প্রত্যাখ্যান করি। আমরা একে অপরের পাশে থাকি।
ইলহান ওমর কী বলেছেন, কেন তাঁর পেছনে লেগেছেন রিপাবলিকানরা

অনেক প্রথমের জন্ম দেওয়া ইলহান

২০১৮ সালে প্রথমবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে অনেক প্রথমের জন্ম দিয়েছেন সোমালি বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।

ইলহানই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মার্কিন, যিনি মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করতে গেছেন।

সেবার বিজয়ী ভাষণে ইলহান বলেছিলেন, ‘আজ রাতে অনেকগুলো প্রথম বিশেষণের অধিকারী হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। হিজাব পরা নারী হিসেবে আমি কংগ্রেস যাচ্ছি, আমিই প্রথম শরণার্থী যে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছি এবং প্রথম একজন মুসলিম নারী হিসাবে কংগ্রেসে যাচ্ছি।’

ইলহান সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কট্টর সমর্থক। একই সঙ্গে ঘণ্টায় কমপক্ষে ১৫ ডলার মজুরির পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। বহুদিন ধরে অভিবাসী ও শরণার্থী ইস্যু নিয়েও কাজ করেন তিনি।

২০১৮ সালের নির্বাচনে জেতার পর তিনি বলেছিলেন, এ বিজয় শরণার্থীশিবিরে বাস করা আট বছর বয়সী এক শিশুর বিজয়। এই বিজয় একজন তরুণীর, যাকে জোর করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। এই বিজয় তাদের, যাদের স্বপ্ন দেখায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।

ইলহান ওমরের শপথ অনুষ্ঠানে তাঁর বাবা নূর ওমর মোহামেদ ও ন্যান্সি পেলোসি
মিনেসোটায় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে জিতলেন ইলহান ওমর

ট্রাম্পের সঙ্গে কথার লড়াই

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার ইলহান ওমরকে তাঁর জন্মস্থান নিয়ে আক্রমণ করেছেন। ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দুই মেয়াদে ট্রাম্প বহুবার এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওভাল অফিসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আপনি জানেন, আমি সোমালিয়ার প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম? আমি তাঁকে বলেছিলাম, তিনি হয়তো তাঁকে (ইলহান ওমর) ফিরিয়ে নিতে চান। তিনি বলেছিলেন, “আমি তাঁকে চাই না”।’

জবাবে ইলহান বলেছিলেন, তাঁর অভিবাসন মর্যাদা নিয়ে এমন কথায় তিনি মোটেই উদ্বিগ্ন নন।

বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সে ইলহান যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তখন ইংরেজির ওপর তাঁর সামান্য দক্ষতা ছিল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ভেতর তিনি ইংরেজি ভাষা খুব ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেন।

দ্য ডিন ওবেইদাল্লাহ শোতে ইলহান বলেছিলেন, ‘আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি জানি না, তারা কীভাবে আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে এবং আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। তবে এটি কোনো ভীতিকর হুমকি কি না, তা–ও আমি জানি না।’

ইলহান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে আরও বলেছিলেন, ‘আমি সেই আট বছরের শিশু নই, যে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছিল। আমি বড় হয়েছি, আমার সন্তানেরাও বড়। আমি চাইলে যেখানে খুশি গিয়ে থাকতে পারি। প্রতিদিন সকালে উঠে প্রতিটি আলোচনায় “আমরা ইলহানকে দেশ থেকে বের করে দেব”—এমন কথা বলাটা খুবই অদ্ভুত।’

মঙ্গলবারের ভোটে ইলহানের সামনে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির জন নেইগল দাঁড়াতেই পারেননি

পরিবার

ইলহান ওমরের বয়স এখন ৪৪ বছর। তাঁর তিনটি সন্তান রয়েছে। তাঁর স্বামীর নাম টিম ম্যানেট। ২০২০ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। পলিটিক্যাল কনসালট্যান্ট ম্যানেট বিয়ের আগে থেকেই ইলহানের নির্বাচনী প্রচার দলের সদস্য।

ম্যানেটকে বিয়ে করার আগে আহমেদ হিরসির সঙ্গে ইলহানের বিয়ে হয়েছিল। ২০১৯ সালে তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়। তিনি একজন সাবেক ব্যাংকার। তার আগে আহমেদ নূর সাইদ নামের একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ইলহানের।

ইসরায়েল ও মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলি লবির প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করার কারণে মাঝেমধ্যে তিনি নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেও তোপের মুখে পড়েন। অনেকই তাঁকে ইহুদিবিদ্বেষী বলেন।

তথ্যসূত্র: পলিটিকো, সিবিএস, আল–জাজিরা, আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি

ইলহান ওমরকে ভালোবেসে সংসার ত্যাগ!

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।