গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫০ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

ইংরেজি শেখার স্বপ্ন দেখিয়ে ভর্তি, ২৮৪ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ইংরেজি শেখার স্বপ্ন দেখিয়ে ভর্তি, ২৮৪ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিল শিশুরা। কেউ নার্সারি থেকে, কেউ প্রাথমিকের বিভিন্ন শ্রেণিতে। বছরের পর বছর ইংরেজিতে পড়াশোনা করে সামনে এগোনোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিল তারা। কিন্তু হঠাৎ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে সেই স্বপ্নের সামনে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। 

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে বাংলা মাধ্যমে পড়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। অন্যথায় তাদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হবে।

সামনে বার্ষিক পরীক্ষা ও নতুন শ্রেণিতে ওঠার প্রস্তুতি। এই সময়ে পরীক্ষার দুশ্চিন্তা সামলাবে, নাকি স্কুলে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববে এমন উদ্বেগে দিন কাটছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে নার্সারি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ২৮৪ জন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী রয়েছে। এত শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী স্বল্পতার যুক্তিতে একটি চলমান শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের অভিযোগ, অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার ও ইংরেজি মাধ্যম চালু রাখার দাবিতে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।

স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমের জন্য পৃথক শিক্ষক কমিটি গঠন, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে। স্মারকলিপিতে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনের সুপারিশও রয়েছে।

বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, চাকরি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ইংরেজির গুরুত্ব তুলে ধরে সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন।

তিনি কালবেলাকে বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকে থাকা এবং অগ্রগতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ইংরেজি। বিশ্বের অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। উচ্চশিক্ষা কিংবা গবেষণা করতে চাইলে ইংরেজিতে দক্ষতা জরুরি। দেশের বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, এনজিও ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও ভালো চাকরির জন্য ইংরেজি জানা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ইন্টারভিউ কিংবা ভাইভা বোর্ডে, বিদেশি মক্কেলদের সঙ্গে যোগাযোগে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি সেতুবন্ধের কাজ করছে। তাহলে যেখানে ইংরেজির প্রসার হওয়ার কথা, সেখানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইংরেজি মাধ্যম বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাংলা মাধ্যমে ফিরিয়ে নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে। এটি শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে।

অভিভাবকদের পক্ষে স্মারকলিপি দেওয়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনা আল রেশমা (এ্যানী) বলেন, হঠাৎ করে এক মাস আগে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে আগামী বছর থেকে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হবে না। শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে, বাংলা মাধ্যমে পড়তে হবে, অন্যথায় অন্য স্কুল খুঁজতে হবে। এতে শিশুদের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, চান্দগাঁও এলাকায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ বিবেচনায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। কেউ কেউ এ এলাকায় বাসাও নিয়েছেন। এখন হঠাৎ করে স্কুল পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। শিক্ষার্থীরা স্কুলে থাকতে পারবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না।

আমিনা আল রেশমার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অন্য স্কুল খোঁজার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন এবং তাদের বিদায় নেওয়ার কথাও বলেছেন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়েই মানসিক চাপে পড়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর সমাধান হোক। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করলে প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করেছি। পরে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীসংখ্যা ও আর্থিক বাস্তবতার বিষয়টি সামনে এনেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন কালবেলাকে বলেন, আমি স্মারকলিপি পেয়েছি। সেটি সিডিএ স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। শিক্ষার্থী যে পরিমাণ রয়েছে, তা দিয়ে ইংরেজি মাধ্যম চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলব। সবকিছুর পেছনেই টাকার বিষয় আছে। অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কী করা যায়, তা ঠিক করব।

তবে ইংরেজি মাধ্যমের গুরুত্বও স্বীকার করেছেন সিডিএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ইংরেজি ছাড়া উন্নতি করা সম্ভব নয়। দেশের বাইরে গেলেও ইংরেজির প্রয়োজন হয়। তাই বিষয়টি নিয়ে কিছু করা যায় কি না, তা দেখব। এ বিষয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করব। সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের সঙ্গেও কথা বলব। বিষয়টি নিয়ে স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গেও কথা বলব।

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আবু হেনা বলেন, মূলত ইংরেজি মাধ্যমে আমরা আলাদা করে সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছি না। মানসম্মত শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২০ থেকে ২৫ জনের মতো। দশম শ্রেণিতে গিয়ে তা চার-পাঁচজনে নেমে আসে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার স্বপ্ন থাকলে শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুলে চলে যেতে পারে। ২০১৪ সাল থেকে বিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

জানা গেছে, গত ১১ অক্টোবর সিডিএ পাবলিক স্কুল কর্তৃপক্ষ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে শিক্ষার্থী স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইংরেজি মাধ্যমে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে এসব শ্রেণিতে বর্তমানে ইংরেজি মাধ্যমে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে বাংলা মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ পাবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

বৃহস্পতিবার সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া অভিভাবকদের স্মারকলিপিতে ইংরেজি মাধ্যম চালু রাখা, গত ১১ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অর্জন অনলাইন ও অফলাইনে প্রচার, পৃথক শিক্ষক কমিটি গঠন এবং নিয়মিত ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।