গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:০০ এএম

ব্ল্যাকহোল কি সত্যিই দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ব্ল্যাকহোল কি সত্যিই দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরকে অনেকেই মহাকাশের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রহস্যময় বস্তু হিসেবে বিবেচনা করেন। পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, এই দানবগুলোর মহাকর্ষ শক্তি এতটাই মারাত্মক যে এর কাছাকাছি গেলে স্বয়ং আলোও আর ফিরে আসতে পারে না। মহাবিশ্বের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা শুধু দেখে এসেছেন, দুটি ব্ল্যাকহোল একে অপরের সঙ্গে প্রবল বেগে ধাক্কা খেয়ে মিলেমিশে আরও বড় এক দানবে পরিণত হয়। এই প্রলয়ংকরী সংঘর্ষের ফলে মহাকাশে এমন এক ভয়ংকর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো স্থান-কালকেই কাঁপিয়ে দেয়। এর টান থেকে কোনো কিছুই পালাতে পারে না। এমন ভয়ংকর ব্ল্যাকহোলকে কোনো শক্তি কি মাঝখান থেকে ভেঙে দুই টুকরো করে ফেলতে পারে? ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী বলছে, হ্যাঁ পারে।

ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ নেপলস ফেদেরিকো টু-এর গবেষক ফ্রান্সেসকো সান্নিনো এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ডেনমার্কের কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি সেন্টারের একদল মেধাবী বিজ্ঞানী মিলে এক অবিশ্বাস্য হিসাব কষেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিস্থিতি যদি একেবারে নিখুঁত হয়, তবে একটি আস্ত ব্ল্যাকহোল সত্যি সত্যিই মাঝখান থেকে ভেঙে দুটি আলাদা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে! শুনতে পাগলাটে মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছেন, মহাবিশ্বে এমন ঘটনা ঘটা আক্ষরিক অর্থেই সম্ভব।

ব্ল্যাকহোল কি হোয়াইট হোলে পরিণত হতে পারে
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিস্থিতি যদি একেবারে নিখুঁত হয়, তবে একটি আস্ত ব্ল্যাকহোল সত্যি সত্যিই মাঝখান থেকে ভেঙে দুটি আলাদা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে!

এখন আপনার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, একটি ব্ল্যাকহোল ভাঙলে দেখতে ঠিক কেমন হবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাঙার এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে হবে অদ্ভুত রকমের মজার। ব্ল্যাকহোলের চারপাশের যে অদৃশ্য সীমানা থেকে কোনো কিছু ফিরে আসতে পারে না, তাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত। যখন একটি ব্ল্যাকহোল ভাঙতে শুরু করবে, তখন এই ইভেন্ট হরাইজনটি মাঝখান থেকে প্রসারিত হয়ে ঠিক একটি প্যান্ট বা ট্রাউজারের আকৃতি ধারণ করবে! প্যান্টের ওপরের অংশটি হলো মূল ব্ল্যাকহোল, আর নিচের দুটি পা হলো নতুন জন্ম নেওয়া দুটি আলাদা ব্ল্যাকহোল। এই অদ্ভুত জ্যামিতিক রূপের কারণে গবেষকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘পেয়ার-অফ-প্যান্টস টপোলজি’।

তবে এই ভাঙন প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ নয়। গবেষক সান্নিনো পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, ভেঙে তৈরি হওয়া নতুন ব্ল্যাকহোল দুটিকে অবশ্যই ছিটকে দূরে সরে যেতে হবে। যদি তারা কাছাকাছি থাকে, তবে তাদের ভয়ংকর মহাকর্ষের টানে তারা মুহূর্তের মধ্যে আবারও একে অপরের সঙ্গে মিলে যাবে। আর এখানেই সমীকরণটি সবচেয়ে জটিল হয়ে দাঁড়ায়। একটি ব্ল্যাকহোলকে ভেঙে দূরে সরে যাওয়ার এই অতি ক্ষুদ্র সুযোগটি কেবল তখনই তৈরি হয়, যখন মূল ব্ল্যাকহোলটি তার সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গতিতে বা তার কাছাকাছি কোনো বেগে লাটিমের মতো ভয়ংকরভাবে ঘুরতে থাকে!

ডার্ক ম্যাটার কি অন্য মহাবিশ্ব থেকে আসা ব্ল্যাকহোল
ব্ল্যাকহোলের চারপাশের যে অদৃশ্য সীমানা থেকে কোনো কিছু ফিরে আসতে পারে না, তাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত।

বিজ্ঞানের খাতায় এই ভাঙনের পথে সবচেয়ে বড় ভিলেনের নাম হলো এন্ট্রপি। এন্ট্রপি মানে বিশৃঙ্খলা। পদার্থবিজ্ঞানের তাপগতিবিদ্যার নিয়ম হলো, মহাবিশ্বের সবকিছুই ধীরে ধীরে আরও বেশি বিশৃঙ্খলার দিকে এগোয়। যেমন ধরুন, একটি আস্ত কাঁচের গ্লাস ভেঙে টুকরো টুকরো হলে তার এন্ট্রপি বা বিশৃঙ্খলা বাড়ে। কিন্তু একটি সাধারণ, স্থির ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে হিসাবটা পুরো উল্টো! একটি স্থির ব্ল্যাকহোল ভেঙে দুটি ছোট ব্ল্যাকহোল তৈরি হলে তাদের মোট এন্ট্রপি উল্টো কমে যায়। থার্মোডাইনামিক্সের কড়া নিয়মে এন্ট্রপি কমানো আক্ষরিক অর্থেই একটি অসম্ভব কাজ।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা বদলে যায় যদি ব্ল্যাকহোলটি স্থির না থেকে ভয়ংকর বেগে ঘুরতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রচণ্ড দ্রুতবেগে ঘুরতে থাকা একটি ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে তার ভর, ঘূর্ণনের কৌণিক ভরবেগ এবং এন্ট্রপির মধ্যকার চিরাচরিত সম্পর্কটি পুরোপুরি বদলে যায়। ঘূর্ণনের এই ভয়ানক শক্তির কারণেই ব্ল্যাকহোলটি ভাঙনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তবে শর্ত একটাই, ভেঙে যাওয়া নতুন যমজ ব্ল্যাকহোল দুটিকেও আগেরটার মতোই গতিতে ঘুরতে হবে এবং দ্রুত একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে হবে।

আপনার শরীরের ভেতর দিয়ে যদি একটা ব্ল্যাকহোল চলে যায়!
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রচণ্ড দ্রুতবেগে ঘুরতে থাকা একটি ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে তার ভর, ঘূর্ণনের কৌণিক ভরবেগ এবং এন্ট্রপির মধ্যকার চিরাচরিত সম্পর্কটি পুরোপুরি বদলে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, এমন অদ্ভুত ঘটনা কি আসলেই মহাকাশে ঘটছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বড় বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা বিশাল দানবীয় ব্ল্যাকহোলগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম। তবে বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ঠিক পরপরই যে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অথচ ভয়ানক ঘন ‘প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাকহোল’ তৈরি হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই ভাঙনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের বাইরে গিয়ে মহাকর্ষ ঠিক কীভাবে কাজ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই ঘটনার প্রকৃত সম্ভাবনা। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, নাসার ফার্মি-ল্যাটের মতো শক্তিশালী গামা-রশ্মি টেলিস্কোপগুলো হয়তো একদিন মহাকাশের গভীর থেকে এই ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোলগুলোর আলাদা হয়ে যাওয়ার কোনো সূক্ষ্ম সংকেত আমাদের কাছে বয়ে আনবে।

সূত্র: ইউনিভার্স টুডে ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্ক

অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরছে আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোল

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।