গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২৪ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন স্তরে ১০০ মুসলিম প্রার্থী জিতেছেন, কীভাবে জয় পেলেন তাঁরা

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন স্তরে ১০০ মুসলিম প্রার্থী জিতেছেন, কীভাবে জয় পেলেন তাঁরা

আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিলের (সিএআইআর) তথ্য অনুযায়ী, এ সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয়, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অন্তত ৯৭ জন মার্কিন মুসলিম জয়ী হয়েছেন।

আরও এক ডজনের বেশি মুসলিম প্রার্থী এখনো সব ভোট গণনার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিভিন্ন কাউন্টির নিজস্ব নিয়ম এবং ডাকযোগে আসা ভোট গণনার পদ্ধতির ওপর চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে। তবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যা অভিনব ঘটনা। গত বছর বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতে নিউইয়র্ক নগরের মেয়র হয়েছেন জোহরান মামদানি। তাঁর ওই জয় মুসলিম প্রার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, যাঁরা আগে কখনো নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনার কথা ভাবেননি, তাঁদের ওপর জোহরান মামদানির জয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এবার প্রাইমারি (দলীয় প্রাথমিক বাছাই) নির্বাচনের বাধা পেরিয়ে ১৬৮ জন মার্কিন মুসলিম প্রার্থী মূল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান। যুক্তরাষ্ট্রে চূড়ান্ত নির্বাচনে অংশ নিতে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগে প্রাইমারিতে নিজ দলের অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিততে হয়।

এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিতে সাতজন মার্কিন মুসলিম ওয়াশিংটন ডিসিতে যাচ্ছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার চতুর্দশ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে আয়েশা ওয়াহাব জয় নিশ্চিত করতে পারলে তিনিও বর্তমান প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেবেন। তবে স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাঁর জয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এই সাতজনের মধ্যে ছয়জন যাচ্ছেন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে। তাঁরা হলেন বর্তমান প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান সদস্য ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন। তাঁদের সঙ্গে নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিচ্ছেন আদম হামাউই ও দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের।

ক্যালিফোর্নিয়ার চতুর্দশ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে আয়েশা ওয়াহাব জয় নিশ্চিত করতে পারলে তিনিও বর্তমান প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেবেন। তবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে থাকলেও স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাঁর জয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এবার একজন মুসলিম মার্কিন সিনেটে যাচ্ছেন। তাঁর নাম আবদুলরহমান আল–সাইয়েদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে যাচ্ছেন। আগামী ছয় বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রুয়া রোমান

সিএআইআরের হিসাব অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আরও ৩৯টি পদে মুসলিম মার্কিন প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এসব পদের মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল, অঙ্গরাজ্য আইনসভা ও অঙ্গরাজ্য সিনেটের সদস্য রয়েছেন।

—সিএআইআরের জরিপমুসলিম ভোটারদের ৮০ শতাংশ মূলত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন মাত্র ৬ শতাংশ।

কাউন্টি ও পৌরসভা পর্যায়ে জয়ী হয়েছেন ১৬ জন। এ ছাড়া শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ২৭ জন মার্কিন মুসলিম। আটজন বিচারক নির্বাচিত হয়েছেন।

মার্কিন মুসলিম প্রার্থীরা এমন এক সময়ে নির্বাচনে নিজেদের সর্বকালের সেরা সাফল্য পেলেন, যখন দেশটিতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব ও বক্তব্য গত এক প্রজন্মের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—বিশেষ করে রিপাবলিকানদের মধ্যে।

মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক), সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসও) এবং ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (আইএসপিইউ) মতো সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া

যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মুসলিম। দেশটিতে মোট মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। সংখ্যায় কম হলেও গণমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে আলোচনা ও অনলাইনে তাঁদের ওপর আক্রমণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

৩ নভেম্বর মঙ্গলবার ভোটের দিনের আগমুহূর্তেও এমপ্যাক সতর্ক করে বলেছিল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর কৌশল মার্কিন মুসলিম ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মুসলিম। দেশটিতে মোট মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। সংখ্যায় কম হলেও গণমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে আলোচনা ও অনলাইনে তাঁদের ওপর আক্রমণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

যদিও গত এক বছরে মুসলিম ভোটারদের নিবন্ধনের হার অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়েছে। আর অন্তত একটি জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত মুসলিম ভোটারদের ৯৩ শতাংশই ভোট দিয়েছেন।

সিএআইআরের এক জরিপে দেখা গেছে, মুসলিম ভোটারদের ৮০ শতাংশ মূলত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন মাত্র ৬ শতাংশ।

এনবিসির বুথফেরত জরিপে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে কিংবা কোনো ধর্ম অনুসরণ করেন না—এমন ভোটারদের মধ্যে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

আবদুল আল–সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন

তুলনা করে বলা যায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ২০ শতাংশের বেশি মার্কিন মুসলিম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিল আইএসপিইউ। সে সময় ট্রাম্প সব যুদ্ধ বন্ধ করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

—জুনাইদ আহমেদ, মুসলিম প্রগতিশীলআশা করি, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের কাজের মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণ বুঝতে পারবেন, আমরা যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলি, তখন সেই নীতির প্রতিফলন যেন নীতিনির্ধারণেও দেখা যায়।

এ নিয়ে জর্জিয়া ভোটার প্রজেক্টের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক উরুজ আলি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমাদের মাঠপর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নীতিগত বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেন। তাই তাঁদের অনেকেই ডেমোক্রেটিক বা রিপাবলিকান—কোনো পার্টির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত না করে স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।’

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য জর্জিয়া। এই অঙ্গরাজ্যের দুই সিনেটরই ডেমোক্র্যাট। এ ছাড়া এবার একজন ডেমোক্র্যাট সেখানকার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এই পদে নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী।

যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দিতে হলে নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভোটের দিন আসার আগেই এই নিবন্ধন করতে হয়। তা না হলে ভোটকেন্দ্র থেকে অনিবন্ধিত ভোটারদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে মিশিগানের মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের দিনও ভোটারদের নিবন্ধন করার সুযোগ রয়েছে।

দমে না যাওয়া

গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমবিরোধী বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি ভবনে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যসংবলিত গ্রাফিতি আঁকা, ইলিনয়ে হিজাব পরা নারীদের গুলি করার হুমকি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মসজিদে গুলি চালিয়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করার ঘটনা।

গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমবিরোধী বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি ভবনে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যসংবলিত গ্রাফিতি আঁকা, ইলিনয়ে হিজাব পরা নারীদের গুলি করার হুমকি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মসজিদে গুলি চালিয়ে একজন নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করার ঘটনা।

মসজিদে গুলি চালানোর এ ঘটনা ঘটেছিল সিএসওর ৩৬ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশের কিছুদিন পর।

‘ম্যানুফ্যাকচারিং দ্য মুসলিম থ্রেট’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে মুসলিমবিরোধী প্রচার চালিয়েছিলেন। এ প্রচারের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১ হাজার ১১১টি পোস্ট দেওয়া হয়, ৮টি বিল উত্থাপন করা হয় এবং কংগ্রেসের ৬২ সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড ‘সহিংসতায় উসকানি দিতে পারে—এমন বক্তব্যের মানদণ্ড পূরণ করে’।

সিএআইআরের জরিপে দেখা গেছে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন মুসলিম ভোটারদের ভোট দেওয়ার পেছনে ইসলামবিদ্বেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। ৭০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, মুসলিমবিরোধী মনোভাব তাঁদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে।

ন্যাশনাল আমেরিকান ইসলামোফোবিয়া ইনডেক্স তৈরি করেছে আইএসপিইউ। সংস্থাটির ২০২৫ সালের সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে। শূন্য থেকে ১০০-এর মাপকাঠিতে এ সূচক ২০২২ সালে ২৫ ছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৩৩ হয়েছে।

আইএসপিইউ জানিয়েছে, শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইসলামবিদ্বেষের সূচক সবচেয়ে বেশি বেড়েছে—১৫ পয়েন্ট। ক্যাথলিকদের মধ্যে বেড়েছে ১২ পয়েন্ট এবং ইহুদিদের মধ্যে ১১ পয়েন্ট।

তবে এসব ঘটনা মুসলিমদের ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের ধর্মীয় নেতাদের উপদেষ্টা বোর্ডে একমাত্র মুসলিম নারী সদস্য ছিলেন সামিরা মুনশি। পরে প্রতিবাদ জানিয়ে গত মার্চে তিনি পদত্যাগ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মুসলিম। দেশটিতে মোট মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। ছবিতে একজন মুসলিম নারী ভোট দিচ্ছেন। ৩ নভেম্বর ২০২৬

মিডল ইস্ট আইকে সামিরা মুনশি বলেন, ‘আমি মূলত জেনারেশন জি বা জেন–জি প্রজন্মের মানুষ। তাই নাইন/ইলেভেন হামলার পরের পরিস্থিতি এবং তখন কী ঘটেছিল, তা পুরোপুরি বোঝার মতো বয়স আমার হয়নি। আমার মনে হয়, আমাদের এই প্রজন্ম নাইন/ইলেভেনের ঘটনা মাথায় রেখে বড় হলেও তখনকার প্রাপ্তবয়স্ক বা ভোটার মুসলিমদের মতো হতাশা অনুভব করেন না। আর এ কারণেই হয়তো আমাদের প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে আরও বেশি আগ্রহী হয়েছে।’

সামিরা মুনশি বলেন, গত তিন বছরে মূলধারার বিনোদন ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ইসরায়েলপন্থী ও ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্য এবং আইনকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তা-ও মুসলিম মার্কিনদের আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছে।

সিএআইআরের জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ ভোটার গাজা ও ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারকে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। আর ৮০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে ‘বড় ধরনের প্রভাব’ ফেলেছে।

জাতিসংঘ ও হলোকাস্টবিষয়ক গবেষকদের অনেকে গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস অভিযানকে জেনোসাইড বা জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করেছেন।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে হেরে যাওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল ইসরায়েলের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত সমর্থন প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানানো। সে সময় গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন যে ১০ প্রার্থী

বিভিন্ন ন্যায্যতার প্রশ্নে একাত্মতা

সামিরা মুনশির এক ক্যাথলিক সহকর্মী ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর প্রতিবাদ জানাতে মুনশি পদত্যাগ করেন।

সামিরা মুনশির ওই সহকর্মীর নাম ক্যারি প্রেজিন-বোলা। তাঁকে ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের প্যানেল থেকে সরিয়ে দেন টেক্সাসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিক। প্যাট্রিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের চেয়ারম্যান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই প্যানেলটির সদস্যদের নিয়োগ দেন।

মঙ্গলবারের ভোটে হেরে গেছেন প্যাট্রিক। তিনি ১২ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির নারী প্রার্থীর কাছে তিনি বিপুল ভোটে হেরে যান। প্রায় তিন দশকের মধ্যে টেক্সাসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয়ী হলেন। এ ছাড়া টেক্সাসের ইতিহাসে এই পদে দায়িত্ব নেওয়া প্রথম নারী হতে যাচ্ছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচতি মুসলিম সিনেটর আবদুল আল–সাইয়েদের মতো হ্যামিল্টন ও টালারিকোও তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনাচারকে আড়াল না করে বরং সেগুলোর ওপরই জোর দিয়েছেন। এমন একটি দলের হয়ে তাঁরা নির্বাচনে লড়েছেন, যে দল সাধারণত প্রকাশ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চা থেকে দূরে থেকেছে।

মিশিগানে ইতিহাস গড়ে প্রথম মুসলিম সিনেটর আল–সাইদ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তীব্র বাক্যবাণ সামলে পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর

পরিচয়ের রাজনীতি

নির্বাচনের সময় মার্কিন মুসলিম ভোটাররা ইসলামবিদ্বেষ ও ফিলিস্তিন ইস্যুকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেও আইএসপিইউর করা জরিপ বলছে, তাঁদের অধিকাংশই অন্য মার্কিন ভোটারদের মতো দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিয়েছেন।

মুসলিম ভোটারদের মতো মুসলিম পরিচয় দেওয়া প্রার্থীরাও ধর্মকে তাঁদের পরিচয়ের একটি অংশ হিসেবেই দেখেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের পুরো পরিচয় ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জোহরান মামদানি মূলত ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি কিছুটা ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা সামনে এনেছেন। অন্যদিকে সাইয়েদ বলেছেন, তিনি ধর্মপ্রাণ এবং নিজের ধর্মের প্রতি অঙ্গীকারের কারণেই নিজেকে নির্বাচনে লড়ার যোগ্য বলে মনে করেছেন।

তবে সব মুসলিমই প্রগতিশীল বা ডেমোক্র্যাট নন। অ্যারিজোনার প্রতিনিধি পরিষদ থেকে সম্প্রতি পুনর্নির্বাচিত আবি হামাদেহ একজন রিপাবলিকান। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থনও পেয়েছেন। ট্রাম্পের আমলে এবং হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রভাবে রিপাবলিকান পার্টি জোরালোভাবে ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিয়েছে এবং মোটের ওপর মুসলিমবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে।

নিজেকে মুসলিম প্রগতিশীল হিসেবে পরিচয় দেওয়া জুনাইদ আহমেদ গত মার্চে ইলিনয়ের অষ্টম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে হেরে যান।

সরে যেতে পারেন ট্রাম্পের কয়েক মন্ত্রী

জুনাইদ বলেন, ‘আশা করি, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের কাজের মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণ বুঝতে পারবেন, আমরা যখন “আমেরিকা ফার্স্ট” বলি, তখন সেই নীতির প্রতিফলন যেন নীতিনির্ধারণেও দেখা যায়।’

জর্জিয়া মুসলিম ভোটার প্রকল্পের আলী বলেন, মার্কিন মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত কোনো নির্দিষ্ট ‘এজেন্ডা’ নেই। বরং সম্প্রদায়ের মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

আলী বলেন, ব্যক্তির মুসলিম হওয়া যতটা তাঁর পরিচয়, তার চেয়ে বেশি এটি একটি জীবনযাপনের ধরনমাত্র।

আলী আরও বলেন, ‘এর মূল কথা হলো, আমরা যেন যেমন পৃথিবী পেয়েছি, তার চেয়ে আরও ভালো একটি পৃথিবী রেখে যেতে পারি।’

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।