গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২০ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

সেন্ট মার্টিনে প্রথম রাত ৫০০ পর্যটকের, ‘নীল জলের এমন দ্বীপ মন ভালো করে দেয়’

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
সেন্ট মার্টিনে প্রথম রাত ৫০০ পর্যটকের, ‘নীল জলের এমন দ্বীপ মন ভালো করে দেয়’

প্রায় ১০ মাসের বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। মৌসুমের প্রথম দিন আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজার থেকে ৮০০ পর্যটক নিয়ে দ্বীপে পৌঁছায় এমভি বার আউলিয়া। পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেলমালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮০০ পর্যটকের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন বেলা সাড়ে তিনটার দিকে একই জাহাজে কক্সবাজার ফিরে যান। বাকি ৫০০ জন দ্বীপের বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে রাত কাটাচ্ছেন।

স্বচ্ছ নীল জল, প্রবাল পাথর আর নির্মল বাতাসে মুগ্ধ এসব পর্যটকের জন্য আজ সেন্ট মার্টিনে মৌসুমের প্রথম রাত।

বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে ৮০০ পর্যটক নিয়ে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া। প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর বেলা সোয়া একটার দিকে জাহাজটি সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছায়।

জাহাজ থেকে পর্যটকেরা নামার পর স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। মিষ্টিমুখও করানো হয়। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় দ্বীপের ব্যবসায়ী, হোটেলমালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও ফিরেছে স্বস্তি।

পর্যটকদের চোখে সেন্ট মার্টিন

প্রথমবারের মতো সেন্ট মার্টিনে এসে মুগ্ধ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। বন্ধুদের সঙ্গে এক রাত কাটিয়ে শুক্রবার বিকেলে একই জাহাজে কক্সবাজার ফিরে যাবেন তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, ‘জাহাজ থেকে নীল জলের সেন্ট মার্টিন দেখতে একরকম, আবার সৈকতে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ নীল জলের সেন্ট মার্টিন আরেক রকম। নীল জলের এমন দ্বীপ মন ভালো করে দেয়। পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই আমরা প্রকৃতিকে উপভোগ করব।’

ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রথমবারের মতো সেন্ট মার্টিনে এসেছেন। উঠেছেন দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের একটি রিসোর্টে। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে জাহাজটি যখন গভীর বঙ্গোপসাগরের দিকে যাচ্ছিল, তখন সবাই উচ্ছ্বসিত ছিল। টানা পাঁচ ঘণ্টা সাগরের মাঝে থাকতে থাকতে ক্লান্তি এলেও সেন্ট মার্টিনে পা রাখতেই সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে গেছে।’

দ্বীপের মধ্যভাগের দোকান থেকে সাইকেল ভাড়া নিয়ে কয়েকজন পর্যটক ছুটছিলেন দক্ষিণের দিয়ারমাথা সৈকতের দিকে। এই সৈকতের আরও দক্ষিণে রয়েছে বিচ্ছিন্ন দুই দ্বীপ মাঝেরদিয়া ও ছেঁড়াদিয়া। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত নিষিদ্ধ। এ কারণে সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে খুঁটির সঙ্গে লাল নিশানা উড়িয়ে রশি টেনে ঘিরে রাখা হয়েছে।

১০ মাস পর পর্যটক নিয়ে সেন্ট মার্টিন গেল জাহাজ

বিকেলে কয়েকজন পর্যটক দিয়ারমাথা সৈকত থেকে ছেঁড়াদিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁদের বাধা দেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সেন্ট মার্টিন কার্যালয়ের মেরিন পার্কের সুপারভাইজার আবদুল আজিজ বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারপরও কেউ কেউ সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছেঁড়াদিয়ায় যাতায়াত ঠেকাতে দিয়ারমাথা ও মাঝেরদিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৫০০ মিটার সৈকতে লাল নিশানা ও তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে।

সেন্ট মার্টিনের পূর্ব সৈকতে একটি নৌকায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন পর্যটক। তাঁদের পেছনে নীল জলরাশি, দূরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। দলের তরুণ সাদমান বলেন, সকালে এমভি বার আউলিয়ায় করে তাঁরা ১৬ জন দ্বীপে পৌঁছান। জেটিঘাটে নামার পর স্থানীয় লোকজন তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করেন, কয়েকজনকে মিষ্টিমুখও করান। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দলের ১০ জন একই জাহাজে কক্সবাজার ফিরে গেছেন। তাঁরা ছয়জন দ্বীপে রাত কাটাবেন।

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণে সংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়াতে পর্যটক নিয়ন্ত্রণে দিয়ারমাথা সৈকতে লাল নিশানা দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের। আজ বিকেলে

দলের আরেক সদস্য হাসমত বলেন, ‘স্বচ্ছ নীল জলের সাগর, প্রবাল পাথর দেখেছি। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাংলোবাড়ি সমুদ্রবিলাস দেখা হলো। অচেনা সামুদ্রিক মাছ ফ্লাইং ফিশ (উড়ন্ত মাছ) দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছি। অনেক দিন ধরে ভ্রমণের এমন একটা জায়গা খুঁজছিলাম।’

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আরও কয়েকজন পর্যটক বলেন, মৌসুমের প্রথম দিনেই সেন্ট মার্টিনে আসতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। স্থানীয় লোকজনের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়াও তাঁদের ভালো লেগেছে। দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রচার চালানো হচ্ছে। পর্যটকেরাও বিধিনিষেধ মেনে ভ্রমণ উপভোগের চেষ্টা করছেন।

পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ড। দ্বীপে পর্যটকদের চলাচল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশের বিষয়গুলো নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

এর মধ্যে অন্যতম প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে দ্বীপে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়–বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক, যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পর্যটকেরা দ্বীপে কী করছেন, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন কি না এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে সংবেদনশীল এলাকায় যাচ্ছেন কি না—সেসব তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন কোস্টগার্ড স্টেশনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মারুফ আহমেদ বলেন, পর্যটকদের সচেতন করতে কোস্টগার্ড সদস্যরা নিয়মিত কাজ করছেন। দ্বীপে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়মিত টহল এবং পোর্ট প্যাট্রোল অব্যাহত রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটকেরা ভ্রমণ ও রাত যাপন করতে পারবেন।

পর্যটক বাড়ছে, সেন্ট মার্টিন ঝুঁকিতে

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম জানান, সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য একমুখী জাহাজভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়ার ক্ষেত্রে কেবিনের সুবিধা রয়েছে। আগামী দিনে এমভি কর্ণফুলী, এমভি টেকনাফসহ আরও কয়েকটি জাহাজ এই পথে চলাচলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সরকার অনুমোদিত জাহাজে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিন যেতে পারবেন। গত বছর পর্যটকবাহী একটি জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এবার যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোর ফিটনেস যাচাই করছে।

অতিরিক্ত পর্যটকের সমাগম ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ায় দুই বছর আগে সরকার দ্বীপটি রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা জারি করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এই দ্বীপে এখনো বিভিন্ন বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। পর্যটকদের এসব নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।