দুই দিনের বিরতির পর রোববার দুপুরের পর আবারও শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। পোশাক কারখানার পাশাপাশি এবার মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন জুতার কারখানার শ্রমিকরাও। গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী, জরুন ও কাশিমপুর এলাকায় একাধিক কারখানায় বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
জরুনে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একটি কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর এবং কর্তৃপক্ষের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন শ্রমিকরা। কালিয়াকৈরে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই গ্রুপের জেনিথ ফুটওয়্যার লিমিটেডে শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে কাশিমপুরের নয়াপাড়া ও জিতার মোড় এলাকার ১২টি কারখানাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে দুপুরের পর শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ও উত্তেজনা সন্ধ্যার দিকে প্রশমিত হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যায় শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্ত ছিল এবং অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছিল। দুপুরের দিকে কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় মন্ডল গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা আশপাশের কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং কয়েকটি কারখানায় ছুটি দেওয়ার দাবি তোলেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, বেলা ৩টার দিকে মন্ডল গ্রুপের কিছু শ্রমিক স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের জরুন এলাকার একটি কারখানায় গিয়ে সেখানকার শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দিতে চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় কারখানাটিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে কয়েক হাজার শ্রমিক কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর চালান এবং ভেতরে কর্তৃপক্ষের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিভিন্ন কারখানা ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এদিকে কাশিমপুর থানাধীন নয়াপাড়া ও জিতার মোড় এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় ১২টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ ঘোষিত কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে কটন ক্লাব বিডি লিমিটেডের ইউনিট-১ ও ইউনিট-২, এমা সিনটেক্স লিমিটেড, তাসনিয়া ফেব্রিক্স লিমিটেড, মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেড, মুনটেক্স ফেব্রিক্স লিমিটেড, কাইজার নিট ওয়্যার লিমিটেড, আলীম নিট বিডি লিমিটেড, এলিয়েন্ট টেক্স লিমিটেড, মাইমুন কমপ্লেক্স, ইসলাম নিট ওয়্যার লিমিটেড এবং ডেলটা নিট কম্পোজিট লিমিটেড। এরমধ্যে কটন ক্লাব বিডি ও আলীম নিট বিডি মন্ডল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরা সকালে কাজে যোগ দেন। পরে দুপুরের দিকে তারা কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষ বেলা ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এরপর শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানা থেকে বের হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান। এপেক্সে ছুটি ঘোষণার পর একই গ্রুপের ভান্নারা-মৌচাক এলাকার জেনিথ ফুটওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরাও কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তাদের একটি অংশ কারখানা থেকে বের হয়ে ভান্নারা-মৌচাক বাজার এলাকায় জড়ো হন।
শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধিসহ ১৪ দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান, শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার জবাব ও বিচার, শ্রমিকদের মারধর বা নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হারুন ও মহিবুল্লাহর বিচার এবং তাদের কারখানায় দায়িত্বে না রাখা, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই না করা, কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু করা। এছাড়া ছুটির টাকা পূর্ণ পরিশোধ, ছুটি নিলে হাজিরা বোনাস না কাটা, সুপারভাইজার ও কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার বন্ধ, মানবসম্পদ বিভাগের ছুটি-সংক্রান্ত আচরণে পরিবর্তন, শ্রমিক প্রতিনিধি ও অংশগ্রহণকারী কমিটির (পিসি) সদস্যদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া, হাজিরা বোনাস এক হাজার টাকা এবং টিফিন বিল ৪০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু কর্মকর্তার আচরণ সন্তোষজনক নয়। এসব দাবির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদনকাজ বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছেন তারা।চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাতেও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে একটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে কর্তৃপক্ষ রোববারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে। ফলে দুপুরের পর কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, জরুন ও কাশিমপুরসহ শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ রোববারের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছে। কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও জরুনসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার মজুরি কাঠামোর সঙ্গে বিজিএমইএর আওতাধীন পোশাক কারখানার মজুরি কাঠামোর মিল নেই। এপেক্স ও জেনিথ ফুটওয়্যারের শ্রমিকরা আগে থেকেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও কারখানায় ছুটি ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
উল্লেখ্য, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে মজুরি বোর্ডের সুপারিশে মালিক-শ্রমিকের সম্মতির ঘোষণার পর শ্রমিকরা কাজে ফিরলে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসতে শুরু করে। দুই দিনের বিরতির পর রোববার দুপুর থেকে আবারও পোশাক কারখানায় বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের পাশাপাশি জুতাশিল্পের কারখানায় আন্দোলন শুরু হওয়ায় শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। তবে সন্ধ্যায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় আপাতত স্বস্তি ফিরেছে।
শ্রমিকদের ১৪ দফা দাবি ও অভিযোগের বিষয়ে এপেক্স ও জেনিথ ফুটওয়্যার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স