প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা আর অনুশোচনা—‘দার–এ–নিজাত’ নিয়ে এত আলোচনা কেন
গণমাধ্যম ডেক্স
শৈশবের বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিশ্বাস, তারপর বিশ্বাসভঙ্গ আর নতুন করে জীবন শুরু করার লড়াই। সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণই দর্শককে আটকে রেখেছে পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার–এ–নিজাত’–এ। পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে সিরিজটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ ও অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি সিরিজটির দর্শনসংখ্যা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল এআরওয়াই ডিজিটালে প্রচারিত এই ধারাবাহিকের গল্পে রয়েছে প্রেম, ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও বিশ্বাসঘাতকতা। তবে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি চরিত্র—জারিয়াব, জামিল ও আবু বকর। তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েনই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
২৩ পর্বেই ১৭০ কোটি ভিউয়ের দাবি
২৪ অক্টোবর এআরওয়াই ডিজিটাল জানায়, প্রচারের সময়েই ‘দার–এ–নিজাত’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে ১৭০ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে। চ্যানেলটির দাবি, মাত্র ২৩ পর্বে এই সংখ্যা অর্জন করে পাকিস্তানি ধারাবাহিকের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে সিরিজটি। প্রধান অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সাফল্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
জারিয়াব, জামিল ও আবু বকরের ত্রিভুজ
‘দার–এ–নিজাত’–এর গল্পের কেন্দ্রে জারিয়াব। প্রাণবন্ত, নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা এই তরুণী ভালোবাসেন জামিলকে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থেকে তৈরি হওয়া তাঁদের সম্পর্ক একসময় প্রেমে রূপ নেয়। জারিয়াবের কাছে এই সম্পর্ক শুধু আবেগের নয়, ভবিষ্যৎ গড়ারও প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায় যখন জামিল নিজের জীবন ও বিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে জারিয়াবের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একসময় যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন জারিয়াব, সেই মানুষই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। জামিলের সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়ে জারিয়াবের বিশ্বাস। বিশেষ করে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁকে না জানানো এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি দর্শকদের আলোচনায় এসেছে।

এরপর জারিয়াবের জীবনে আসেন আবু বকর। শেহরিয়ার মুনাওয়ার অভিনীত এই চরিত্র জামিলের তুলনায় ভিন্ন ধরনের মানুষ। তাঁর সঙ্গে জারিয়াবের সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে নতুন করে বিশ্বাস তৈরি করা, অতীতের ক্ষত সামলানো এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার প্রশ্ন। ফলে গল্পটি কেবল পুরোনো প্রেমিককে হারানোর বেদনায় আটকে থাকে না; বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তুলে ধরে।
জামিলের আচরণ নিয়ে বিতর্ক
সিরিজটির আলোচিত পর্বগুলোর একটি ছিল জামিল ও জারিয়াবের সম্পর্কের মোড় ঘুরে যাওয়ার ঘটনা। দীর্ঘদিনের প্রেমের পর জামিল যখন জারিয়াবকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন তাঁর যুক্তি ও আচরণ নিয়ে দর্শকেরা প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে জারিয়াবকে যথেষ্ট ধার্মিক মনে না করার কারণে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি করে।
এই জায়গায় ধারাবাহিকটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে অসংগতির প্রশ্ন সামনে আনে। একজন মানুষ নিজের জীবনযাপন বদলাতে পারেন, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মানদণ্ড দিয়ে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত? জামিলের চরিত্র নিয়ে দর্শকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পেছনে রয়েছে এমন প্রশ্নও।
অনেক দর্শকের কাছে জামিলের আচরণ সম্পর্কের ভেতরে দ্বিচারিতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, চরিত্রটির সিদ্ধান্ত ও দুর্বলতা গল্পকে বাস্তবসম্মত করেছে। কারণ, বাস্তব জীবনেও মানুষ নিজের বিশ্বাস, সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্বে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। সিরিজটির আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে এই দ্বন্দ্ব।

অন্তরঙ্গ দৃশ্য ঘিরেও আলোচনা
‘দার–এ–নিজাত’ শুধু প্রেম ও বিচ্ছেদের গল্পের কারণে আলোচনায় আসেনি। জারিয়াব ও জামিলের সম্পর্কের একটি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য নিয়েও দর্শকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়। একটি পর্বে জারিয়াব জামিলের বাড়িতে যাওয়ার পর পরদিন সকালে গল্প এগিয়ে যায়। এরপর তাঁর আচরণ ও দাদির সঙ্গে কথোপকথনের সূত্র ধরে দর্শকেরা তাঁদের সম্পর্কের শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
এক দর্শক লেখক উমেরা আহমেদের কাছে জানতে চান, দৃশ্যটি দিয়ে কি তাঁদের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে? উমেরা সংক্ষেপে ‘হ্যাঁ’ বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন, এমনটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল দুই রকম। কেউ মনে করেন, সরাসরি দৃশ্য না দেখিয়েও সম্পর্কের জটিলতা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ পারিবারিক দর্শকের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিতর্ক দেখিয়েছে, পাকিস্তানি ধারাবাহিকের দর্শকেরা শুধু গল্পের মোড় নয়, সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের উপস্থাপন নিয়েও কতটা সক্রিয়ভাবে মতামত দেন।

উমেরা আহমেদের গল্প, সাকিব খানের নির্মাণ
‘দার–এ–নিজাত’ লিখেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার ও ঔপন্যাসিক উমেরা আহমেদ। তাঁর লেখায় প্রায়ই উঠে আসে সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সেসব সিদ্ধান্তের পরিণতি। ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’ ও ‘মেরি জাত জাররা–এ–বিনিশান’–এর মতো কাজের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন।
ধারাবাহিকটি পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। প্রযোজনা করেছে থ্রিজ এন্টারটেইনমেন্ট। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেহরিয়ার মুনাওয়ার, দুরে–ফিশান সেলিম ও নামির নওয়াজ খান। এ ছাড়া রয়েছেন সাহার হাশমি, রোমাইসা খান, সানিয়া সাঈদ, সাবা হামিদ, ফারান তাহির, আদনান জাফর, নাদিয়া আফগানসহ আরও অনেকে।
জারিয়াবের চরিত্রে দুরে–ফিশান সেলিমের অভিনয় নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কেউ তাঁর চরিত্রের আবেগ ও দ্বিধাকে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ সংলাপ বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে শেহরিয়ার মুনাওয়ারের আবু বকর চরিত্র দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে জারিয়াবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নতুন দিকগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর।
নামির নওয়াজ খানের জামিল চরিত্রও আলোচনার কেন্দ্রে। চরিত্রটির সিদ্ধান্তে দর্শকের বিরক্তি তৈরি হলেও সেটি গল্পের প্রতি তাঁদের আগ্রহের একটি কারণ হয়ে উঠেছে। দর্শক শুধু জানতে চাইছেন না, পরের পর্বে কী ঘটবে; তাঁরা চরিত্রগুলোর নৈতিক অবস্থান নিয়েও নিজেদের মধ্যে তর্ক করছেন।
বাংলাদেশেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে
বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধারাবাহিকের দর্শক তৈরি হওয়ার পেছনে পারিবারিক গল্প, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তানি ধারাবাহিক নিয়ে আঞ্চলিক দর্শক–আলোচনায় বাংলাদেশ ও ভারতের নামও উঠে এসেছে।
‘দার–এ–নিজাত’–এর গল্পের বিষয়গুলোও বাংলাদেশের দর্শকের কাছে পরিচিত। ভালোবাসার সম্পর্কে প্রত্যাশা, পরিবার ও সমাজের চাপ, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সংঘাত, বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু করা—এসব বিষয় দেশ ও ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।
সামনে কী
‘দার–এ–নিজাত’–এর গল্প এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে অতীতের সম্পর্কের ক্ষত এবং বর্তমানের নতুন বন্ধনের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে চরিত্রগুলোকে। জারিয়াব কি আবু বকরের সঙ্গে নিজের জীবনের স্থিতি খুঁজে পাবেন? জামিল কি নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি বুঝতে পারবেন? আর বিশ্বাস, অনুশোচনা ও ক্ষমার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত কার অবস্থান বদলাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতেই দর্শকেরা নতুন পর্বের অপেক্ষায় থাকছেন।
জিও নিউজ ও এআরওয়াই নিউজ অবলম্বনে
সূত্র: প্রথম আলো