ঢোলের শব্দের সঙ্গে শুরু হয় লাঠির ছন্দময় লড়াই। কখনো আক্রমণ, কখনো প্রতিরোধ। লাঠিয়ালদের ক্ষিপ্রতা আর কৌশল দেখতে মাঠজুড়ে দর্শকের ভিড়। কেউ এসেছেন পাশের গ্রাম থেকে, কেউ দূরদূরান্ত থেকে। মাঠের বাইরে বসেছে মেলা। কোথাও খাবারের দোকান, কোথাও খেলনা, কোথাও আবার বড় বড় মাছ নিয়ে বসেছেন জেলেরা। সব মিলিয়ে উৎসবের অন্য রকম আমেজ।
এ দৃশ্য মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ডুমুরশিয়া গ্রামের। প্রতিবছর কার্তিক মাসের ১৬ তারিখে এখানে বসে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার মেলা। এবার ২১ কার্তিক, গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ১০৬তম আয়োজন। শুক্রবার দুপুরে ডুমুরশিয়া ডিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় লাঠিয়ালদের সঙ্গে তিনি নিজেও লাঠিখেলায় অংশ নেন। দর্শকেরা লাঠিখেলা উপভোগ করেন। সন্ধ্যার পর একই স্থানে বসে বিচারগানের আসর।
১৯১৩ সালের পর কোনো এক সময় থেকে নিয়মিত এ আয়োজন হয়ে আসছে। তবে প্রথম আয়োজনের নির্দিষ্ট সাল জানা যায়নি। ১৯৯৮ সাল থেকে লাঠিখেলা ও মেলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। তখন থেকে মেলা চলছে দুই দিনব্যাপী।
একটি পরিবারের উদ্যোগে শুরু
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডুমুরশিয়ার লাঠিখেলার প্রচলন এক শতাব্দীরও আগে। এর পেছনে আছে একটি পরিবারের উদ্যোগ।
মাগুরা সদর উপজেলার বাগবাড়িয়ার বাসিন্দা ইমাম উদ্দিন সরদার বিয়ে করেন ডুমুরশিয়া গ্রামে। পরে তিনি ডুমুরশিয়ার পশ্চিম পাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তৎকালীন তালুকদার মতিউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। ইমাম উদ্দিন নিজেও লাঠিখেলায় পারদর্শী ছিলেন। নিজের বাড়ির সামনে ও তালুকদারের কাছারিতে তিনি লাঠিখেলাসহ শারীরিক কসরতের আয়োজন করতেন।

ইমাম উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে চিকিৎসক মোকররম হোসেন বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিবছর লাঠিখেলা ও মেলার আয়োজন করেন। পরে তাঁর ছেলে চিকিৎসক আবদুর রাজ্জাক এবং ডুমুরশিয়া ও চালিমিয়া গ্রামের মাতব্বরদের সহযোগিতায় আয়োজনটি বার্ষিক উৎসবে রূপ নেয়। একপর্যায়ে দায়িত্ব নেয় ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯১৩ সালের পর কোনো এক সময় থেকে নিয়মিত এ আয়োজন হয়ে আসছে। তবে প্রথম আয়োজনের নির্দিষ্ট সাল জানা যায়নি। ১৯৯৮ সাল থেকে লাঠিখেলা ও মেলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। তখন থেকে মেলা চলছে দুই দিনব্যাপী। সময়ের সঙ্গে বিচারগান ও পালাগানও মেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজ
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, মেলার দিন ডুমুরশিয়াসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ঈদ বা পূজার মতোই চলে প্রস্তুতি। জামাই–মেয়ে, নাতি–নাতনিদের মেলায় আসার দাওয়াত দেওয়া হয়। ঘরে ঘরে মুড়ি–চিড়া ভাজা, কাপড়চোপড় পরিষ্কারের আয়োজন চলে। অনেকের কাছে এটি শুধু লাঠিখেলা দেখার দিন নয়, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়ারও উপলক্ষ।
মেলায় আসা স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হওয়া এই আয়োজন এখন পুরো এলাকার মানুষের উৎসব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, লাঠিখেলা আবহমান বাংলার প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। এসব খেলাধুলা গ্রামীণ জনপদের জীবন ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ বর্তমান সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ ও মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন।
সভাপতির বক্তব্যে আবুল হোসেন বলেন, জমিদারি আমলে লাঠিয়াল বাহিনীর শারীরিক কসরত ও আত্মরক্ষার চর্চা থেকে বাংলায় লাঠিখেলার বিস্তার ঘটেছিল। সময়ের সঙ্গে এর সামরিক ও জমিদারি প্রেক্ষাপট হারিয়ে গেলেও বিনোদন ও লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে খেলাটি টিকে আছে। এখন এই আয়োজন ডুমুরশিয়ার ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১০৬তম আয়োজন সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
সূত্র: প্রথম আলো