গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

আলুচাষিরা ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছেন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
আলুচাষিরা ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছেন

সেদিন শনিবার। ওই দিন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে হাট বসে। হাটে বসেই কথা হচ্ছিল রনি (৪০), জাকির (৪০), হামিদুল (৩৮) ও রওশন (৩০) নামের চারজন কৃষি উদ্যোক্তার সঙ্গে। চারজনই আলু চাষ করে লোকসানে পড়েছেন। তাঁরা বলছিলেন, ‘ভাই, সরকার আলু রপ্তানি না করলে এবার কৃষক মারা যাবে। ভাবছিলাম, গতবার দাম পাইনি, এবার হয়তো পাব।’

কয়েক দিন আগে কুড়িগ্রামের ক্যাতার মোড়ের মোস্তফা হিমাগারে এক পাইকার জানালেন, কুড়িগ্রামে ছয়টি কোল্ডস্টোরেজ হওয়ায় আলু নষ্ট হবে না, এমন ধারণা থেকে কৃষকেরা বেশি করে আলুর আবাদ করেছেন। কোল্ডস্টোরেজের ভাড়াসহ প্রতি কেজি আলুর খরচ পড়েছে ২৩ থেকে ২৪ টাকা। এর মধ্যে কোল্ডস্টোরেজের ভাড়া প্রতি কেজিতে ৯ টাকা ৭৫ পয়সা। অর্থাৎ হিমাগারের ভাড়া বাদ দিলে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৩ থেকে ১৪ টাকা। অথচ কৃষক বাজারে আলু বিক্রি করছেন সাড়ে ১১ টাকা কেজি দরে।

কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পায়, তার অর্থ তো জনগণেরই। কিন্তু কৃষক লোকসানে পড়ে মারা যাচ্ছেন, আর কোম্পানিগুলো দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠছে। এ কেমন বৈপরীত্য?

আড্ডায় জাকির জানালেন, ফলন খুব ভালো হলে প্রতি শতকে দুই বস্তা আলু পাওয়া যায়। প্রতি বস্তার ওজন ৬৫ কেজি। অর্থাৎ প্রতি বিঘা জমিতে আলু উৎপাদিত হয় ৪ হাজার ২৯০ কেজি। কৃষি উদ্যোক্তা ও বীজের দোকানি রনি জানালেন, ‘গত বছর স্কয়ারের বীজ কিনেছি ২৫ টাকা কেজি দরে। এবার দাম চেয়েছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা। আর ৮৮০ টাকার কীটনাশক কিনেছি ৮৯৫ টাকায়।’

অর্থাৎ এক বিঘা জমিতে ৩৬০ কেজি বীজ লাগে। বীজের দাম বাড়ায় এবার বাড়তি খরচ হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ টাকা। উৎপাদিত আলুর হিসাবে প্রতি কেজিতে বীজের পেছনে বাড়তি খরচ পড়েছে দেড় টাকা। এই বাড়তি খরচ বাদ দিলে আলুর বিক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচ প্রায় সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ কৃষকের লোকসান হয় না।

কিন্তু বাস্তবে কৃষক লোকসান গুনছেন, আর বীজ কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর মুনাফা করে যাচ্ছে। সরল অঙ্কটা তাহলে এত সরল নয় কেন?

আলু, পেঁয়াজ, সবজি—কম দামে কেনার পেছনের গল্পটা...

হামিদুল বললেন, ‘শীতকালীন সবজির হিমাগার নেই, তাই সেগুলোর দাম পড়ে যায়—সেটা মানলাম। কিন্তু আলু তো সংরক্ষণ করা যায়। তাহলে আলুর দাম পড়ে যায় কেন? এদিকে হিমাগারের কারণে ভোক্তারা সারা বছরই ২০ টাকা কেজি দরে আলু খান। ভোক্তাকে সহনীয় দামে আলু খেতে হবে, আবার কৃষককেও ন্যায্য দাম দিতে হবে। এর সমাধান কী?’

সরকার হিমাগারগুলোকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ কিছু আর্থিক সুবিধা ও নীতিগত প্রণোদনা দিয়ে থাকে। হিমাগারগুলোকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ ও পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশেষ ছাড় বা রেয়াতি সুবিধা রয়েছে। হিমাগারে সংরক্ষিত উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য (যেমন আলু) বিদেশে রপ্তানি করলে সরকার নির্দিষ্ট হারে নগদ আর্থিক প্রণোদনাও দিয়ে থাকে।

হিমাগারের জন্য প্রয়োজনীয় হিমায়নযন্ত্র, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও করের ছাড় বা রেয়াত দেওয়া হয়। বাজারে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সরকার (কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) হিমাগারে পণ্য সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়ে পরোক্ষভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে। খাদ্যগুদামের মতো হিমাগারগুলো ব্যবহার করে সরকার ন্যূনতম মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনতে পারে।

বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বীজ উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা, নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উন্নত, প্রতিকূলতাসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল জাতের বীজ সরকারিভাবে অনুমোদিত বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোকে সুলভ মূল্যে বা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বীজ ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিকভাবে বীজ উৎপাদন করে।

এ ছাড়া বীজ কোম্পানিগুলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলক কম সুদে (কৃষি পুনঃ অর্থায়ন বা প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায়) স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়ার সুযোগ পায়।

বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রেও ভ্যাট ও শুল্কে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। বেসরকারি কোম্পানিগুলো যখন সাধারণ কৃষকদের দিয়ে চুক্তিভিত্তিক বীজ উৎপাদন করায়, তখন সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় ব্লক সুপারভাইজারদের কাছ থেকেও নীতিগত ও প্রশিক্ষণমূলক সহায়তা পায়।

কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পায়, তার অর্থ তো জনগণেরই। কিন্তু কৃষক লোকসানে পড়ে মারা যাচ্ছেন, আর কোম্পানিগুলো দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠছে। এ কেমন বৈপরীত্য?

  • নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক

  • nahidknowledge1@gmail.com

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।