একসময় চারপাশে ছিল ফসলের মাঠ। সেই মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠো পথ। পথের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক বটগাছ। ক্লান্ত পথচারীরা গাছটির ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। আশপাশের গ্রামের কিশোর-তরুণেরা সেখানে বসে আড্ডা দিতেন, খেলাধুলা করতেন।
সেই মেঠো পথ একসময় ইট বিছানো সড়কে পরিণত হয়। চলাচল শুরু হয় বাস, রিকশা ও ভ্যানের। কিন্তু একই এলাকায় কাছাকাছি দূরত্বে দুটি কোটাপাড়া থাকায় পথচারী ও যানবাহনের চালকদের বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো। সেই বিভ্রান্তি দূর করতে একটি কোটাপাড়ার নামকরণ করা হয় ‘প্রেমতলা’। শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়ার একটি অংশে এই ‘প্রেমতলা’র অবস্থান।
৩৬ বছরের ব্যবধানে সেই নির্জন পথের দুই পাশের ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। এখন প্রেমতলা শরীয়তপুর পৌরসভার অন্যতম জনবহুল ও ব্যস্ততম এলাকা। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণে মুখর থাকে এখানকার বাসস্ট্যান্ড ও বাজার। ঢাকা-শরীয়তপুর, নড়িয়া-শরীয়তপুর এবং শরীয়তপুর থেকে ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলো এসে মিলেছে এ এলাকায়। গড়ে উঠেছে বিসিক শিল্পনগরী ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রেমতলা। তবে প্রেমতলা নামকরণের গল্পে জড়িয়ে আছে কয়েকজন কিশোর-তরুণের আড্ডা, একটি বটগাছ এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি। একসময় এলাকাটি কোটাপাড়া নামে পরিচিত ছিল। এর প্রায় ৭৫০ মিটার পশ্চিমে কীর্তিনাশা নদীর তীরঘেঁষা আরেকটি কোটাপাড়া গ্রাম রয়েছে। কাছাকাছি দুটি স্থানের একই নাম থাকায় পথচারী ও যানবাহনের চালকদের সমস্যায় পড়তে হতো। কোটাপাড়া ও বাঘিয়া এলাকার কিশোর-তরুণেরা নিয়মিত আড্ডা দিতেন এলাকার একটি বটগাছের নিচে। সেখানেই একদিন আলোচনা ওঠে, দুটি কোটাপাড়ার নামের কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি কীভাবে দূর করা যায়। আলোচনার এক পর্যায়ে একটি কোটাপাড়ার নতুন নাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে এক বিকেলে আড্ডায় স্থানীয় ব্যক্তি মকবুল চৌকিদার প্রস্তাব করেন, জায়গাটির নাম হোক প্রেমতলা। অন্যরা তাতে সম্মতি দেন। পরদিন কয়েকজন কিশোর-তরুণ মিলে ‘প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড’ লেখা একটি টিনের সাইনবোর্ড বটগাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেন। সেই থেকে এলাকাটি প্রেমতলা নামে পরিচিতি পায়।
মকবুল চৌকিদার এখন প্রেমতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রেমতলা এখন শহরের অংশ। কিন্তু ৩৬ বছর আগে এটি ছিল অজপাড়াগাঁয়ের ফসলি মাঠের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি মেঠো পথ। আমাদের কয়েকজনের দেওয়া নামটি একদিন জনবহুল একটি এলাকার নাম হয়ে যাবে, তা বুঝতে পারিনি।’

শরীয়তপুর একসময় ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালের মার্চে শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়তপুর পৌরসভা। ১৯৮৮ সালের বন্যায় জেলা শহর থেকে বাঘিয়া এলাকার দিকে যাওয়া মেঠো পথটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পথটি সংস্কার করে ইট বিছানো হয়। সড়ক সংস্কারে পর ওই পথে বাস, রিকশা ও ভ্যান চলাচল শুরু করে। ১৯৮৯ সালে শরীয়তপুর জেলায় প্রথম বাস চলাচল শুরু হয়। সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাট থেকে প্রেমতলা হয়ে নড়িয়া উপজেলার বাঁশতলা পর্যন্ত ছিল সেই বাসের রুট। দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। ওই সময় প্রেমতলা হয়ে বাস চালাতেন সবুজ ভূঁইয়া। গত ২৭ অক্টোবর এক বন্ধুকে নিয়ে এলাকায় এসে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করেন তিনি। প্রথম আলোকে সবুজ ভূঁইয়া বলেন, ‘১০ বছর হলো বাস চালানো ছেড়েছি। আমি যখন বাস চলাতাম, তখন রাস্তার পাশে বড় বটগাছ ছিল। সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হতো। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। ফসলি জমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সেই সড়কের চেহারা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।’
ফসলি জমি থেকে ব্যবসাকেন্দ্র
১৯৯০ সালে প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড চালুর সময় সেখানে ছিল মাত্র দুটি চায়ের দোকান। সময়ের সঙ্গে বাসের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে মানুষের চলাচল। গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রেমতলা বাজারে প্রায় ১২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি বিসিক শিল্পনগরীতে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০টি বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা।
প্রেমতলায় ২০ বছর ধরে চা ও কনফেকশনারির দোকান চালান ৭০ বছর বয়সী আবদুর রব হাওলাদার। একসময় যে জমিতে চাষাবাদ করতেন, সেখানেই এখন তাঁর ব্যবসা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘৩৬ বছর আগে এই এলাকায় রাস্তার দুই পাশে ছিল ফসলি জমি। আমরা জমিতে চাষাবাদ করতাম। কৃষিপণ্য বাসে করে বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে যেতাম। পরে কৃষিকাজ ছেড়ে এখানে দোকান দিয়েছি। গত ৩৬ বছরে এলাকাটির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।’
নেই সেই বটগাছ, আছে শুধু স্মৃতি
যে বটগাছের নিচে বসে প্রেমতলার নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই গাছ এখন আর নেই। প্রায় ১০ বছর আগে গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। প্রেমতলার পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পলাশ চন্দ্র রায়। কথা বলতে বলতে তিনি ফিরে যান ৩৬ বছর আগের দিনগুলোতে। তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ফসলি জমির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া মেঠো পথ, বটগাছের ছায়া আর দখিনা বাতাসের কথা। তিনি আজও মাঝেমধ্যে এখানে আসেন, বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় বসেন।
সময়ের সঙ্গে প্রেমতলা বদলেছে। বেড়েছে যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের ভিড়। ইট-পাথরের অবকাঠামো আর যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে সেই নির্জন প্রান্তর। তবে কয়েকজন কিশোর-তরুণের আড্ডা থেকে জন্ম নেওয়া নামটি রয়ে গেছে। প্রেমতলার ব্যস্ততম বর্তমানের আড়ালে আজও বেঁচে আছে একটি বটগাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা ৩৬ বছর আগের গল্প।
সূত্র: প্রথম আলো