গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

আলট্রাসনোগ্রামে দেখা গেল যমজ সন্তান, সিজারের পর দেওয়া হলো একটি

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
আলট্রাসনোগ্রামে দেখা গেল যমজ সন্তান, সিজারের পর দেওয়া হলো একটি

নওগাঁর বদলগাছীর শান্তনা আক্তার ও শান্ত ইসলাম দম্পতির কাছে দুবারের আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, গর্ভে রয়েছে যমজ সন্তান। সেই প্রত্যাশা নিয়েই বৃহস্পতিবার নওগাঁর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শান্তনা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি কন্যাশিশু। অপর সন্তানটির কী হয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে শুরু হয় উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সমঝোতার চেষ্টা। একপর্যায়ে বিষয়টি গড়ায় থানায়।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে নওগাঁ শহরের বলাকা ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, অপর নবজাতকের সন্ধান চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে আর্থিক প্রস্তাব দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

ভুক্তভোগী শান্ত ইসলামের দাবি, গত ১২ ও ২১ অক্টোবর পৃথক দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রামের উভয় প্রতিবেদনেই তার স্ত্রীর গর্ভে দুটি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতির কথা উল্লেখ ছিল। প্রথমে জয়পুরহাটের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হয়। পরে নওগাঁ শহরের রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও আলট্রাসনোগ্রাম করানো হলে সেখানেও যমজ সন্তানের কথা জানানো হয়।

শান্ত ইসলাম বলেন, চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুন যমজ সন্তান থাকার কারণে সিজার করানোর পরামর্শ দেন। তার পরামর্শেই বৃহস্পতিবার বিকেলে স্ত্রীকে বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরে ওই চিকিৎসকের অধীনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শান্তনা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশু হস্তান্তর করা হলেও অপর সন্তানটির বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, অপর সন্তান কোথায়, জানতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো সদুত্তর দেয়নি। উল্টো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আমাকে আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমি আমার অপর সন্তানের সন্ধান চাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

শান্তনার অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর তাকে শুধু একটি শিশুই দেখানো হয়। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালে তারা প্রতিবাদ শুরু করেন। এ সময় তার পেটের অস্ত্রোপচারের কাটা অংশ সেলাই না করে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ফেলে রাখা হয়।

শান্তনা বলেন, পরিবারের সদস্যরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তারা আমার পেটের কাটা অংশ সেলাই না করে ফেলে রাখে। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও করে বলে, তাদের কথা না শুনলে এ অবস্থায় রেখেই চলে যাবে। পরে শরীরে কাঁপুনি শুরু হলে আমি বলি, আপনাদের সব কথা শুনব, আগে পেটের সেলাই করেন। এরপর চিকিৎসক আমার সঙ্গে রাগারাগি ও হুমকি-ধমকি দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন। পরে পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। আমি আমার দুই সন্তানকেই চাই। আমার আরেক সন্তান কোথায়, তা জানতে চাই।

এদিকে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনোগ্রাম করা চিকিৎসক ডা. দিনা মুঠোফোনে কালবেলাকে বলেন, আমি তার শেষবারের আলট্রাসনোগ্রাম করেছিলাম। আমার মেশিনে যেভাবে দেখানো হয়েছে, রোগীকে সেটাই বলেছি। হয়তো ভুল হতে পারে। অনেক সময় মেশিনে মাথা ডাবল দেখা যায়। এ কারণে আমি যমজ বলেছিলাম। যেহেতু অস্ত্রোপচারে একটি বাচ্চা হয়েছে, কাজেই আমার মেশিনে ভুল হতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শরিফুল বলেন, ডা. মাহফুজা খাতুনের নির্দেশনায় ডা. দিনা আলট্রাসনোগ্রাম করেছিলেন এবং তিনিই যমজ সন্তানের প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তবে অস্ত্রোপচারের পর একটি শিশু জন্ম নেওয়ার কথা জানতে পেরেছেন। আলট্রাসনোগ্রামের প্রতিবেদন সঠিক কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই জবাব দিতে পারবেন। তিনি দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই তার প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হকও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ওই নারীকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় এবং তিনিই অস্ত্রোপচার করেন। এর আগে তার নির্দেশেই রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছিল। তার দাবি, বলাকা ক্লিনিকে শুধু অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের পর নবজাতক পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পুরো ঘটনা সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। পুলিশ এসে সেই ফুটেজ দেখেছে।

সমঝোতার জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে এনামুল হক বলেন, রোগীর স্বজনরাই আমাকে রি-লাইফে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং দুই লাখ টাকা চেয়েছিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত সবার সামনে বলেছিলাম, সিজারের খরচ রি-লাইফ বহন করবে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা তা শোনেননি। ডা. দিনার কথাবার্তাও তেমন ভালো নয়। এখানে আমার কোনো গাফিলতি বা দোষ নেই।

এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে নওগাঁ সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন শান্ত ইসলাম। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিন্টু রহমান বলেন, বাদী এজাহার লিখছেন। এজাহার দায়েরের পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনা জানার পরই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগী পক্ষ আবেদন জানালে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: কালবেলা

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।