মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা, রাতে শেষ বার্তা, সকালে নিখোঁজের রহস্য
গণমাধ্যম ডেক্স
এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। বাবার জন্যও কিনেছিলেন কিছু জিনিস। সন্ধ্যার পর পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের ডাকে বাসা থেকে বের হন। রাতে মাকে বার্তা পাঠিয়ে জানান, বাসায় ফিরছেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। পরদিন বুধবার বিকেলে রাজধানীর অদূরে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তার ভাসমান মরদেহ। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে খোঁজ মিলছে না তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিরও। তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তার নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনাপ্রবাহ, মৃত্যুর কারণ এবং কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা জানতে তদন্ত করছে পুলিশ। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাহসিফের নাম আলোচনায় আসার পর ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে প্রতিক্রিয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তদন্তের আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। আর জামায়াতে ইসলামী দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ছেলেকে হত্যা করে নদীতে ফেলার সন্দেহ বাবার বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে ছেলের মরদেহ বুঝে নেওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। তাহসিফ আত্মহত্যা করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এনায়েতুল করিম বলেন, “আত্মহত্যার তো প্রশ্নই আসে না। সে অত্যন্ত ‘প্লেজেন্ট পার্সোনালিটির’ একজন মানুষ। আর একজন কমিশনড অফিসার তো অনেক কষ্ট করে তাকে এটা অর্জন করতে হয়। সে বিভিন্ন কোর্স করে তারপরে… এরকম একজন অফিসার… এরকম কোনো ব্যাপার ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “হত্যা করা হয়েছে, তাকে নিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে আমি সাসপেক্ট করি।” রাতে মায়ের কাছে শেষ বার্তা রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তাহসিফ। তার বাবা এনায়েতুল করিমের ভাষ্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামের পরিচিত এক ছোট ভাই বাসার নিচে এসে তাকে ডাকেন। দ্বীপের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন জানিয়ে নিচে নামেন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি। ছেলে বাসায় না ফেরায় একাধিকবার ফোন করেন তার মা। কিন্তু যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের ফোনে একটি বার্তা পাঠান তাহসিফ। তাতে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে বার্তাটি পড়ে ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান তার বাবা। এরপরও তাহসিফ বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ করতে থাকেন। বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় যান এনায়েতুল করিম। তখন ছেলের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ। পরে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, তার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। তার বাবা জানান, যে এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে তাহসিফ যেতেন বলে তাদের জানা নেই। সুরতহালে আঘাতের চিহ্ন নেই বৃহস্পতিবার সকালে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান তাহসিফের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। প্রতিবেদনে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা যায় এবং পেট ফোলা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরদেহের দুই হাত মাথার সামনের দিকে বাঁকানো ছিল। হাতের মুঠো ছিল খোলা। বুক, পেট, পিঠ ও দুই পা ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অংশে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মরদেহটি শনাক্ত করেন তার খালাতো ভাই জহির হাসান। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। তার হাতে একটি ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে উত্তরার বাসায় নেওয়া হয় তাহসিফের মরদেহ। বাদ আসর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে তার জানাজা হয়। পরে ১২ নম্বর সেক্টরের গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। কোথায় তাহসিফের মোটরসাইকেল তাহসিফ দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার একটি মোটরসাইকেল ছিল। মাসখানেক আগে দুর্ঘটনায় পড়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করা হয়েছিল। তারপরও মঙ্গলবার বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেলটি সঙ্গে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন এক স্বজন। তাহসিফের মৃত্যুর পর মোটরসাইকেলটির সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ওই স্বজন বলেন, তারা দ্বীপের সঙ্গেও কথা বলেছেন। দ্বীপ তাদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে তাহসিফের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। পরে তাকে বাসার এলাকার কাছে রেখে চলে যান। ওই স্বজনের ভাষ্য, পুলিশ মোটরসাইকেলের বিস্তারিত তথ্য ও ছবি চেয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সেগুলো দেওয়া হয়েছে। তবে মোটরসাইকেলটি কোথায়, কীভাবে নিখোঁজ হলো কিংবা এর সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিমানবাহিনী থেকে চাকরি হারানোর পর বিসিবি ও নেত্র নিউজে তাহসিফ বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। পরে তার চাকরি চলে যায় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এনায়েতুল করিম বলেন, চাকরি চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে শৃঙ্খলাজনিত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও নেত্র নিউজে কাজ করেন। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, তাঁরা এখনো কোনো অভিযোগ পাননি। বিষয়টি দেখছে নৌ-পুলিশ। টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাহসিফের নাম আলোচনায় আসার পর তার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভিডিওটির সঙ্গে তার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তদন্তের আগে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। সাংবাদিকেরা শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি এই বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ, একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।” ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে দেশত্যাগের ভিডিওটি তাহসিফ সাউরি ধারণ করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। গত জুলাইয়ে এক পডকাস্টে তাহসিফকে প্রশ্ন করা হয়, ওই ভিডিও ধারণের কারণে তার বিমানবাহিনীর চাকরি গেছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, “হতে পারে।” ওই পডকাস্টে ‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনে বিমানবাহিনীর ভেতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের যে দাবি করা হয়েছিল, সে বিষয়েও তাকে প্রশ্ন করা হয়। তাহসিফ বলেন, “আমার মনে হয়, ‘আমার দেশ’ যে প্রতিবেদনটা করেছে, এটা তারা আসলে কোনো প্রোপাগান্ডা সার্ভ করছে।” গত বছরের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের প্রতিবাদে আইএসপিআর জানায়, তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জামায়াতের তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার বিকেলে দলটির প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিক্রিয়ার কথা জানানো হয়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে এবং এতে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা সংস্থার দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অবহেলার জন্য কেউ দায়মুক্তি পেতে পারেন না। তাহসিফের পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে।