গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম

ইসলামি ব্যাংকি: শুধু কি ‘বিকল্প’ ব্যবস্থা, নাকি নৈতিক দর্শন

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
ইসলামি ব্যাংকি: শুধু কি ‘বিকল্প’ ব্যবস্থা, নাকি নৈতিক দর্শন

বিশ্ব অর্থনীতিতে আজ একটি সুদৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প অর্থব্যবস্থা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে ইসলামি ব্যাংকিং। প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যবস্থার বিপরীতে অংশীদারি, ঝুঁকি ও মুনাফার ন্যায্য বণ্টন, সম্পদের উৎপাদনমুখী ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শরিয়তের অনুশাসনের অঙ্গীকার নিয়েই এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে—ইসলামি ব্যাংকিং কি শুধু সুদবিহীন কিছু আর্থিক পণ্যের বিকল্প ব্যবস্থা, নাকি এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন?

প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আসল পরিচয় শুধু মুরাবাহা, মুদারাবা, মুশারাকা কিংবা ইজারা নামের কিছু আরবি পরিভাষার চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

এর মূল চালিকাশক্তি হলো তাকওয়া, আমানতদারি, সততা, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং মাকাসিদুশ শরিয়াহর (শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য) বাস্তব প্রতিফলন।

ব্যাংকগুলোর প্রাত্যহিক কার্যক্রমে এসব নৈতিক মূল্যবোধ দৃশ্যমান না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো বাহ্যিকভাবে ইসলামি কাঠামো ধরে রাখলেও তাদের সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মৌলিক ফারাক ক্রমেই মুছে যায়।

এতে কেবল গ্রাহকের আস্থাই নষ্ট হয় না; বরং ইসলামি অর্থনীতির সামগ্রিক দর্শনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ব্যাংকের বিনিয়োগনীতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষক অর্থায়নের সুযোগ পান এবং জাতীয় সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়।

নৈতিকতা: ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রাণ

নৈতিকতা বা ইথিকস বলতে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ ও সিদ্ধান্তে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং সততার অবিচল চর্চাকে বোঝায়। ইসলামি পরিভাষায় এর সঙ্গে আখলাক, আদব, আমানত, ইনসাফ ও তাকওয়ার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

ইসলামি নৈতিকতার বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা রাষ্ট্রের আরোপিত আইন মেনে চলার মধ্যেই সীমিত নয়; বরং এর মূল ভিত্তি আল্লাহর কাছে চূড়ান্ত জবাবদিহি, হালাল-হারামের সার্বক্ষণিক সতর্কতা এবং আখেরাতের বিশ্বাস।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করলে ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশনা অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। কারণ, আমানতকারীর গচ্ছিত অর্থ, বিনিয়োগকারীর ন্যায্য স্বার্থ, সাধারণ গ্রাহকের অধিকার কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ—সবকিছুই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এক পবিত্র আমানত।

ফলে এসব দায়িত্ব পালনে সামান্যতম অবহেলা, তথ্য গোপন, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিছক কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং তা স্পষ্ট খেয়ানত ও ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুতর লঙ্ঘন।

রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের আদর্শের অনুসারী নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)

সুতরাং ইসলামি ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা কোনো বাড়তি অলংকার বা ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি তার অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক শর্ত।

প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং কতটা শরিয়া অনুসরণ করছে

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ বা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করা। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এর পাঁচটি মৌলিক ভিত্তি বিশেষভাবে স্বীকৃত: দীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশমর্যাদা ও সম্পদ সংরক্ষণ।

অর্থাৎ শরিয়তের যাবতীয় বিধিমালার লক্ষ্যই হলো মানুষের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সম্পদ সংরক্ষণের বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে এর অর্থ শুধু ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন বাড়ানো বা নিরাপদ মুনাফা নিশ্চিত করা নয়; বরং আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও গোটা সমাজের আর্থিক স্বার্থ সংরক্ষণ করাও এর অংশ।

একই সঙ্গে ব্যাংকের বিনিয়োগনীতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষক অর্থায়নের সুযোগ পান এবং জাতীয় সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়।

আল্লাহ বলেছেন, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না থাকে।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

অতএব, ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি কেবল মুনাফা অর্জন ও বৃদ্ধিতেই মগ্ন থাকে, কিন্তু সামাজিক কল্যাণ ও সম্পদের উৎপাদনশীল বণ্টনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে, তবে শরিয়তের বৃহত্তর ও মহৎ উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যায়।

সাধারণ কর্মীরা যদি মনে করেন শরিয়া মেনে চলা শুধু ‘শরিয়াহ বিভাগ’-এর কাজ, তবে ব্যাংকে সামগ্রিক সততার চর্চা গড়ে ওঠে না। তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেকের কাজে নৈতিকতা থাকা জরুরি।

নৈতিকতা না থাকার ৮ ক্ষতি

১. ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল কথা হলো বাস্তব পণ্যের কেনাবেচা এবং ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে পণ্য না কিনে যদি শুধু কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় ‘মুরাবাহা’ সাজানো হয়, তবে তা প্রচলিত সুদি ঋণেরই নামান্তর হয়ে দাঁড়ায় এবং ব্যাংকের স্বকীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

২. ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস। লুকানো চার্জ, অস্পষ্ট শর্ত, তথ্য গোপন কিংবা সেবায় অবহেলা দেখা দিলে মানুষ দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়।

৩. ইসলাম শুধু সুদ বর্জন করতেই বলেনি; বরং যেকোনো ধরনের ঠকবাজি, অস্বচ্ছতা ও শোষণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। সুদ এড়িয়েও যদি ব্যাংক অনৈতিক চাতুর্যের আশ্রয় নেয়, তবে তা ইসলামি অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

৪. শরিয়তের অন্যতম লক্ষ্য হলো সম্পদ যেন কেবল ধনীদের হাতে বন্দি না থাকে। কিন্তু ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি কেবল বড় করপোরেট ও প্রভাবশালীদের পেছনে ছোটে, তবে কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক মানুষ অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন।

৫. কর্মকর্তাদের মধ্যে তাকওয়া বা জবাবদিহির মানসিকতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে।

৬. শরিয়াহ বোর্ড বা অডিট বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং কেবল নথিপত্রে সই করার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শরিয়াহ তদারকির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।

৭. সাধারণ কর্মীরা যদি মনে করেন শরিয়া মেনে চলা শুধু ‘শরিয়াহ বিভাগ’-এর কাজ, তবে ব্যাংকে সামগ্রিক সততার চর্চা গড়ে ওঠে না। তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেকের কাজে নৈতিকতা থাকা জরুরি।

৮. নৈতিকতার ঘাটতি থাকলে অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সুনামহানি।

‘ইসলামি শরিয়া’ কোনো ভীতিকর বিষয় নয়

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলে

বিশ্বজুড়ে ইসলামি অর্থব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় রাখতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করেছে।

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস (আওফি) ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবীদের জন্য ‘কোড অব ইথিকস’ প্রণয়ন করেছে। এতে সততা, আমানতদারিতা, পেশাগত দক্ষতা, গোপনীয়তা, নৈতিক আচরণ এবং শরিয়াহর প্রতি অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড (আইএফএসবি) ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক আচরণ, স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নিয়মেও ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নৈতিকতা নিছক ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অপরিহার্য অংশ।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সাফল্য শুধু সুদমুক্তির প্রচার বা আরবি নামকরণের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। সাইনবোর্ডে ‘ইসলামি’ লিখে ভেতরে প্রচলিত ব্যবস্থার মতো আচরণ করলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের আস্থা ধরে রাখা অসম্ভব।

 উত্তরণের ৮ পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

১. প্রতিটি ব্যাংকে কার্যকর ‘ইথিকস পলিসি’ রাখা এবং এবং তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা।

২. কেবল সর্বোচ্চ মুনাফার পেছনে না ছুটে সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা।

৩. পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের চাপমুক্ত হয়ে অভিজ্ঞ আলেম ও অর্থনীতিবিদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া।

৪. অডিট যেন কেবল টেবিলের ফাইলেই সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রকৃত ব্যবসা ও পণ্য কেনাবেচা হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করা।

৫. বিনিয়োগের খরচ, মুনাফার হার, ঝুঁকি ও অতিরিক্ত চার্জ সম্পর্কে গ্রাহককে শুরুতেই সহজ ভাষায় পরিষ্কার ধারণা দেওয়া।

৬. বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও কুটিরশিল্পে বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো।

৭. ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তাদের লেনদেনের ইসলামি নীতিমালা (ফিকহুল মুআমালাত), দুর্নীতি প্রতিরোধ ও পেশাগত সততার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া।

৮. শরিয়াহ লঙ্ঘন বা আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সাফল্য শুধু সুদমুক্তির প্রচার বা আরবি নামকরণের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। সাইনবোর্ডে ‘ইসলামি’ লিখে ভেতরে প্রচলিত ব্যবস্থার মতো আচরণ করলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের আস্থা ধরে রাখা অসম্ভব।

  • ড. এইচ এম শহীদুল ইসলাম বারাকাতি: চেয়ারম্যান: শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, এনসিসি ব্যাংক পিএলসি

সুদকে বৈধ মনে করার ক্ষতি কী

সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।