সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ করলেই মাথায় ভিড় করছে নানা চিন্তা, কখনো এপাশ-ওপাশ করেই কেটে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়। অথচ পরদিনের কাজের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, পেশি শিথিল করা কিংবা মনকে শান্ত কোনো দৃশ্যে কেন্দ্রীভূত করার মতো কিছু কৌশল সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট হেলথলাইন এক প্রতিবেদনে ১০, ৬০ ও ১২০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সহায়ক কয়েকটি পদ্ধতি তুলে ধরেছে। তবে এসব পদ্ধতি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রতিবেদনটি লিখেছেন ক্রিস্টাল ইউয়েন। চিকিৎসাবিষয়ক পর্যালোচনা করেছেন চিকিৎসক নিক ভিলালোবস। ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হালনাগাদ করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ঘুমের অভ্যাস, শোবার ঘরের পরিবেশ এবং দিনের বেলার জীবনযাপন ঘুম আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কিছু শিথিলায়ন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সহায়তা করতে পারে।
১০ সেকেন্ডে ঘুমের প্রস্তুতি: মিলিটারি মেথড
দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার আলোচিত কৌশলগুলোর একটি ‘মিলিটারি মেথড’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর বিমান প্রশিক্ষণার্থীদের ঘুমের সমস্যা কমাতে এ পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছিল বলে হেলথলাইন জানিয়েছে। পদ্ধতিটির সঙ্গে যুক্ত করা হয় লয়েড বাড উইন্টার-এর ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘রিল্যাক্স অ্যান্ড উইন: চ্যাম্পিয়নশিপ পারফরম্যান্স’ বইয়ের কথা।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য শরীরের বিভিন্ন পেশি ধাপে ধাপে শিথিল করা এবং মনকে শান্ত রাখা। পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে প্রথমে মুখের সব পেশি, এমনকি মুখের ভেতরের পেশিগুলোও শিথিল করতে হবে। এরপর কাঁধের টান ছেড়ে দিয়ে দুই হাত শরীরের পাশে স্বাভাবিকভাবে রাখতে হবে। ধীরে শ্বাস ছাড়ার সময় বুকের পেশি শিথিল করতে হবে। একইভাবে পা, উরু ও পায়ের নিচের অংশের পেশিগুলোও শিথিল করতে হবে।
এরপর প্রায় ১০ সেকেন্ডের জন্য মনকে চিন্তামুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। এ সময় শান্ত কোনো দৃশ্য কল্পনা করা যেতে পারে। তাতেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হলে কয়েক সেকেন্ড ধরে মনে মনে ‘কিছু ভাবব না’ কথাটি বারবার বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ পদ্ধতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। হেলথলাইন বলছে, মিলিটারি মেথডের মাধ্যমে ১০ সেকেন্ডে ঘুমিয়ে পড়ার দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। পুরো পদ্ধতিটি সম্পন্ন করতেও প্রায় ১২০ সেকেন্ড সময় লাগে। অর্থাৎ শেষ ১০ সেকেন্ডে ঘুমিয়ে পড়ার যে দাবি করা হয়, সেটি নিশ্চিত ফল নয়; বরং নিয়মিত অনুশীলনে কারও কারও ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
৬০ সেকেন্ডে ঘুমের চেষ্টা: ৪-৭-৮ শ্বাসপ্রশ্বাস পদ্ধতি
ঘুমের আগে মন অস্থির থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শরীরকে শান্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরিচিত একটি কৌশল হলো ‘৪-৭-৮ ব্রিদিং মেথড’। সমন্বিত চিকিৎসাবিষয়ক চিকিৎসক অ্যান্ড্রু ওয়েইল এ পদ্ধতি তৈরি করেন। এটি যোগব্যায়ামের প্রাণায়াম অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে প্রথমে জিহ্বার আগা ওপরের তালুতে, সামনের দুই দাঁতের ঠিক পেছনে রাখতে হবে। পুরো অনুশীলনের সময় জিহ্বা ওই অবস্থানে থাকবে। এরপর ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়তে হবে। শ্বাস ছাড়ার সময় হালকা শব্দ হতে পারে। তারপর ঠোঁট বন্ধ করে নাক দিয়ে চার সেকেন্ড ধরে নীরবে শ্বাস নিতে হবে। শ্বাস সাত সেকেন্ড আটকে রেখে আট সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে।
এভাবে একটি চক্র সম্পন্ন হয়। পরবর্তী শ্বাস নেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন চক্র শুরু হবে। মোট চারটি চক্র সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে হেলথলাইন। তবে এর আগেই শরীর ও মনে ঘুমের অনুভূতি এলে জোর করে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
একই অংশে ‘প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন’ বা ধাপে ধাপে পেশি শিথিল করার পদ্ধতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে শরীরের বিভিন্ন পেশি অল্প সময়ের জন্য সংকুচিত করে পরে ছেড়ে দিতে হয়। যেমন প্রথমে ভ্রু যতটা সম্ভব উঁচু করে পাঁচ সেকেন্ড ধরে রাখতে হবে। এরপর পেশি ছেড়ে দিয়ে প্রায় ১০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে। একইভাবে হাসির ভঙ্গি করে গালের পেশি টানটান করা, চোখ বন্ধ করে কুঁচকে রাখা এবং ঘাড়ের পেশি সংকুচিত করার পর তা শিথিল করতে হবে। পরে বাহু, বুক, উরু থেকে পায়ের পেশি পর্যন্ত একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো শরীরের জমে থাকা পেশির টান কমিয়ে স্বস্তি তৈরি করা। তবে হেলথলাইন জানিয়েছে, নতুনদের ক্ষেত্রে ৪-৭-৮ শ্বাসপ্রশ্বাস পদ্ধতি বা পেশি শিথিল করার অনুশীলনে কার্যকর হতে দুই মিনিট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ৬০ সেকেন্ড এখানে কোনো নিশ্চিত সময়সীমা নয়।
১২০ সেকেন্ডে ঘুমের চেষ্টা: মনোযোগ সরানোর কৌশল
আগের পদ্ধতিগুলোতে কাজ না হলে ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে মনোযোগ সরানোর কয়েকটি কৌশল চেষ্টা করা যেতে পারে। হেলথলাইন এ ক্ষেত্রে ‘প্যারাডক্সিক্যাল ইনটেনশন’ বা বিপরীত অভিপ্রায়ের কথা বলেছে। এ পদ্ধতিতে ঘুমানোর জন্য জোর চেষ্টা না করে বরং বিছানায় শুয়ে জেগে থাকার চেষ্টা করতে হয়।
কারণ, যাদের অনিদ্রার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঘুমানোর জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা উল্টো মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। ২০২১ সালের একটি গবেষণার উল্লেখ করে হেলথলাইন জানিয়েছে, প্যারাডক্সিক্যাল ইনটেনশন ঘুম নিয়ে উদ্বেগ কমাতে এবং ঘুমের পর নিজেকে সতেজ মনে হওয়ার অনুভূতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ বিষয়ে গবেষণা এখনো সীমিত।
আরেকটি কৌশল হলো শান্ত কোনো দৃশ্য কল্পনা করা। একে বলা হয় ‘ইমেজারি ডিস্ট্র্যাকশন’। ভেড়া গোনার পরিবর্তে একটি শান্ত পরিবেশ কল্পনা করতে হবে। যেমন, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানি, পানির শব্দ কিংবা চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশের কথা ভাবা যেতে পারে। দৃশ্যটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুভূতিগুলোও কল্পনা করতে হবে। এতে ঘুমের আগে দুশ্চিন্তা ও নানা চিন্তা থেকে মনোযোগ সরানো সহজ হতে পারে।
হেলথলাইনে উল্লেখ করা ২০০২ সালের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা এ ধরনের কল্পনাভিত্তিক মনোযোগ সরানোর কৌশল ব্যবহার করেছেন, তাঁরা সাধারণভাবে অন্য বিষয়ে মনোযোগ সরানো বা কোনো নির্দেশনা অনুসরণ না করা ব্যক্তিদের তুলনায় দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছেন।
এ ছাড়া ঘুমের জন্য আকুপ্রেশার বা নির্দিষ্ট কিছু স্থানে চাপ প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছে। ২০১৯ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে হেলথলাইন জানিয়েছে, আকুপ্রেশার ঘুম আসতে প্রয়োজনীয় সময় কিছুটা কমাতে এবং ঘুমের কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে। তবে এ পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো গবেষণা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
প্রতিবেদনটিতে তিনটি চাপ প্রয়োগের স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো কবজির কনিষ্ঠ আঙুলের দিকের তালুর নিচে থাকা ছোট গর্তের মতো স্থান। সেখানে দুই থেকে তিন মিনিট বৃত্তাকারে বা ওপর-নিচে হালকা চাপ দিয়ে মালিশ করা যায়। দ্বিতীয়টি কবজির ভাঁজ থেকে তালুর দিকে তিন আঙুল পরিমাণ নিচে, দুটি টেন্ডনের মাঝখানের স্থান। সেখানে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে হালকা চাপ প্রয়োগ করা যায়। তৃতীয়টি মাথার পেছনে ঘাড় ও মাথার সংযোগস্থলের দুই পাশে। দুই হাতের আঙুল পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ওই স্থানে বৃত্তাকারে মালিশ করার কথা বলা হয়েছে।
দ্রুত ঘুমের জন্য অভ্যাসেও পরিবর্তন জরুরি
শুধু বিছানায় শুয়ে কোনো কৌশল অনুসরণ করলেই দ্রুত ঘুম আসবে, এমন নয়। হেলথলাইন বলছে, ঘুমের নিয়মিত অভ্যাস তৈরি করা, ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং শোবার ঘর আরামদায়ক, নীরব ও অন্ধকার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত সূর্যালোক গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখাও ঘুমের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
রাতে ঘুম না আসার পেছনে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের অনুপযোগী পরিবেশ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো কিংবা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু ওষুধের প্রভাবেও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, বিশেষ করে অ্যাজমা বা সিওপিডি থাকলে ৪-৭-৮ পদ্ধতি অনুসরণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, এ অনুশীলন কারও কারও ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের উপসর্গ বাড়াতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, ১০, ৬০ কিংবা ১২০ সেকেন্ডে ঘুমিয়ে পড়ার কোনো পদ্ধতিই সবার জন্য নিশ্চিত ফল দেয় না। এগুলো মূলত শরীর ও মনকে শিথিল করার কৌশল। নিয়মিত চেষ্টা করেও ঘুমের সমস্যা দূর না হলে এর অন্তর্নিহিত কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স