গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২৬ এএম

স্বপ্ন বদলায়, লড়াই থামে না

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
স্বপ্ন বদলায়, লড়াই থামে না

পাখি পোষা মোহাম্মদ আলীর ছোটবেলার শখ। গত দুই বছরে সেই শখের পাখিগুলো নিয়েই গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি খামার। সকালে পাখিদের খাবার দিয়ে বেরিয়ে যান বাজারে। আড়ত থেকে মাছ কিনে বসেন খুচরা বাজারে। আট বছর ধরে এভাবে মাছের ব্যবসার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এবার রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) শেষ করেছেন। তাঁর পছন্দ শিক্ষকতা। সরকারি বা বেসরকারি, যা-ই হোক, পেশা হিসেবে শিক্ষকতাই বেছে নিতে চান। মফস্​সলের এক অসচ্ছল পরিবার থেকে সেই লক্ষ্যেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। 

মোহাম্মদ আলীর বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে। ২৬ অক্টোবর বানেশ্বর বাজারের মাছহাটায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। ক্রেতার সঙ্গে দরদাম আর বেচাকেনার ফাঁকে জানালেন, সেদিন দুটি আড়ত থেকে মোট ১৩ হাজার টাকার মাছ কিনেছিলেন। দুপুরের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়। ৫০০ টাকা খাজনা দেওয়ার পর সেদিন তাঁর আয় দাঁড়াল প্রায় দেড় হাজার টাকা। বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয় শুক্রবার। গত শুক্রবার ২২ হাজার টাকার মাছ কেনাবেচা হয়েছে। 

ব্যবসাটা দীর্ঘদিন করতেন তাঁর বাবা ইদ্রিস আলী (৬৫)। এইচএসসি পড়ার সময় থেকে হাল ধরেছেন মোহাম্মদ আলী। বাবা এখন পাশে থেকে সাহায্য করেন, ক্রেতাদের কাছ থেকে বাকি আদায় করেন। বাবা পাশে আছেন বলেই ১৮ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী শহরের কলেজে গিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা দিয়ে আসতে পেরেছেন। 

বাজারের ঘরে পড়ার টেবিল

বানেশ্বর বাজারের সরকার সাইন মার্কেটে মোহাম্মদ আলীর একটি ছোট ঘর আছে। বাড়িতে পড়ার পরিবেশ নেই, তাই বইপত্র রাখেন সেখানেই, পড়াশোনাও করেন সেখানে বসে। মার্কেট দেখাশোনা করেন বলে মালিক ঘরের ভাড়া নেন না। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের সংসারও অসচ্ছল, অসুখ-বিসুখে মোহাম্মদ আলীকেই পাশে দাঁড়াতে হয়। কিছুদিন আগে মেজ বোনকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। 

মাড়িয়া গ্রামে তাঁদের আধা পাকা বাড়ি। টিনের চালার একটি ঘরে রাখা পাখির খাঁচা। খামারে এখন ৪০টি খাঁচায় পাখি আছে। এর মধ্যে তিনটি গ্রে ককাটেল আর দুটি গ্রিন ফিশার্স লাভবার্ডের বাচ্চা বিক্রির উপযোগী হয়েছে। অনলাইনে আর বগুড়ায় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পাখি কেনাবেচা করেন। এই পাঁচটি বাচ্চা বিক্রি করে ৪ হাজার ৯০০ টাকা পাওয়ার আশা করছেন। 

বিদেশের স্বপ্ন, বিসিএসের প্রস্তুতি

বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন নিয়েও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁদের একজন মায়িশা মাহজাবিন। বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাশিমপুর গ্রামে, এখন থাকেন রাজশাহী শহরের তেরোখাদিয়ায়। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস বিষয়ে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে সে বছরের জুনে আইএলটিএস দেন, স্কোরও ভালো ছিল। লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়া। সেখানে তাঁর এক চাচা স্থায়ী হয়েছেন। 

মায়িশা বলেন, ‘শুধু চাচাকে দেখে নয়; দেশের যে পরিস্থিতি, মাঝেমধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটে যে মনে হয়, কেন এই দেশে আছি। আমার সমসাময়িক অনেকেই বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, চলে যাচ্ছেন। মূলত এ কারণেই বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল।’ 

অস্ট্রেলিয়া কেন? মায়িশার ব্যাখ্যা, ‘আমার পড়ার বিষয়ের কারণে অস্ট্রেলিয়া পছন্দ ছিল। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি এই বিষয়ে ভালো চাকরির সুযোগ আছে। কিন্তু তখন অস্ট্রেলিয়ায় যেতে যে আর্থিক সংগতি দরকার, তা আমার পরিবারের ছিল না। অন্য কোনো দেশ বেছে নিতে পারতাম, কিন্তু সেসব দেশেও কোথাও কোথাও অস্থিরতা ছিল।’ 

বাস্তবতার মুখে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া হয়নি। মায়িশা এখন নতুন স্বপ্ন বুনছেন। তিনি বলেন, ‘এখন ভাবছি, পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিই। পরে সুযোগ হলে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করব।’ 

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, রাজশাহী

পরিবার চায়, ছেলে বিদেশ যাক

মায়িশার উল্টো পথে হাঁটছেন ইশতিয়াক ফারুকী। পরিবারের সিদ্ধান্তে তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাড়ি গোদাগাড়ীরই প্রসাদপাড়া গ্রামে। রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ২০২৪ সালে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) আর পরের বছর মাস্টার্স অব এডুকেশন (এমএড) শেষ করেছেন। স্নাতক শেষ করার পর থেকে স্থানীয় একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে কাজ করেছেন। স্বপ্ন ছিল দেশে চাকরি করেই নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। 

কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে পরিবার চাইছে, যেকোনো কাজ নিয়ে ছেলে বিদেশে যাক, অন্তত ভালো থাকুক। পরিবারের কথামতো ইশতিয়াক গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যাতে বিদেশে দরকার হলে চালকের কাজ পান। কোন দেশে, কার মাধ্যমে যাবেন, এখনো ঠিক হয়নি। পরিবার চেষ্টা চালাচ্ছে। আদৌ যেতে পারবেন কি না, ইশতিয়াক নিজেও জানেন না। 

শিক্ষকতার ডিগ্রি নিয়ে ইশতিয়াক বিদেশে গাড়ি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর মাছের হাটে বসে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মোহাম্মদ আলী। কেউ দেশে থেকে লড়ছেন, কেউ দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন। কারও স্বপ্ন বদলেছে পরিবারের সিদ্ধান্তে, কারও টাকার অভাবে। তবু কেউ থেমে নেই। সকালে পাখিদের খাবার দিয়ে মোহাম্মদ আলী রোজকার মতো মাছের হাটে যান। তারপর সময় পেলে বসেন মার্কেটের সেই ছোট ঘরে, বই নিয়ে। 

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

    নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, রাজশাহী

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।