নির্বাচনের ছয় দিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুই ডজনের বেশি শীর্ষ কৌশলবিদ একটি ব্যক্তিগত ভিডিও বৈঠকে যোগ দেন।
সবার মন খারাপ ছিল। বৈঠক শুরু হয় সায়ানাইড নিয়ে কথা বলে।
প্রেসিডেন্টের প্রধান জনমত জরিপকারী টনি ফাব্রিজিও জিজ্ঞাসা করেন, ‘আগে সাদা বড়ি খাবেন, নাকি কালো বড়ি?’
রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ তথ্য পরামর্শকদের একজন টিম সেলার দুটি সম্ভাবনার কথা বলেন। প্রথম সম্ভাবনা হলো ৪০ কোটি ডলারের ‘মাগা ইনকরপোরেটেড’ (ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থনকারী একটি রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহকারী সংগঠন) সুপার পিএসি ঠিক সেই ভোটারদের কাছে পৌঁছেছে, যাদের কাছে তারা যেতে চেয়েছিল এবং যাঁরা ভোট দেবেন বলে আশা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এটাই আশাবাদী সম্ভাবনা।’
অন্য সম্ভাবনা ছিল বড় পরাজয়।
প্রেসিডেন্টের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কৌশল দেখার জন্য হোয়াইট হাউস ছেড়ে যাওয়া জেমস ব্লেয়ার বলেন, ‘আমি আমার শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে রাখছি। বাকিদেরও তা করার পরামর্শ দিচ্ছি।’ বৈঠকে থাকা চারজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর কথায় সবাই হেসেছিলেন।
প্রায় ৩০ মিনিট ধরে বৈঠকে পরাজয়ের আশঙ্কা নিয়ে এ ধরনের ‘কালো রসিকতা’ চলে। কথা ওঠে শেষকৃত্যের আয়োজন, কারাগারের খাবার, প্রেসিডেন্টের ক্ষমা এবং দেশ ছেড়ে পালানোর বিষয়ে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা উল্লেখ করে ব্লেয়ার ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘অন্তত বিবি তো জিতেছেন। তিনি আমাদের রক্ষা করবেন।’ আগের দিন ইসরায়েলে নির্বাচন হয়েছিল। নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। পরে তাঁর দল দাবি করে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে।
ফাব্রিজিও বলেন, ‘হয়তো আমরা ইসরায়েলে আশ্রয় চাইতে পারি।’
ভোটের দিনে বড় পরাজয়
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপ্তি এক সপ্তাহ পর স্পষ্ট হয়।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান–সমর্থিত রাজ্যে তাদের জয় ছিল বড় সাফল্য। এক বছর আগেও খুব কম মানুষ এমন ফল কল্পনা করতে পেরেছিলেন।
রিপাবলিকান পার্টির এই ভরাডুবির বিবরণ তৈরি হয়েছে ৭০ জনের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইনপ্রণেতা, রাজনৈতিক কৌশলবিদ, দলীয় নেতা, জনমত জরিপকারী, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা এবং কংগ্রেসের সহকারীরা। তাঁরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ব্যক্তিগত আলোচনা ও সিদ্ধান্তের কথা বলতে তাঁদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
এই পরাজয়ের মাত্রা আগে থেকে নিশ্চিত ছিল না।
রিপাবলিকানদের হাতে ছিল রেকর্ড পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল। তাঁদের পাশে ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। প্রচারের অর্থায়ন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অনুকূল একটি রায়ও ছিল। অন্যদিকে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা তখন হতাশ এবং জনপ্রিয়তাহীন ছিল।
সিনেট নির্বাচনে এমন রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হতো, যেসব রাজ্যে তারা কয়েক দশক ধরে জেতেনি।
প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দল ১০ বছর পরপর নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদলানোর রীতি ভেঙে মাঝপথেই নতুন সীমানা টানার উদ্যোগ নেয়। এতে রিপাবলিকানদের সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও নিরাপদ করার জন্য নতুন নির্বাচনী এলাকা তৈরি করা হয়।
কিন্তু অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে জনগণের আস্থা হারানো একজন প্রেসিডেন্টকে দলটি সামাল দিতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধও তাদের হিসাবে ছিল না। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায় এবং গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি চার ডলারের বেশি হয়। নির্বাচন পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে।
এবার ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের ভুলগুলো কাজে লাগাতে প্রস্তুত ছিল।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা
জেমস ব্লেয়ার ছিলেন ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের একজন কর্মী। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল আইনপ্রণয়ন, রাজনৈতিক বিষয় ও জনসংযোগ। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি সাময়িকভাবে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব ছেড়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী কৌশল পরিচালনা করেন।
গ্রীষ্মকালে জেমস ব্লেয়ার হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে একটি উপস্থাপনা পাঠিয়েছিলেন। তাতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট ছিল।
একটি স্লাইডে রিপাবলিকানদের জনমত জরিপের ফলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের সময়রেখা দেখানো হয়েছিল।
স্লাইডে দেখা যায়, যুদ্ধ চলার সময় ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান বেড়েছিল। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলার সময় সেই ব্যবধান কমেছিল। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ব্যবধান আবার বেড়ে যায়।
জুলাইয়ের শেষ নাগাদ কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ১০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
স্লাইডের মূল বার্তাটি ছিল পরিষ্কার। হলুদ রঙে লেখা ছিল, ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান ৪ শতাংশ পয়েন্ট হলে রিপাবলিকানদের প্রতিনিধি পরিষদে জেতার কিছু সম্ভাবনা থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি চালু থাকা এবং গ্যাসের দাম কমা ছাড়া তা সম্ভব হবে না।
স্লাইডে আরও বলা হয়েছিল, ‘শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা ১০ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলে আমরা সম্ভবত সিনেটও হারাব।’
মঙ্গলবারের ফল ছিল আরও খারাপ। নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের দল জাতীয়ভাবে কংগ্রেস নির্বাচনের জনপ্রিয় ভোটে প্রায় ১৩ পয়েন্টে হারতে যাচ্ছে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পরের সময় থেকে গত অর্ধশতকে এটি সবচেয়ে বড় পরাজয় হতে পারে।
ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ভাবতে শুরু করেছিলেন, অন্য সিদ্ধান্ত নিলে কী হতে পারত।
তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমরা যদি কখনো ইরানে যুদ্ধে না যেতাম, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী হতো?’
নিয়ন্ত্রণহীন দ্বিতীয় মেয়াদ
ভোটারদের কাছে যুদ্ধটি একটি সহজ বার্তা তৈরি করেছিল।
প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প নতুন যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করেন।
ট্রাম্প দাম কমানোর কথা বলেছিলেন; কিন্তু গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, মূল্যস্ফীতিও বাড়ে।
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয় শুধু ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতির গল্প ছিল না। এটি ছিল মাত্রা ছাড়ানো ক্ষমতা প্রয়োগের গল্পও।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির পর ট্রাম্প যখন আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর কিছু উপদেষ্টার ধারণা ছিল, ট্রাম্প হয়তো মনে করতেন, রাজনৈতিক নিয়ম আর তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। মঙ্গলবার রাতের ফল সেই ধারণা ভেঙে দেয়।
প্রায় দুই বছরে আত্মবিশ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া ঔদ্ধত্য ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনদর্শনে পরিণত হয়েছিল।
একটির পর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে—ট্রাম্প, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে প্রকাশ্যেই নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছেন। এসব প্রতিবেদন ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। অক্টোবরের শুরুর দিকে ফক্স নিউজের একটি জনমত জরিপে দুর্নীতি ছিল ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সব সময় আমেরিকার জনগণের স্বার্থে কাজ করেন। এখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত নেই।’
২০২৫ সালে ট্রাম্প পুরো বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। এক বছরের বেশি সময় পরও সেই যুদ্ধের প্রভাব পড়ছিল খামারগুলোতে। বিশেষ করে কানসাস, টেক্সাস ও আইওয়ার মতো রাজ্যে, যেগুলো হঠাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এসবের মধ্যে ট্রাম্প এমন আচরণ করছিলেন, যেন তাঁর নীতির কারণে আমেরিকানদের যে কষ্ট হচ্ছিল, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না।
গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এটা মেনে নেওয়ার মতো ছোট মূল্য।’
ট্রাম্পের দলের কয়েকজন সদস্য বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প সীমান্তের চেয়ে নিজের নতুন বলরুম নিয়ে বেশি কথা বলেন। মুদিপণ্যের দামের বদলে গলফ কোর্স নিয়ে এবং মূল্যস্ফীতির বদলে ঘরের সাজসজ্জা নিয়ে বেশি কথা বলেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের রাতে ট্রাম্পের শেষ প্রচারবার্তায় ছিল ন্যাশনাল মলে ‘রিফ্লেক্টিং পুল’ সংস্কারের কথা। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, আব্রাহাম লিংকনের নামে না রেখে নিজের নামে পুকুরটির নাম রাখার কথা ভাবছেন।
এবার ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের প্রতিদিনের নতুন বিতর্কে জড়ায়নি। তারা দুর্নীতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক তুলে ধরেছে। তারা এমন একটি সরকারের চিত্রও তুলে ধরেছে, যা সাধারণ মানুষের কষ্টের সময় ধনীদের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এর মধ্যে ছিল জেফরি এপস্টিনের সুরক্ষিত সহযোগীরা এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগতভাবে ২২০ কোটি ডলার মুনাফা করার খবর।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদলের উদ্যোগের দ্রুত জবাব দেন। তাঁরা রিপাবলিকান–সমর্থিত এলাকাগুলোতেও শক্তিশালী প্রার্থী দেন, যাতে আরও বেশি এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী কয়েকজন প্রার্থী খুঁজে বের করেন। তাঁদের কারণে এমন কিছু রাজ্যেও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেগুলোকে আগে জেতা অসম্ভব মনে হতো।
নির্বাচনের শেষ কয়েকটি উত্তেজনাপূর্ণ সপ্তাহে রিপাবলিকানরা নর্থ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার মতো পরিচিত দোদুল্যমান রাজ্য থেকে অর্থ সরিয়ে সাউথ ক্যারোলাইনা, এমনকি মিসিসিপির মতো নিজেদের শক্ত ঘাঁটি রক্ষায় ব্যয় করে।
হাকিম জেফ্রিস নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। তিনি প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা। হাকিম জেফ্রিস বলেন, ইরান যুদ্ধ দুই দলের মধ্যে পার্থক্যকে ‘অনেক বেশি স্পষ্ট’ করে তুলেছিল। তিনি ডেমোক্র্যাটদের নেতা এবং নতুন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন।
রিপাবলিকানরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ‘সাধারণ বুদ্ধি বনাম পাগলামি’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। তারা বামপন্থী ডেমোক্র্যাট সমাজতান্ত্রিকদের উত্থান নিয়ে বারবার আক্রমণ চালায়।
কিন্তু নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের জনমত জরিপকারীর করা শেষ জরিপে দেখা যায়, ‘মাগা’ (আমেরিকাকে আবার মহান করো) রিপাবলিকান পরিচয় এবং ডেমোক্র্যাট সমাজতন্ত্রী—দুটিই ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয়। তবে ভোটারদের কাছে ‘মাগা’ পরিচয়ের নেতিবাচক দিক বেশি ছিল।
যেসব রিপাবলিকান ভোটার ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন না, তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—কী করলে তাঁরা আবার দলকে ভোট দেবেন। তাঁদের সবচেয়ে বেশি বলা দুটি উত্তর ছিল, যুদ্ধ বন্ধ করা এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করা।
নির্বাচনের আগের শেষ বৈঠকে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে বুঝছিলেন, তবে তাঁদের কথায় ছিল ব্যঙ্গও। তাঁরা মিনেসোটায় গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ট্রাম্পের এক মিত্রের কথা বলেন। প্রাইমারিতে বড় ব্যবধানে হেরেও তিনি ভোট পুনর্গণনার দাবি করেছিলেন।
ব্লেয়ার ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘সব ঠিক আছে। আমরা মাইক লিনডেলের মতো করব। যত পয়েন্টেই হারি না কেন, ভোট পুনর্গণনার দাবি জানাব।’
‘মাগা ইনকরপোরেটেড’ সুপার পিএসির মুখপাত্র অ্যালেক্স ফাইফার বলেন, ‘দলটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ও পরিষ্কার ধারণা ছিল।’ এ কারণে তাঁরা প্রতিনিধি পরিষদের সেই নির্বাচনগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, যেখানে রিপাবলিকানরা এগিয়ে ছিল, মেইন, ফ্লোরিডা, টেনেসি, নিউইয়র্ক ও টেক্সাসে।
এক বিবৃতিতে অ্যালেক্স ফাইফার বলেন, ‘যাঁরা বানানো উক্তি ও মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছেন, তাঁরা শুধু প্রেসিডেন্টের দলের জন্য তাঁর ঐতিহাসিক ও উদার বিনিয়োগকে ছোট করছেন না, এই প্রচেষ্টায় কাজ করা অনেক মানুষের পরিশ্রমকেও অপমান করছেন। তাঁরা কাপুরুষ ও পরাজিত।’
একজন হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা এই প্রতিবেদনের বিষয়ে লিখিতভাবে মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যালটে ছিলেন না। প্রমাণিত হয়েছে, ট্রাম্প ব্যালটে থাকলে তাঁর ভোটাররা ভোট দিতে আসেন। প্রার্থীর যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালটে থাকা অনেক প্রার্থীর পক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের নিজেদের চেয়ে ভালো প্রচার করেছেন।
হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা আবারও বলেন, প্রেসিডেন্ট বুধবার সকালে স্বীকার করেছিলেন যে ইরান যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। তবে তিনি বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না।
প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট নেতা সিনেটর চাক শুমার সিনেট নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী খুঁজতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প এমন কয়েকটি পদক্ষেপ নেন, যাতে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঝুঁকিতে পড়ে।
আইওয়ার সিনেটর জোনি আর্নস্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে বিতর্কিত মনোনীত প্রার্থীদের বিরোধিতা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস ট্রাম্পের প্রধান কর ও ব্যয় বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর ট্রাম্পের মিত্ররা তাঁদের রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। দুজনই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে রিপাবলিকানদের হাতে থাকা দুটি আসনে নতুন প্রার্থী দাঁড় করাতে হয়। আসনগুলো ঝুঁকিতে পড়ে।
নর্থ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক লবিস্ট মাইকেল হোয়াটলির জন্য অন্য প্রার্থীদের সরিয়ে দেন। হোয়াটলি শক্তিশালী প্রার্থী হতে পারেননি। তিনি রাজ্যের জনপ্রিয় সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর রয় কুপারের কাছে হেরে যান।
সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জুলাইয়ে মারা যান। ট্রাম্প তাঁর বোন ডার্লিনকে সাময়িকভাবে আসনটি দেওয়ার এবং ছয় বছরের পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে দাঁড় করানোর পক্ষে ছিলেন। এতে অভিজ্ঞতা ও নির্বাচনী তহবিলের ভিত্তি নেই, এমন একজন প্রার্থীকে সামনে আনা হয়। তিনি এমন একটি রাজ্যে হেরে যান, যেখানে ১৯৯৮ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
তবে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রার্থী ছিলেন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল। ট্রাম্প রিপাবলিকান সিনেটর জন করনিনকে বাদ দিয়ে প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন। প্যাক্সটন আসনটি ঝুঁকিতে ফেলবেন—এমন সতর্কবার্তা এক বছর ধরে ছিল। তা উপেক্ষা করেন ট্রাম্প।
শেষ পর্যন্ত টেক্সাসে রিপাবলিকানদের প্রায় ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়। এই অর্থ অন্য রাজ্যের প্রার্থীদের সহায়তায় ব্যবহার করা যেত। প্যাক্সটন ১২ পয়েন্টে হেরে যান।
সাম্প্রতিক আরেকটি বৈঠকে ট্রাম্পের দল তাঁদের কয়েকজন প্রার্থীকে নিয়ে ঠাট্টা করে।
এক সপ্তাহ আগে ব্লেয়ার দলকে বলেছিলেন, ‘দেখুন, শত্রুকে চিনে ফেলেছি। শত্রু আমরা নিজেরাই।’
ফাব্রিজিও উত্তর দিয়েছিলেন, ‘অনেক জায়গায় তাই।’
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশল
২০২৫ সালের মে মাসে নিউইয়র্কের হাডসন ভ্যালির অভিজাত রিসোর্ট ওয়াইল্ডফ্লাওয়ার ফার্মসে যান ডেমোক্র্যাট দলের নেতা সিনেটের চাক শুমার। সেখানে দাতা ও দলীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠক হয়। সিনেটের নির্বাচনী লড়াই আরও বেশি রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে তিনি মরিয়া ছিলেন।
ওই বৈঠকে টেক্সাসের তরুণ রাজ্য আইনপ্রণেতা জেমস টালারিকো প্রচারে গল্প বলার গুরুত্ব নিয়ে পাঁচ মিনিটের একটি বক্তব্য দেন। শুমার তাঁর বক্তব্যে মুগ্ধ হন। পরে অন্তত দুজনকে বলেন, তিনি চান টালারিকো সিনেটে নির্বাচন করুন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের সব আসন ধরে রাখতে হতো। পাশাপাশি অন্তত চারটি আসন রিপাবলিকানদের কাছ থেকে জিততে হতো। এর মধ্যে এমন রাজ্যও ছিল, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন।
শুমার কয়েক মাস ধরে রয় কুপারকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেন। সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউনকে রাজি করাতে তিনি অন্তত তিনবার ওহাইও যান। ব্রাউন ২০২৪ সালে হেরেছিলেন, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার পরিচিতি তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ছিল।
শুমার ব্রাউনকে বলেছিলেন, ‘আপনি অবসরে গেলে আর আমরা যদি একটি ভোটের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাই, তাহলে আপনার অবসর ভালো কাটবে না।’ ব্রাউনের বয়স তখন ৭৩ বছর।
কুপার ও ব্রাউন, দুজনই নির্বাচনে দাঁড়ান এবং জেতেন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ২০২৪ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তিনটি আসন কম পেয়েছিলেন। তাই দলীয় নিয়োগকারীরা এমন এলাকায় প্রার্থী খুঁজতে শুরু করেন, যেখানে ট্রাম্প ১০ পয়েন্ট বা তার বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ক্ষমতা হাতে পেয়ে ট্রাম্প বাড়াবাড়ি করবেন।
২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী প্রার্থীদের নিয়ে হাউস মেজরিটি পিএসি ২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি বিশ্লেষণ করে। তাতে দেখা যায়, দুটি বিষয় প্রার্থীদের শক্তিশালী করেছিল—তাঁদের মধ্যপন্থী হিসেবে দেখা হতো এবং তাঁরা অর্থনীতির ওপর জোর দিতেন।
পিএসির সভাপতি মাইক স্মিথ বলেন, রিপাবলিকান–সমর্থিত এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে এমন প্রার্থী খুঁজতে হবে, যাঁদের দেখামাত্র ভোটারদের বিরক্তি তৈরি হয় না।
তাই দলটি ভিন্ন ধরনের পরিচয় ও অভিজ্ঞতার প্রার্থী খুঁজতে থাকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য, চিকিৎসক, কৃষক, দাবানল মোকাবিলায় কাজ করা একজন কর্মী এবং সংগীতশিল্পী। তাঁরা যেন পেশাদার রাজনীতিক বলে মনে না হন, সেটিও বিবেচনায় ছিল।
নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিয়ে লড়াই
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী লড়াইয়ের ক্ষেত্রটিই নতুন করে সাজাতে চাইছিলেন।
২০২৫ সালের বসন্তে ব্লেয়ার তখন ট্রাম্পের উপপ্রধান কর্মী ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে একটি পরিকল্পনা দেন। পরিকল্পনাটি ছিল ১০ বছরের মাঝপথে কংগ্রেসের নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদলে রিপাবলিকানদের আসন আরও নিরাপদ করা। টেক্সাসে এই উদ্যোগ শুরু হয়। পরে রিপাবলিকান শাসিত অন্য রাজ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
টেক্সাসের পরিকল্পনার কথা প্রথম শুনে হাকিম জেফ্রিস অবিশ্বাসের সঙ্গে উপদেষ্টাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই মজা করছেন।’ তিনি রাজ্য আইনপ্রণেতাদের অবস্থান নিতে উৎসাহ দিতে টেক্সাসে যান। আইনপ্রণয়নের প্রক্রিয়া ধীর করতে অনেক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা রাজ্য ছেড়ে চলে যান।
তবে ট্রাম্পের উদ্যোগ সফল হয়। রিপাবলিকানরা নিজেদের জন্য পাঁচটি নতুন আসন তৈরি করে। ২০২৪ সালে ওই পাঁচটি আসনে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতেছিলেন। রিপাবলিকানদের ধারণা ছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সমর্থন কিছুটা কমলেও এই আসনগুলো তাদের জিতিয়ে দেবে।
ডেমোক্র্যাটরাও পাল্টা উদ্যোগ নেয়। ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। এতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে থাকা পাঁচটি নতুন আসন তৈরির কথা ছিল। ভার্জিনিয়ার ভোটাররা আরও চারটি আসন তৈরির একটি মানচিত্র অনুমোদন করেন। তবে পরে রাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করে দেয়।
শুরু থেকেই ব্লেয়ার তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ও প্রেসিডেন্ট সেই রিপাবলিকানদের কথাও উড়িয়ে দেন, যাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, এই পরিকল্পনা উল্টো ফল দিতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের বিশ্বাস করার কারণ ছিল যে কয়েকটি ডেমোক্র্যাট–শাসিত রাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদলে তাঁরা রিপাবলিকানদের পরিকল্পনার প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
জেফ্রিস এক সংবাদ সম্মেলনে একটি পোস্টার দেখান। সেখানে ট্রাম্প ও ব্লেয়ারের মুখের সঙ্গে দ্য টাইমসের একটি প্রতিবেদনে ছাপা পরিচয়হীন এক ব্যক্তির বক্তব্য ছিল, ‘সব জায়গায়, সব সময় সর্বোচ্চ লড়াই।’
পোস্টারটি দেখে ব্লেয়ার জেফ্রিসের শীর্ষ সহকারী গিডিয়ন ব্রাগিনকে বার্তা পাঠান, ‘এটার একটা কপি কি আমার অফিসে পাঠাতে পারবেন?’
তবে পোস্টারটি প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সদর দপ্তরেই থেকে যায়। নির্বাচনের দিন রিপাবলিকানদের সুবিধার জন্য তৈরি করা অনেক আসনেও ডেমোক্র্যাটদের বড় জোয়ার বয়ে যায়।
নিজেদের ভুলে ক্ষতি
২০২৬ সালের শুরুতে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার করে ট্রাম্প প্রশাসন। মিনিয়াপলিসে অভিযান সহিংস হয়ে ওঠে। ফেডারেল কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হন। দুজনের মৃত্যুর ঘটনাই ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছিল।
ট্রাম্প উপদেষ্টাদের বলেছিলেন, ভিডিওগুলো তাঁর ভালো লাগেনি।
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস কয়েক মাস ধরে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে কড়া অভিবাসন নীতি থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। এই নীতির পক্ষে ছিলেন প্রেসিডেন্টের শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার।
মিনিয়াপলিসের ঘটনার কিছুদিন পর ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা যায়, অভিবাসন বিষয়ে দলটি প্রথমবারের মতো এগিয়ে গেছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলবিদদের একজনের মতে, যে বিষয়টি আগে ট্রাম্পের শক্তির জায়গা ছিল, একসময় সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় গুলির ঘটনার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান।
শুরুতে ব্লেয়ারও তাঁর বসের মতোই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে বলে আশাবাদী ছিলেন। সংশয়ী সহকর্মীদের তিনি আশ্বস্ত করেন, যুদ্ধ রাজনৈতিক বিপর্যয় হবে না। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসকে বলেছিলেন, সংঘাত দ্রুত শেষ হবে।
কিন্তু চার থেকে ছয় সপ্তাহের যে সময়সীমা বলা হয়েছিল, তা কয়েক মাসে গড়ায়।
প্রকাশ্যে ট্রাম্প সামরিক বিজয়কে বড় করে তুলে ধরেন। ব্যক্তিগত বৈঠকে উপদেষ্টারা তাঁকে জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে, গ্যাস ও সারের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার দ্রুত কমে যাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর মার্চ মাসে ফাব্রিজিওর পরিচালিত দলীয় আলোচনা থেকে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট কেন যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা ভোটাররা বুঝতে পারছিলেন না। তাঁরা এটিকে ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছিলেন। তাঁদের মতে, যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছিল।
যুদ্ধবিরোধী ডানপন্থী সাবেক মিত্রদের মধ্যে টাকার কার্লসন এবং জর্জিয়ার সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের বিরোধিতা শুরু করেন।
উপদেষ্টাদের মতে, যুদ্ধের কারণে তাঁর সমর্থন কমছিল, ট্রাম্প তা জানতেন। তবে অল্প সময়ের জন্য মনে হয়েছিল, তিনি এই বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ পেয়েছেন। জুনের মাঝামাঝি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করেন। এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
ফাব্রিজিও ওই প্রস্তাব নিয়ে প্রথম জরিপ করেন। এতে দেখা যায়, চুক্তির বিষয়ে যাঁরা জানতেন, তাঁদের মধ্যে ৪১ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে সমর্থন ছিল। ৬৭ শতাংশ মনে করতেন, এই চুক্তিতে গ্যাসের দাম কমবে।
কিন্তু টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজসহ রিপাবলিকানদের ইরানবিষয়ক কট্টরপন্থীরা ট্রাম্পকে তেহরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে বলেন। চুক্তি ভেঙে যায়, যুদ্ধও চলতে থাকে।
‘আমার টাকা’
২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও ট্রাম্প অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করেননি। তিনি প্রায় ৪০ কোটি ডলারের তহবিল গড়ে তোলেন। উপদেষ্টাদের কাছে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, এই অর্থকে তিনি ‘আমার টাকা’ হিসেবে দেখেন।
নির্বাচনের ১০০ দিনের কম বাকি থাকতে আগস্টে রিপাবলিকান সিনেটের কৌশলবিদেরা বুঝতে পারছিলেন না, ট্রাম্পের দল কোথায় অর্থ খরচ করবে। তাঁদের একজন বলেন, দলটি কতটা অপ্রস্তুত ছিল, তা দেখে তিনি ‘হতবাক’ হয়েছিলেন।
ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা বলেন, পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু প্রেসিডেন্ট অনুমোদন না দেওয়ায় তা জানানো যাচ্ছিল না।
কোনো কোনো দিন ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে উপদেষ্টাদের বলতেন, ‘আমাদের জিততেই হবে। যা করতে হয়, করো।’ আবার কোনো দিন তাঁকে বিষয়টি নিয়ে উদাসীন মনে হতো। তিনি সহকারীদের বলেছিলেন, ‘তারা আমাকে ছাড়া জিততে পারে না, এটা আমার সম্পর্কে খুব ভালো কথা বলে।’
ব্লেয়ার ও অন্যদের প্রেসিডেন্টকে অর্থ খরচে সম্মতি দিতে রাজি করাতে হয়েছিল। গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প অনুমোদন দেননি।
এই দেরির কারণে অর্থের ক্ষতি হয়। নির্বাচন যত কাছে আসে, বিজ্ঞাপনের দাম তত বাড়ে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি এক সপ্তাহে অ্যাঙ্করেজের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ট্রাম্পের সুপার পিএসি ডেমোক্র্যাটদের প্রধান সুপার পিএসির তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। অথচ তাঁদের বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ কম। কারণ, তারা আগেভাগে প্রচারের সময় বুক করেনি।
ডেমোক্র্যাটদের দল স্থানীয় সন্ধ্যার সংবাদে একটি বিজ্ঞাপনের জন্য ২ হাজার ৭০০ ডলার দেয়। ট্রাম্পের সুপার পিএসি একই সময়ে বিজ্ঞাপন দিতে ৩০ হাজার ডলার দেয়।
সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ঝুঁকিতে থাকা আইনপ্রণেতারা দূরে থাকেন। ট্রাম্পের দল উল্টোটি করতে চেয়েছিল।
ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সহব্যবস্থাপক ক্রিস লা সিভিটা বলেন, ‘আমরা পুরোনো ধারণাটাকে উল্টে দিয়েছি।’
এভাবেই আধুনিক সময়ের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনের আয়োজন হয়। সেপ্টেম্বরে ডালাসে দুই দিন ধরে প্রেসিডেন্টকে ঘিরে এই আয়োজন চলে। দলের অনেক সদস্যই এটি চাননি।
সম্মেলনে ট্রাম্প প্রস্তাব দেন, রিপাবলিকানরা জিতলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়া হবে।
প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার এবং সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা, প্রায় কেউই এ প্রস্তাবের কথা জানতেন না।
প্রস্তাবটি নিয়ে জনমত জরিপও করা হয়নি। একই ধরনের একটি প্রস্তাব পরীক্ষা করে ট্রাম্পের দল দেখেছিল, এতে ভোটারদের রিপাবলিকানদের দিকে আনার তেমন প্রভাব পড়ে না। প্রেসিডেন্টের কয়েকজন উপদেষ্টা এ প্রস্তাবে অস্বস্তি বোধ করেন। তাঁদের একজন একে ভোটারদের ‘ঘুষ’ দেওয়ার প্রকাশ্য চেষ্টা বলে বর্ণনা করেন।
সম্মেলনে একটি ভালো খবরও আসে, ‘অর্থ’। প্রথম দিন ইলন মাস্ক সিনেট লিডারশিপ ফান্ডকে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনের মিত্রদের পরিচালিত এই সুপার পিএসি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সহায়তা করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এককালীন সবচেয়ে বড় অনুদানগুলোর একটি ছিল এটি।
সম্মেলনে প্যাক্সটন ওই তহবিলের কক্ষে যান। সুপার পিএসির নির্বাহী পরিচালক অ্যালেক্স ল্যাচাম তাঁকে কিছুটা রহস্য করে বলেন, ‘আগামীকাল আপনি খুশি হবেন।’
এরপরই বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হওয়ার কথা ছিল।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সহায়তায় মাস্ক ৪৫ কোটির বেশি ডলার ব্যয় করেন। এর বড় অংশ টেক্সাসে প্যাক্সটনকে জেতাতে খরচ হয়। মাস্কের অর্থে পরিচালিত সুপার পিএসি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টালারিকোর বিরুদ্ধে কয়েক কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন দেয়। বিজ্ঞাপনে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নিয়ে টালারিকোর অবস্থানকে আক্রমণ করা হয়। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের দলও একই ধরনের প্রচার চালিয়েছিল।
অন্য রাজ্যগুলোতে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়ে সিনেট লিডারশিপ ফান্ডের কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ট্রাম্পের দল মনে করত, ২০২৬ সালের নির্বাচন মূলত অর্থনীতি নিয়ে। তাই অন্য বিষয় নিয়ে বিজ্ঞাপন দিলে তেমন কাজ হবে না। তবে কিছু রাজ্যে অর্থনীতি নিয়ে বিজ্ঞাপনও ভোটারদের কাছে তেমন কার্যকর হচ্ছিল না বলে রিপাবলিকান সিনেটের কৌশলবিদেরা মনে করতেন।
দলের নেতারাও সিনেট রক্ষার প্রচেষ্টায় একসঙ্গে কাজ করতে পারছিলেন না। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান সিনেট নেতাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। তাঁদের মধ্যে জন থুনও ছিলেন। সিনেট নেতাদের আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন। ২০২৬ সালের মার্চে ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা রিপাবলিকানদের শীর্ষ সুপার পিএসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিকল্পনা করতে বসেন। সেখানে ন্যাশনাল রিপাবলিকান সিনেটোরিয়াল কমিটির কেউ আমন্ত্রণ পাননি।
ভরাডুবি
আগস্টের শেষ দিকে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেশনাল প্রচারের প্রধান কৌশলবিদ জুলি মার্জ তাঁর দলকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। তিনি একটি স্লাইড দেখান। তাতে ‘ডেমোক্র্যাটদের বড় জোয়ার’ আসার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়েছিল।
জুলি মার্জ বলেছিলেন, ‘আমাদের কাজ হলো যত বেশি সম্ভব মানুষকে ঢেউয়ে চড়ার বোর্ড দেওয়া।’
দলটি নিজেদের ঝুঁকিতে থাকা বর্তমান সদস্যদের একটি অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেয়। তাঁদের রক্ষায় কোটি কোটি ডলার খরচ না করে দল সেই অর্থ রিপাবলিকান–সমর্থিত আরও গভীর এলাকায় খরচ করবে। পরে জরিপ করে দেখা হবে, নিজেদের আসনে তাঁদের অর্থের প্রয়োজন আছে কি না। বেশির ভাগ সদস্য এতে রাজি হন। এতে নির্বাচনী লড়াই আরও এলাকায় ছড়িয়ে দিতে প্রায় এক কোটি ডলার পাওয়া যায়।
ডালাসে রিপাবলিকান সম্মেলনের কিছুদিন পর ডিজেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে অক্টোবরের শুরুর দিকে তারা সাউথ ডাকোটা ও আইডাহোর মতো রাজ্যেও জনমত জরিপ করায়। এর আগে এসব রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা কল্পনাও করা হয়নি।
নির্বাচনের এক মাস আগে সিনেট লিডারশিপ ফান্ড নর্থ ক্যারোলাইনায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়। এরপর অর্থ সরিয়ে কানসাসে নেয়। পরে সাউথ ক্যারোলাইনা এবং শেষে মিসিসিপিতে নেয়। দুই বছর আগে ট্রাম্প মিসিসিপিতে প্রায় ২৩ পয়েন্টে জিতেছিলেন।
ট্রাম্পের উপদেষ্টারা বৈঠকে ব্যঙ্গ করে রাজ্যটিকে বলতেন, ‘দোদুল্যমান মিসিসিপি।’
প্রতিনিধি পরিষদে পরিস্থিতি সম্ভবত আরও খারাপ ছিল।
একসময় কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ড এবং ট্রাম্পের সুপার পিএসির শীর্ষ কর্মকর্তারা টেক্সাসের দক্ষিণাঞ্চলের হেনরি কুয়েলারের আসনটি জেতার চেষ্টা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, বিজ্ঞাপন বন্ধ হওয়ার দিনই স্পিকার মাইক জনসন ওই এলাকায় যাওয়ার কথা। জনসনকে বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচাতে তাঁরা বিজ্ঞাপন বন্ধের ঘোষণা এক দিন পিছিয়ে দেন। কুয়েলার বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার চিত্র এতটাই বাঁ দিকে সরে যায় যে ১০০টির বেশি আসনে জরিপ করেও প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকানরা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। ডেমোক্র্যাটদের কয়েকজন নেতাও এতে অবাক হন।
নির্বাচনের আগে সেপ্টেম্বরে এক নৈশভোজে ২০০৬ সালের নির্বাচনী জোয়ারের সময় প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটদের প্রচারের দায়িত্বে থাকা রাহম এমানুয়েল দলের নতুন প্রার্থীদের জিজ্ঞাসা করেন, তাঁদের এলাকায় ট্রাম্প কত পয়েন্টে জিতেছিলেন।
কেন্টাকির ষষ্ঠ কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে নির্বাচন করা সাবেক সেনাসদস্য ও সাবেক ফেডারেল কৌঁসুলি জ্যাক ডেম্বো বলেন, ট্রাম্প ১৫ পয়েন্টে জিতেছিলেন। এমানুয়েল অবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর দিকে তাকান।
ডেম্বো জিতেছিলেন।
নির্বাচনের আগের শেষ রোববার জেফ্রিস একটি প্রতীকী নির্বাচনী এলাকা সফর করেন।
জেফ্রিস আলাবামায় যান। সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে ভোটাধিকার আইনের ক্ষমতা কমে যাওয়ার পর রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি শোমারি ফিগার্সের এলাকার সীমানা এমনভাবে বদলেছিলেন, যাতে তাঁদের জয়ের সুবিধা হয়।
জেফ্রিস বলেন, সেখানে যাওয়া জরুরি ছিল। কারণ, ‘আফ্রিকান আমেরিকানদের আবার জিম ক্রোর মতো কৌশলের মুখে ফেলার চেষ্টা চলছিল।’
জেফ্রিস বলেন, ‘আমার মনে হয়, শোমারি ও আমি দুজনেই ইতিহাসের ভার অনুভব করছিলাম। ড. কিং, রোজা পার্কসসহ অনেকের নেতৃত্বে নাগরিক অধিকার আন্দোলন যে জায়গায় শুরু হয়েছিল, সেখানেই আমরা ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রচার শেষ করছিলাম।’
মঙ্গলবার ফিগার্স নিজের আসনে জয়ী হন।
বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে জেফ্রিস ‘ফ্রিডম মনুমেন্ট স্কাল্পচার পার্কে’ থামেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্বে থাকা মানুষের ইতিহাস স্মরণ করা হয়েছে। তাঁর এই যাত্রাবিরতির কথা আগে জানানো হয়নি।
জানুয়ারিতে জেফ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে যাচ্ছেন।
সূত্র: প্রথম আলো