গণমাধ্যম
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

৭ নভেম্বরের শিক্ষা: ভোগে নয়, ত্যাগেই আস্থার রাজনীতি

জাতীয়
গণমাধ্যম ডেক্স
৭ নভেম্বরের শিক্ষা: ভোগে নয়, ত্যাগেই আস্থার রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর ছিল গভীর অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা ও ক্ষমতার সংঘাতের সময়। ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান তাকে আরও জটিল করে তোলে। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৭ নভেম্বর সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহ ও জনতার অংশগ্রহণে তিনি মুক্ত হন।

এই ঘটনাকে শুধু একটি সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। বরং একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: এমন অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সাধারণ সৈনিকদের একটি বড় অংশ কেন জিয়াউর রহমানের মুক্তিকে নিজেদের আস্থা ও প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন?

এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে তাঁর সামরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং সৈনিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দিকে।

আস্থার উৎস: রণাঙ্গনের নেতৃত্ব

এর উত্তর লুকিয়ে আছে রণাঙ্গনে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়া ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা দিয়ে সৈনিকদের সশস্ত্র প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করেন। ২৭ মার্চ কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। যুদ্ধে প্রথমে ১ নম্বর, পরে ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে জেড ফোর্স ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন তিনি। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পান বীর উত্তম খেতাব। ১৯৮১ সালে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, জেড ফোর্সের সঙ্গে তিনি ‘icy bravery’র সুনাম অর্জন করেছিলেন। যে অধিনায়ক সৈনিকের পাশে থেকে একই ঝুঁকি ভাগ করে নেন, তিনি সৈনিকের হৃদয়ে স্থান করে নেন।

ব্যারাকের অকৃত্রিম ভালোবাসা

৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য ঘটনাটি নিজেই। কোনো আদেশে নয়, সাধারণ সৈনিকদের নিজস্ব আস্থা ও আবেগই তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের বিশ্লেষণে, সৈনিক ও তরুণ কর্মকর্তাদের মধ্যে জিয়ার জনপ্রিয়তা তাঁর প্রতিপক্ষদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। এই জনপ্রিয়তার ভিত্তি ছিল ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং সৎ, দক্ষ ও নির্ভীক অধিনায়কের পরিচয়।

এই ভালোবাসার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রমাণ মেলে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁর নিহত হওয়ার পর। সাখাওয়াত হোসেনের বিবরণ অনুযায়ী, বিদ্রোহে মূলত কর্মকর্তারাই জড়িত ছিলেন। সাধারণ সৈনিকদের অনেকে এমন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি। ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁদের সহযোগিতা পায়নি। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে প্রস্তুত করা মরদেহ হেলিকপ্টারে ঢাকায় নেওয়ার আগে সৈনিকদের অনুরোধেই হেলিপ্যাডে জানাজা পড়া হয়। একজন কমান্ডারের প্রতি ব্যারাকের ভালোবাসা এর চেয়ে স্পষ্টভাবে আর কবে ধরা দিয়েছে?

ভোগ নয়, ত্যাগের রাজনীতি

জিয়াউর রহমান ছিলেন ভোগবিলাসবর্জিত, ত্যাগে অভ্যস্ত এক মানুষ। হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিকথায় উঠে আসা বিবরণ অনুযায়ী, খাবারে তিনি এক পদের বেশি পছন্দ করতেন না। তাঁর সহকারী মাসের শুরুতে রেশনের খাবার এনে দিলে তা দিয়েই সংসার চলত। রাষ্ট্রপতির পদে বসেও তিনি এই সাদাসিধে অভ্যাস ছাড়েননি।

সমাজবিজ্ঞানের একটি সরল সত্য এখানে প্রযোজ্য। যে নেতা নিজে সামান্যতেই তুষ্ট, তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে ফারাক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ব্যারাকের সৈনিক শুকনো রুটি ও ডাল খেয়ে দিন কাটান। তিনি যখন দেখেন, তাঁদের অধিনায়কও একই জীবনযাপন করছেন, তখন আনুগত্য আদেশের ভয়ে নয়, শ্রদ্ধা থেকে জন্ম নেয়। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ সম্ভবত এটাই।

এই ভালোবাসা কেবল সামরিক বীরত্বের ফসল নয়; এর ভিত্তিতে ছিল জনসাধারণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালে তিনি প্রাণ বাজি রেখেছেন, ১৯৭৫ সালে বন্দিত্ব বরণ করেছেন এবং ১৯৮১ সালে ছয় দেহরক্ষী ও দুই সহকারীসহ প্রাণ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি দেশজুড়ে ঘুরেছেন, বিভিন্ন জেলায় মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সংবাদদাতারা তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন ‘বাংলাদেশের এক নম্বর অনুপ্রেরণাদাতা’ হিসেবে। ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর তাঁর মৃত্যুর পর লিখেছিল, তিনি ছিলেন পরিশ্রমী এবং সবার বিবেচনায় দুর্নীতিমুক্ত।

শ্রমের মর্যাদা তিনি হাতে-কলমে দেখিয়েছেন। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শার উলাশীতে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচির সূচনায় তিনি হেলিকপ্টারে এসে নিজ হাতে কোদাল চালান। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কাটা মাটির ঝুড়ি তিনি তুলে দেন এক ইউপি সদস্যের মাথায়, আর সেই সদস্যের মাথার টোকা নিজে পরে নেন। রাষ্ট্রপতি আর কৃষকের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার এই দৃশ্যই ছিল তাঁর রাজনীতির ভাষা।

সংকটে আস্থার ধারাবাহিকতা

৭ নভেম্বরের ঘটনার আরেকটি দিক আছে, যা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ধারার দিকে ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যখনই অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে, মানুষ কখনো সৈনিকের বেশে, কখনো জনতার বেশে ভরসার জায়গা খুঁজেছে। বিভিন্ন সময়ে সেই ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে জিয়াউর রহমান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল। এ জাতিও তাকে গ্রহণ করেছিল পরম আস্থা ও বিশ্বাসে। মানুষের মনে তার প্রভাব এতটাই ছিল যে তৎকালীন দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রধান খবর ছাপা হয়েছিল- ‘জিয়ার প্রতি জাতির আস্থা জ্ঞাপন’ শিরোনামে।

এর শুরু ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার ঐক্যে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

তবে এই ইতিহাসের শিক্ষা নিছক কৃতিত্বের গল্প নয়। নির্বাচনে মানুষ অন্য সময় ভিন্ন সিদ্ধান্তও নিয়েছে। অর্থাৎ, আস্থা শর্তহীন নয়; তা অর্জন করতে হয় এবং প্রতিদিনের আচরণের মধ্য দিয়ে ধরে রাখতে হয়।

আজকের প্রত্যাশা

১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও দুর্নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ১৬ মার্চ দিনাজপুরের সাহাপাড়া খালে নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে ৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করে তিনি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তবে প্রতীকী উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, কাজের মধ্য দিয়ে এর প্রমাণ দিতে হবে।

‘এক জিয়ার লোকান্তরে, লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’

বিএনপির রাজনীতির ইতিহাসে এই স্লোগানটি কেবল আবেগের উচ্চারণ নয়, একটি প্রতিশ্রুতিও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চোখে স্লোগান হলো দলের আত্মপরিচয়ের সংক্ষিপ্ত ঘোষণাপত্র। এখানে ঘোষণাটি স্পষ্ট: একজন জিয়ার প্রস্থানে থেমে যাবে না তাঁর আদর্শ; বরং ঘরে ঘরে জন্ম নেবে লক্ষ জিয়া। কিন্তু ‘লক্ষ জিয়া’ মানে লক্ষ সেনানায়ক নয়; এর অর্থ তাঁর গুণাবলির বিস্তার: সাদাসিধে জীবন, সহমর্মিতা, সদাচার এবং জনসেবায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা।

তাই প্রশ্নটা এখন বিএনপির প্রতিটি নেতা, কর্মী ও সমর্থকের কাছে। স্লোগানটি যদি তাঁরা সত্যিই মনেপ্রাণে ধারণ করেন, যদি জিয়ার ভোগবিলাসবর্জিত জীবনযাপন ও জনকল্যাণে ত্যাগের রাজনীতি দলের ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি ক্ষমতার ছায়ায় সুবিধাবাদের সংস্কৃতির পরিবর্তে সেবার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে ‘লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে’ কথাটি আর স্লোগান থাকবে না, বাস্তবে রূপ নেবে। তখন বাংলাদেশ দ্রুত বদলে যেতে এবং উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। কারণ রাষ্ট্র বদলায় নেতার ভাষণে নয়, নেতাকর্মীদের প্রতিদিনের আচরণে।

আজকের বিএনপির সামনে সেই উত্তরাধিকারকে নতুন করে প্রমাণ করার সুযোগ রয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করতে পারে, তবে অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বর্তমানের বাস্তব শক্তিতে রূপ নিতে পারে।

আস্থা অর্জন কঠিন, কিন্তু হারানো সহজ। জনগণের ভালোবাসা যে নেতৃত্ব অর্জন করে, তার দায়িত্বও তত বড়।

সেই দায়িত্ব পালনের জন্য কি আজকের নেতৃত্ব ক্ষমতার মোহ ও ভোগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ত্যাগ, সংযম ও জনসেবার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?

ইতিহাস এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে বক্তৃতায় নয়, কাজে; স্লোগানে নয়, মানুষের জীবনে।

ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত জনকল্যাণের রাজনীতি।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স

সম্পাদক ও প্রকাশক: শামীম আহমেদ | বার্তা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম

© ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।