গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৫ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৫১ এএম

১৭ বার ঘর ভেঙেছে জয়নাল আবেদীনের 

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
১৭ বার ঘর ভেঙেছে জয়নাল আবেদীনের 

সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রাজারহাটে চর খিতাবখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন তিস্তা নদীর পাড়ে আমার আলাপ হয় আবদুল খালেক, জয়নাল আবেদীন, নওশাদ ও বেলালের সঙ্গে। তাঁরা প্রত্যেকে নদীভাঙনের শিকার। জয়নাল আবেদীনের ঘর ভেঙেছে ১৭ বার, নওশাদের পাঁচবার, বেলালের চারবার, আবদুল খালেকের দুবার।

পড়ন্ত বিকেলে নদীর দিকে হাত বাড়িয়ে আবদুল খালেক দেখাচ্ছিলেন, কোথায় তাঁর বাড়ি ছিল। এখন তাঁর বাড়ি একেবারে নদীর কিনারে। তিনি বলছিলেন, ‘হামার বারো ঘরের বাড়ি আছিল, জমি আছিল অনেক। এখন সব নদীত। ভাবছিনোং বেটাক ছোট চাকরি করবার নয়। যখন নদীত বাড়ি ভাঙি গেল, তখন বেটাক আনসারোত পাঠাইছি।’ ছেলেকে ছোট চাকরিতে দিতে চাননি তিনি। কিন্তু বাড়ি ভাঙার পর তাঁকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পাঠাতে হয়েছে।

তাঁরা প্রত্যেকে নদীভাঙনের শিকার। জয়নাল আবেদীনের ঘর ভেঙেছে ১৭ বার, নওশাদের পাঁচবার, বেলালের চারবার, আবদুল খালেকের দুবার।

আবদুল খালেকের পরিবারের এখন ১০-১২ শতক জমি অবশিষ্ট আছে। নদীতে বাড়ি ভাঙার পরপরই আমি তাঁদের দুরবস্থা দেখেছিলাম। একটিমাত্র ঘর তুলেছিলেন তখন। সেই ঘরে দুই ছেলে, ছেলেবউসহ সবাই থাকতেন। রান্নার কাজও চলত ওই ঘরেই।

চর খিতাবখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছেই একটি অস্থায়ী ঘাট। সেখান থেকে যাত্রীবোঝাই নৌকা যাচ্ছিল মাঝের চর নামের একটি চরে। স্থানীয় লোকজনের হিসাবে, সেখানে প্রায় ৩০০ পরিবারের বাস। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁরা ওই চরে আশ্রয় নিয়েছেন। চরে যা ফলে, তা বেচাকেনা হয় এই ঘাটেই।

বারবার নদীর ভয়াল রূপ দেখেছেন জয়নাল আবেদীন

‘নদী ভাঙলে কিচ্ছু থাকে না’

নওশাদ বলছিলেন, ‘বাড়ি আগুনে পুড়ে গেলেও পুকুর থাকে, জমি থাকে। কিন্তু নদী ভাঙলে কিচ্ছু থাকে না।’

জয়নাল আবেদীনের বয়স এখন ৮৫ বছর। সাত-আট বছর বয়স থেকে নদীতে নিজেদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যেতে দেখছেন। এ পর্যন্ত ১৭ বার ঘর ভেঙেছে, ভাঙন আজও থামেনি। স্মৃতি হাতড়ে একে একে সেসব ভাঙনের কথা শোনাচ্ছিলেন তিনি। এতবার ঘরহারা হয়েও কখনো ঘর তোলার জন্য সরকারি সহায়তা পাননি। তাঁর অভিযোগ, সাহায্য তো দূরের কথা, ঘর নদীতে গেলে মানুষগুলো কোথায় যায়, কীভাবে থাকে, সেই খোঁজও কেউ রাখে না। জয়নাল আবেদীনের ঠিকানা এখন মাঝের চর। সেখানে তিনি বাড়ি করেছেন।

নদীভাঙনের ক্ষতি সাধারণত টাকার অঙ্কে মাপা হয়; কিন্তু ক্ষতি এর বাইরেও আছে। ভাঙনে পরিবার ছড়িয়ে পড়ে, পাড়া-প্রতিবেশীর বন্ধন ছিঁড়ে যায়। সচ্ছল পরিবারও রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে এলাকা ছাড়ে, অনেকে আর ফেরেন না। ঘর হারানোর পর সবচেয়ে বিপাকে পড়েন নারীরা। গোসল আর শৌচকাজের জায়গাটুকুও তাঁদের থাকে না।

পড়ন্ত বিকেলে নদীর দিকে হাত বাড়িয়ে আবদুল খালেক দেখাচ্ছিলেন, কোথায় তাঁর বাড়ি ছিল। এখন তাঁর বাড়ি একেবারে নদীর কিনারে।

রাজারহাটেরই সরিষাবাড়ী নামে একটি ছোট বাজারে চায়ের দোকানে আমার আলাপ হচ্ছিল আবদুল বাতেন নামের একজনের সঙ্গে। তাঁরা চার ভাই, তাঁদের ২ একর ৫০ শতক জমি ছিল। কয়েক বছর আগে ঘরবাড়িসহ সব জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দুই ভাই ঢাকায় চলে গেছেন, তাঁদের আর ফেরার সম্ভাবনা নেই। জয়নাল আবেদীনের ভাইয়েরাও একেকজন একেক দিকে চলে গেছেন। বেলালের ভাইদেরও একই অবস্থা। 

একবার এক বৃদ্ধাকে দেখেছিলাম, ভাঙতে থাকা নদীর পাড়ে স্বামীর কবরের খুঁটি ধরে নাছোড়বান্দার মতো বসে আছেন। যেন নদী স্বামীর কবর ভাসিয়ে নিলে তিনিও সঙ্গে যাবেন। রাত হলে প্রতিবেশীরা তাঁকে জোর করে সরিয়ে এনেছিলেন। 

আরেকবার প্রবল বৃষ্টিতে নদী উত্তাল। ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে দেখি, নদীর পাড়ে এক মধ্যবয়সী নারী তাঁর বৃদ্ধ মাকে টেনে সরিয়ে নিতে চাইছেন। মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘মুই যাবার নং।’ মেয়েটি জানালেন, ভাঙনে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। তার পর থেকে মা খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। সারা দিন নদীর পাড়ে বসে থাকেন আর বলেন, ‘ওইখানে হামার বাড়ি আছিল, গাছগাছালি আছিল।’

একবার এক বৃদ্ধাকে দেখেছিলাম, ভাঙতে থাকা নদীর পাড়ে স্বামীর কবরের খুঁটি ধরে নাছোড়বান্দার মতো বসে আছেন। যেন নদী স্বামীর কবর ভাসিয়ে নিলে তিনিও সঙ্গে যাবেন। রাত হলে প্রতিবেশীরা তাঁকে জোর করে সরিয়ে এনেছিলেন। 

বাঁধের ওপর সংসার

নদীভাঙনে ঘরবাড়িহারা মানুষদের মধ্যে সামর্থ্যবানেরা জমি কিনে নতুন করে বাড়ি বানান। যাঁদের তেমন সামর্থ্য নেই, তাঁরা অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে অস্থায়ী বাড়ি করেন। যাঁদের সেই সামর্থ্যও নেই, তাঁরা ঘর তোলেন নদীর বেড়িবাঁধের ওপরে, সরকারি জায়গায়। তিস্তা ও ধরলা নদীর বাঁধে তেমন হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি রয়েছে।

ধরলার পাড়েও একই গল্প। কুড়িগ্রাম সদরের মোগলবাসায় নদীর পাড়ে কথা হয় হযরত আলীর সঙ্গে। পাশের গ্রাম শিতাইঝাড়ে তাঁদের অনেক জমি ছিল। নিজের জমিতে ফসল ফলাতেন, তা দিয়েই সংসার চলত। ধরলা সেই জমি গ্রাস করেছে। গ্রামটিকে এখন অনেকে বলেন ‘চর শিতাইঝাড়’। হযরত আলী এখন ভ্যানগাড়ি চালান। দুই ভাইকে নিয়ে ২০ বছর ধরে আছেন বাঁধের ওপর ঘর তুলে। 

ধরলার বাঁধে একসময় হাজার হাজার মানুষের বসতি ছিল। নদী সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় তাঁদের অনেককে উচ্ছেদ করা হয়। মূলত নদীর ডান তীরের বাঁধের পূর্ব দিকের বসতি উচ্ছেদ হয়েছিল। যাঁরা উচ্ছেদ হয়েছিলেন, তাঁরা এখন নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন, অনেকেই আছেন অন্যের আশ্রয়ে। তবে হযরত আলীরা ডান তীরের বাঁধের পশ্চিম অংশে ২০ বছর ধরে আছেন।

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র

নদীভাঙনে ঘরহারা মানুষদের অনেকে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নেন। এনজিওর ঋণ না পেলে যান স্থানীয় মহাজনের কাছে, উচ্চ সুদে। এভাবে অনেকে এমন চক্রে বাঁধা পড়েন যে সারা জীবনেও আর ঋণমুক্ত হতে পারেন না। কেউ কেউ ঋণ শোধ করতে না পেরে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যান। 

তিস্তা ও ধরলার দুই পাড়ে ভাঙন চলছেই। ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে খুব সামান্য অংশে। চরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ কম, স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে। অথচ এমন নয় যে এত মানুষকে নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করা অসম্ভব। সরকার চাইলে ভাঙন রোধ করা অবশ্যই সম্ভব।

  • তুহিন ওয়াদুদ: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।