গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪৪ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০১ জানুয়ারি, ১৯৭০, ০৬:০০ এএম

রিজিকের ফয়সালা হয় আসমানে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
রিজিকের ফয়সালা হয় আসমানে

দুনিয়ায় মানুষের দুশ্চিন্তার বড় একটা কারণ রিজিক ও জীবিকা। সংসারের ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, ঋণের বোঝা কিংবা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—এসব ভাবনা অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কারও উপার্জন আছে, কিন্তু তা দিয়ে প্রয়োজন মেটে না; কেউ উপার্জনের পথ খুঁজে পায় না; আবার কেউ ভবিষ্যতে কী হবে সেই আশঙ্কায় বর্তমানের স্বস্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। তবে একজন মুমিনের বিশ্বাস, রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের ব্যবস্থা করেন। তাই রিজিকের জন্য চেষ্টা করা যেমন জরুরি, তেমনি রিজিকের দুশ্চিন্তায় ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাও ঈমানের দাবি। তবে তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং বৈধ উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।

রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬)। এই আয়াত মুমিনের মনে আশার আলো জ্বালায়। মানুষ অনেক সময় নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যৎ হিসাব করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম, তার ক্ষমতা সর্বব্যাপী। আজ যে দরজা বন্ধ মনে হচ্ছে, আগামীকাল সেখান থেকেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যে সমস্যার কোনো সমাধান চোখে পড়ছে না, আল্লাহ চাইলে সেখান থেকেও উত্তরণের পথ খুলে দিতে পারেন। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিকের ব্যবস্থা থাকার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক মানুষ তার চাওয়া অনুযায়ী, চাওয়ার সময়েই সবকিছু পেয়ে যাবে। কারও রিজিক প্রশস্ত হয়, কারও জীবনে সীমাবদ্ধতা থাকে। কখনো প্রাচুর্য আসে, কখনো অভাবের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা হয়। মুমিনের কর্তব্য হলো, সচ্ছলতায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, সংকটে ধৈর্যধারণ করা এবং সর্বাবস্থায় মহান রবের প্রতি সুধারণা বজায় রাখা।

রিজিক নিয়ে আলোচনায় একটি ভুল ধারণা কখনো কখনো দেখা যায়, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে জীবিকার জন্য আলাদা করে চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। অথচ ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি বৈধ উপায় অবলম্বন করাও জরুরি। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তা হলে তিনি তোমাদের পাখিদের মতো রিজিক দিতেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)। লক্ষ্য করার বিষয়, পাখিরা বাসায় বসে খাবারের অপেক্ষা করে না; বরং খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। তাদের রিজকের ব্যবস্থা আল্লাহ করেন, কিন্তু সেই ব্যবস্থার জন্য তাদেরও চেষ্টা করতে হয়। এ হাদিস আমাদের শেখায়, তাওয়াক্কুল ও কর্মপ্রচেষ্টা পরস্পরের পরিপূরক। তাই চাকরি না থাকলে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা, ব্যবসায় ক্ষতি হলে কারণ বিশ্লেষণ করে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া, উপার্জন কম হলে দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে পেশা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে, আবার সেই সাহায্য লাভের উপায় হিসেবে নিজের সাধ্যের মধ্যে কাজও করতে হবে।

ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান নষ্ট করা উচিত নয়। অনেক মানুষ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে এত বেশি চিন্তা করেন যে, বর্তমানের দায়িত্বগুলোও ঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। আজকের উপার্জন আগামী দিনের জন্য যথেষ্ট হবে কি না, সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে, বার্ধক্যে কে দেখবে—এমন অসংখ্য ভাবনা মনে ভিড় করে। ফলে মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হয়, পরিবারকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি ইবাদতেও মনোযোগ কমে যায়। অথচ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিকল্পনা করা আর ভবিষ্যতের আশঙ্কায় নিজেকে বিপর্যস্ত করে ফেলা এক বিষয় নয়। একজন সচেতন মানুষ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করবেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করবেন, পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখবেন এবং বিপদের প্রস্তুতি নেবেন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)। এ আয়াত তাকওয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাকওয়াবান ব্যক্তির জীবনে কখনো অভাব বা বিপদ আসবে না; বরং সংকটের মধ্যেও আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং তার ওপর নির্ভরশীল থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

হালাল রিজিকের গুরুত্ব: রিজিকের দুশ্চিন্তা কখনো কখনো মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দেয়। কেউ প্রতারণার আশ্রয় নেয়, কেউ অন্যের অধিকার নষ্ট করে, কেউ সুদ-ঘুষ কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক সংকট কাটাতে চায়। কিন্তু সাময়িক লাভের আশায় হারাম উপার্জনের পথ বেছে নেওয়া প্রকৃত সমাধান নয়। এতে দুনিয়ার ক্ষতির পাশাপাশি আখেরাতের জবাবদিহির ঝুঁকিও তৈরি হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৮)। উপার্জন কম হলেও তা যদি হালাল হয়, তবে তাতেই বরকতের আশা করা যায়। আর উপার্জন বেশি হলেই যে জীবনে শান্তি থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মুমিনের লক্ষ্য শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং উপার্জনকে হালাল রাখা, অন্যের অধিকার সংরক্ষণ করা এবং নিজের সম্পদকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা। দুশ্চিন্তা কমাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ: রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা কমাতে কয়েকটি বাস্তব উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে। প্রথমত, আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো। দ্বিতীয়ত, ঋণ থাকলে তা পরিশোধের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা। তৃতীয়ত, নিজের দক্ষতা বাড়ানো ও বৈধ উপার্জনের নতুন সুযোগ খোঁজা। চতুর্থত, সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় করা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আর্থিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। এর পাশাপাশি নিয়মিত নামাজ, দোয়া, ইশতেগফার ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখা জরুরি। দোয়া মুমিনের অন্তরে আশা জাগায়, আর ইবাদত তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের সবকিছু তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ যদি স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, তা হলে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা কিংবা প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।

রিজিকের জন্য চিন্তা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু সেই চিন্তা যেন আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস, হতাশা কিংবা অন্যায় উপার্জনের কারণ না হয়। একজন মুমিন জানেন, চেষ্টা করা তার দায়িত্ব, আর ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই ব্যর্থ হলে তিনি নতুনভাবে চেষ্টা করেন, সংকটে ধৈর্য ধরেন এবং সাফল্য পেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জীবনে কখনো প্রয়োজনের তুলনায় উপার্জন কম হতে পারে, কখনো প্রত্যাশিত সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। তবু মনে রাখতে হবে, মানুষের মর্যাদা কেবল তার সম্পদের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সততা, পরিশ্রম, আত্মমর্যাদা, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সুতরাং রিজিকের দুশ্চিন্তায় নিজেকে নিঃশেষ না করে হালাল উপার্জনের চেষ্টা, পরিমিত জীবনযাপন, দোয়া ও তাওয়াক্কুলের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা রেখে সামনে এগিয়ে চলতে হবে। কারণ প্রকৃত প্রশান্তি শুধু সম্পদ অর্জনে নয়; বরং প্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞ থাকা, অপ্রাপ্তিতে ধৈর্যধারণ করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখার মধ্যেই নিহিত।

আলেম ও প্রাবন্ধিক

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।